চালকবিহীন ট্যাঙ্কে রাশিয়ার অগ্রগতি, একই পথে ভারতীয় সেনা - 24 Ghanta Bangla News
Home

চালকবিহীন ট্যাঙ্কে রাশিয়ার অগ্রগতি, একই পথে ভারতীয় সেনা

Spread the love

ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে চালকবিহীন ট্যাঙ্ক (Unmanned Tank) ও রোবোটিক যুদ্ধযানের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছে রাশিয়া ও ভারত। রাশিয়া তাদের ‘শতুর্ম’ নামে ভারী চালকবিহীন আক্রমণকারী যুদ্ধযানকে প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যকর ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছে বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয় সেনাও পুরনো টি-৭২ ট্যাঙ্ককে দূর থেকে পরিচালিত যুদ্ধযানে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। লক্ষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযানে সেনাদের সরাসরি বিপদের মুখে না পাঠিয়ে প্রযুক্তির সাহায্যে যুদ্ধের ক্ষমতা বাড়ানো।

রাশিয়ার এই রোবোটিক যুদ্ধব্যবস্থার কথা সামনে এসেছে ‘সেন্টার-২০২৬’ সামরিক মহড়ায়। ক্রেমলিন নিয়মিতভাবে যে বড় সামরিক মহড়াগুলি আয়োজন করে, সেগুলির মধ্যে সেন্টার অন্যতম। ভস্তক, জাপাদ এবং কাভকাজের মতো মহড়ার পাশাপাশি এই মহড়াও রাশিয়ার সামরিক প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শতুর্ম ব্যবস্থাটি মূলত দুর্গবেষ্টিত প্রতিরক্ষা ভেদ করা এবং শহরের মধ্যে যুদ্ধের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে।

টি-৭২ ট্যাঙ্কের ভিত্তিতে রাশিয়ার শতুর্ম

রাশিয়ার শতুর্ম একটি ভারী রোবোটিক আক্রমণব্যবস্থা, যার মূল ভিত্তি টি-৭২ ট্যাঙ্ক। ভারতীয় সেনাও বিপুল সংখ্যায় এই ধরনের ট্যাঙ্ক ব্যবহার করে। শতুর্মের উন্নয়ন প্রায় ১৫ বছর ধরে চলছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই যুদ্ধযানের পরীক্ষা নিয়ে প্রথম খবর প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে রাশিয়া ব্যবস্থাটিকে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে কার্যকর ব্যবহারের উপযোগী করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থায় দূর থেকে পরিচালিত যুদ্ধযানের পাশাপাশি একটি আলাদা চালকযুক্ত কমান্ড ট্যাঙ্ক থাকে। এই কমান্ড ট্যাঙ্ক টি-৭২ অথবা টি-৯০ ট্যাঙ্কের কাঠামোর ওপর তৈরি হতে পারে। একে মূল নিয়ন্ত্রণযান বা ‘মাদারশিপ ট্যাঙ্ক’ বলা হচ্ছে। কমান্ড ট্যাঙ্কের ভেতরে বসেই সেনারা চালকবিহীন যুদ্ধযান পরিচালনা করবেন।

শতুর্মের চালকবিহীন ট্যাঙ্ক অথবা বিএমপিটি যুদ্ধযান পরিচালনা করতে তিনজন অপারেটর প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণকারী যান এবং দূর থেকে পরিচালিত যুদ্ধযানকে পরস্পরের সরাসরি দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকতে হবে। এই দূরত্ব আনুমানিক তিন থেকে চার কিলোমিটার। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং নিয়ন্ত্রণকারী যানকে সঠিক অবস্থানে রাখা এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

শহরের যুদ্ধে বিশেষভাবে তৈরি অস্ত্রব্যবস্থা

শতুর্মের প্রধান সংস্করণে রয়েছে ছোট দৈর্ঘ্যের ১২৫ মিলিমিটার কামান। শহরের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি মাথায় রেখে এই কামান তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধযানের সামনে বুলডোজার ব্লেড এবং অতিরিক্ত বর্ম ব্যবহার করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, বাধা সরিয়ে এগিয়ে যাওয়া এবং পদাতিক বাহিনীর ট্যাঙ্কবিধ্বংসী অস্ত্রের আঘাত থেকে যুদ্ধযানকে আরও সুরক্ষিত রাখা।

দুর্গবেষ্টিত প্রতিরক্ষা ভাঙা, শত্রুর প্রতিরোধের মধ্যে প্রবেশ করা এবং শহরের সংকীর্ণ এলাকায় অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের যুদ্ধযান ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শতুর্মের প্রকৃত যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকারিতা কতটা, তা নির্ভর করবে বাস্তব অভিযানে এর পারফরম্যান্স, যোগাযোগব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতার ওপর।

পুরনো টি-৭২ ট্যাঙ্ককে চালকবিহীন করবে ভারত

রাশিয়ার মতো ভারতীয় সেনাও পুরনো ট্যাঙ্ককে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আধুনিক করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ভারতীয় সেনা টি-৭২ ট্যাঙ্ককে দূর থেকে পরিচালিত যানে রূপান্তর করার জন্য কাজ করছে। এই প্রকল্পে আইপি-ভিত্তিক ইন্টারফেস ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে যুদ্ধযানকে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থার সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

এই উদ্যোগের মূল ধারণা হল ‘ম্যানড-আনম্যানড টিমিং’। অর্থাৎ, চালকযুক্ত এবং চালকবিহীন সামরিক যান একসঙ্গে কাজ করবে। এতে সরাসরি সেনা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ না করেও বিপজ্জনক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে চালকযুক্ত ট্যাঙ্ক, দূরনিয়ন্ত্রিত যান এবং কমান্ডব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো যাবে।

এই প্রকল্পের জন্য ভারতীয় সেনা দেশীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করতে চাইছে। সোভিয়েত আমলের প্রযুক্তির ভিত্তিতে তৈরি টি-৭২ ট্যাঙ্ককে ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য দেশীয় শিল্পক্ষেত্রের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ইনোভেশনস ফর ডিফেন্স এক্সেলেন্স বা আইডেক্সের ‘অদিতি ৪.০’ কর্মসূচির মাধ্যমে এই উদ্যোগে শিল্পক্ষেত্রের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

আইপি-ভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থার লক্ষ্য হল এমন একটি সংযোগ তৈরি করা, যা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর বাধা, যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা এবং সাইবার আক্রমণের মধ্যেও যথাসম্ভব নির্ভরযোগ্য থাকবে। তবে বাস্তবে এই ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যোগাযোগব্যবস্থা, সফটওয়্যার এবং নিয়ন্ত্রণপ্রযুক্তির কঠোর পরীক্ষা প্রয়োজন।

কোন কোন কাজে ব্যবহার হবে চালকবিহীন ভারতীয় ট্যাঙ্ক?

ভারতীয় সেনা এই ধরনের ট্যাঙ্ককে একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। তার মধ্যে রয়েছে মাইনক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করা, শত্রুর গুলি টেনে আনার জন্য ছদ্ম লক্ষ্য হিসেবে কাজ করা, আক্রমণের সামনের সারিতে এগিয়ে যাওয়া, শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং বিপজ্জনক এলাকায় টহল দেওয়া।

ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তরিত ট্যাঙ্কগুলি থেকে পাওয়া তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে কমান্ড নেটওয়ার্কে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সেনা আধিকারিকেরা যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেতে পারেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে মানব অপারেটর ও কমান্ডারদের হাতেই।

এই ব্যবস্থার অন্যতম সুবিধা হতে পারে, ট্যাঙ্কের কর্মীদের সরাসরি প্রাণঘাতী বিপদের মধ্যে না পাঠিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি বাড়ানো। পাশাপাশি অভিযানের গতি, যুদ্ধযানের টিকে থাকার সম্ভাবনা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত কৌশল পরিবর্তনের ক্ষমতা বাড়তে পারে।

১৯৭৯ সাল থেকে ভারতীয় সেনার ভরসা টি-৭২

ভারতীয় সেনা ১৯৭৯ সাল থেকে টি-৭২ ট্যাঙ্ক ব্যবহার করছে। পাঞ্জাবের সমতলভূমি, রাজস্থানের মরুভূমি, উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল এবং শ্রীলঙ্কার জঙ্গলসহ বিভিন্ন ধরনের ভূখণ্ডে এই ট্যাঙ্ক ব্যবহারের অভিজ্ঞতা রয়েছে ভারতীয় সেনার। সময়ের সঙ্গে একাধিক আধুনিকীকরণের মাধ্যমে ট্যাঙ্কটির কার্যকারিতা ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছে।

পুরনো ট্যাঙ্ককে সম্পূর্ণ নতুন যুদ্ধযান দিয়ে প্রতিস্থাপন করার পরিবর্তে চালকবিহীন ব্যবস্থায় রূপান্তর করলে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি আগে থেকে ব্যবহৃত কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা যাবে। দেশীয় প্রতিরক্ষা উদ্ভাবন বাড়ানোর ভারতের লক্ষ্যের সঙ্গেও এই পরিকল্পনার যোগ রয়েছে।

তবে পুরনো ট্যাঙ্ককে চালকবিহীন করার ক্ষেত্রে ইঞ্জিন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, সেন্সর, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা প্রযুক্তির সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দূর থেকে চালানোর ব্যবস্থা তৈরি করলেই যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর রোবোটিক ট্যাঙ্ক তৈরি হয় না।

চিন ও অস্ট্রেলিয়াও তৈরি করছে স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধযান

চালকবিহীন সাঁজোয়া যুদ্ধযানের প্রযুক্তি নিয়ে শুধু রাশিয়া ও ভারত কাজ করছে না। চিনের ‘টাইপ ১০০ স্মার্ট ট্যাঙ্ক’-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নেভিগেশন, লাইডার সেন্সর এবং মডিউলার বর্মের ব্যবহার রয়েছে। এই ট্যাঙ্ককে অন্যান্য রোবোটিক যুদ্ধযান এবং চালকযুক্ত সামরিক যানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়াও ‘অ্যাটলাস’ নামে একটি স্বয়ংক্রিয় কৌশলগত হালকা সাঁজোয়া যুদ্ধযানের সহযোগী যুদ্ধসংস্করণ পরীক্ষা করেছে। এই ব্যবস্থায় দূরনিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলের বিভিন্ন ক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়েছে। এর বুরুজে লক্ষ্য শনাক্ত করা এবং আক্রমণ পরিচালনার প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার প্রযুক্তিও রয়েছে।

ভবিষ্যতের স্থলযুদ্ধে চালকযুক্ত ও চালকবিহীন যুদ্ধযানের যৌথ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাশিয়া শতুর্মের মাধ্যমে ভারী রোবোটিক আক্রমণব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, আর ভারত পুরনো টি-৭২ ট্যাঙ্ককে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা করছে। তবে এই প্রযুক্তির প্রকৃত সামরিক গুরুত্ব নির্ভর করবে যোগাযোগের নিরাপত্তা, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যতা, পরিচালনার খরচ এবং সেনাদের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।

Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট।  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *