‘আমি দিল্লিতে থাকলে তারেকের আসতে বাধা কোথায়?’ ব্রিকস বিতর্কে তোপ হাসিনার
নয়াদিল্লি: ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান কি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? এই প্রশ্ন তুলেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলেন সে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, কোনও একজন ব্যক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণে দু’টি দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও জাতীয় স্বার্থকে পিছনে ফেলে রাখা উচিত নয়। ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে ‘অপরিণত সিদ্ধান্ত’ বলেও কটাক্ষ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও হাতছাড়া হয়েছে।
১৪ অক্টোবর সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানো হাসিনা। তাঁর বক্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কের টানাপড়েন। বিশেষ করে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অনুপস্থিতির পর দিল্লিতে আয়োজিত বিমসটেকের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের যোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: পিটিআই, দ্য ট্রিবিউন
তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাসিনা। কূটনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, হাসিনা ভারতে রয়েছেন বলেই দিল্লি যেতে আগ্রহী হননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সেই যুক্তি মানতে নারাজ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
এই প্রসঙ্গে নিজের পরিবারের অতীতের উদাহরণ টেনেছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন হাসিনা। সেই সময় দিল্লিতে তাঁর অবস্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভারত সফরে বাধা তৈরি হয়নি বলে দাবি তাঁর। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের দিল্লি সফর এবং ১৯৮০ সালে তাঁর লন্ডন সফরের কথা উল্লেখ করে হাসিনা প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁর উপস্থিতি যদি অতীতে সফরের অন্তরায় না হয়ে থাকে, তা হলে এখন তারেক রহমানের ভারত সফরে সমস্যা কোথায়?
হাসিনার বক্তব্য, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিরোধ বা সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক পরিচালনা করা উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
ব্রিকসে যোগ না দেওয়ার কারণ কী জানিয়েছিল ঢাকা?
গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারতীয় পক্ষের বক্তব্য ছিল, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সম্ভাবনাও খোলা ছিল।
কিন্তু আমন্ত্রণের ব্যাখ্যা নিয়েই আপত্তি তোলে ঢাকা। বাংলাদেশের বক্তব্য ছিল, তারেক রহমানকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরাসরি আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; আমন্ত্রণটি এসেছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যানের পরিচয়ে। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও প্রকাশ্যে এই পার্থক্যের কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হলে তা দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবেই হওয়া উচিত।
শেষ পর্যন্ত ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি দল যোগ দেয়নি। হাসিনার মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ নষ্ট হয়েছে। তবে ঢাকা যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, তা আমলে নিলে বোঝা যায়, বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু হাসিনার ভারতে থাকা নয়, আমন্ত্রণের কূটনৈতিক মর্যাদা নিয়েও মতপার্থক্য ছিল।
বিমসটেক বৈঠকেও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপস্থিত
ব্রিকস বিতর্কের রেশ কাটার আগেই ১৩ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের অনুপস্থিতি নজরে আসে। তাঁর পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সিনিয়র সচিব মনজুর মোরশেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল পাঠায় ঢাকা। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে বিমসটেক সচিবালয়কে এই প্রতিনিধি দলের কথা জানানো হয়েছিল।
বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের এই সংগঠনের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্তপারের অপরাধ, মানবপাচার, মাদক পাচার, সাইবার অপরাধ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে গৃহীত হয় দিল্লি ঘোষণা। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আয়োজিত বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। সূত্র: ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো
তবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতির কারণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সঙ্গে সিদ্ধান্তটির সরাসরি যোগসূত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রসঙ্গ উঠে এলেও, সেটিই একমাত্র কারণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
হাসিনার অবস্থান ঘিরে অস্বস্তি দুই দেশের সম্পর্কে
২০২৪ সালের অগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। তার পর থেকে তাঁকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে ঢাকা। অন্যদিকে, হাসিনা তাঁর বিরুদ্ধে চলা বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভারতে অবস্থান দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই রায় ও প্রত্যর্পণের দাবি দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির অন্যতম কারণ।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের অনুপস্থিতি এবং বিমসটেক বৈঠকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বদলে আমলাদের প্রতিনিধি দলের যোগদান নতুন করে কূটনৈতিক প্রশ্ন তুলেছে। হাসিনার বক্তব্য, বাংলাদেশের বিদেশনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিরোধের বদলে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। কিন্তু ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে দুই পক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন নজর সেদিকেই।
রবিউলের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান! ১ মাস ধরে নিখোঁজ বাংলাদেশের হিন্দু ছাত্রী রুপা
নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে বিক্ষোভের মুখে ইউনূস! ‘জঙ্গি’, ‘খুনি’ স্লোগান তুলল প্রবাসীরা