ভারত সফরে মার্কো রুবিও, মুম্বই-জামনগরে বৈঠক ঘিরে বাণিজ্য ও জ্বালানি আলোচনা - 24 Ghanta Bangla News
Home

ভারত সফরে মার্কো রুবিও, মুম্বই-জামনগরে বৈঠক ঘিরে বাণিজ্য ও জ্বালানি আলোচনা

Spread the love

ভারত ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ভিসা নীতি ঘিরে টানাপোড়েনের আবহে ভারতে আসছেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও। আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার থেকে ২২ অক্টোবর বুধবার পর্যন্ত পাঁচ দিনের ভারত ও উজবেকিস্তান সফরে থাকবেন তিনি। এই সফরে ভারতের মুম্বই ও জামনগরে যাওয়ার পাশাপাশি উজবেকিস্তানের সমরখন্দেও যাবেন মার্কিন বিদেশ সচিব।

মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের তরফে রুবিওর সফরসূচি ও আলোচ্য বিষয় প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে, ভারতীয় সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও মজবুত করা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন রুবিও।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মার্কো রুবিওর ভারত সফর?

চলতি বছরে এটি রুবিওর দ্বিতীয় সরকারি ভারত সফর। এর আগে মে মাসে ভারতে এসেছিলেন তিনি। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করার পাশাপাশি কোয়াডের বিদেশমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও অংশ নিয়েছিলেন মার্কিন বিদেশ সচিব।

এবারের সফর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির কাঠামো ঘোষণা করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ায় চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এদিকে, আমেরিকার শুল্কনীতি এবং অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও দুই দেশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে রুবিওর সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কী আলোচনা হয়, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

তবে ভারতে রুবিওর পৌঁছনোর নির্দিষ্ট তারিখ এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। এই বিষয়ে ভারত সরকারের তরফেও কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।

জ্বালানি সহযোগিতা ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগে জোর

হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করবেন রুবিও।

  • কৌশলগত অংশীদারিত্ব: ভারত ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।
  • আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি: বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়ে মতবিনিময়।
  • জ্বালানি সহযোগিতা: জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা।

এ ছাড়াও ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন মার্কিন বিদেশ সচিব। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করাই এই বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য।

ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কী পরিস্থিতি?

ভারত ও আমেরিকার মধ্যে প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বা BTA নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামো ঘোষণার পর দুই দেশ চুক্তির প্রথম পর্যায় চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আমেরিকার পরিবর্তিত শুল্ক পরিস্থিতির কারণে সেই প্রক্রিয়ায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

চলতি অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে চুক্তির কাঠামো ঘোষণার সময় যে পরিস্থিতি ছিল, তা বদলেছে। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করেই চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে।

সংবাদ সংস্থা PTI-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্পমহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় গোয়েল এই মন্তব্য করেন। তবে ঠিক কোন কোন পরিস্থিতির পরিবর্তনের কথা তিনি বলেছেন, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি।

ভারতের অন্যতম লক্ষ্য হল, আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর প্রতিযোগী দেশগুলির তুলনায় কম শুল্ক নিশ্চিত করা। ফলে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে দুই দেশের আলোচনায় শুল্কের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

H-1B ভিসা ও গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া ঘিরে টানাপোড়েন

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে সাম্প্রতিক উদ্বেগের আরেকটি কারণ হল মার্কিন অভিবাসন নীতি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রশাসন H-1B ভিসা সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তন এনেছে। এর মধ্যে ১ লক্ষ ডলারের ভিসা ফি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও রয়েছে, যা আমেরিকায় কাজ করতে আগ্রহী বহু ভারতীয়ের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

পাশাপাশি, PERM বা Permanent Labor Certification কর্মসূচি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, Microsoft, Infosys, Cognizant, Tata, Wipro, HCL Technologies, Capgemini এবং Adobe-সহ একাধিক বড় প্রযুক্তি সংস্থা ও IT পরিষেবা সংস্থার ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলেছে।

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আমেরিকার সংস্থাগুলিকে আরও বেশি মার্কিন কর্মী নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক মন্তব্যগুলিকে ‘গভীরভাবে অপমানজনক’ বলে অভিহিত করেছে।

এই অভিবাসন সংক্রান্ত বিতর্ক এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা রুবিওর ভারত সফরের প্রেক্ষাপটকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

পীযূষ গোয়েলের দাবি, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ‘খুব ভালো’

বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাম্প্রতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। বুধবার নয়াদিল্লিতে Bloomberg New Economy Forum-এ তিনি বলেন, আমেরিকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব ভালো এবং এই মুহূর্তে তিনি কোনও সমস্যা দেখছেন না।

গোয়েলের বক্তব্য, বিশ্বের দুই বৃহৎ গণতন্ত্র হিসেবে ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, পণ্য ও পরিষেবার সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমেরিকা ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং ভবিষ্যতেও এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলে তিনি মনে করেন। শুধু বাণিজ্য নয়, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতার ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।

গোয়েলের এই বক্তব্যের লক্ষ্য হল, সাম্প্রতিক মতপার্থক্যের কারণে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে, এমন আশঙ্কা প্রশমিত করা।

উজবেকিস্তান সফরে কী করবেন মার্কো রুবিও?

ভারত সফরের পাশাপাশি উজবেকিস্তানেও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কর্মসূচি রয়েছে মার্কিন বিদেশ সচিবের। সেখানে তিনি C5+1 মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন।

এই কূটনৈতিক মঞ্চে আমেরিকা এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা কীভাবে আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করতে পারে, তা তুলে ধরবেন রুবিও।

এ ছাড়াও C5 গোষ্ঠীর পাঁচটি দেশ, অর্থাৎ উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং কিরঘিজ প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি।

মার্কো রুবিওর এই সফরে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি, জ্বালানি সহযোগিতা এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তবে ভিসা নীতি ও শুল্ক নিয়ে সাম্প্রতিক মতপার্থক্য আলোচনায় কতটা প্রভাব ফেলে, তা স্পষ্ট হবে সফর চলাকালীন দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও বৈঠকের ফলাফল সামনে এলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *