IPL স্টেডিয়ামে আলো-শব্দের নতুন প্রযুক্তি, ভারতে চালু কবে?
কলকাতা, ১৩ অক্টোবর: ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আলো ও শব্দের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতে যৌথ উদ্যোগ নিচ্ছে সিগনিফাই এবং বোস প্রফেশনাল। তবে আপাতত ভারতের স্টেডিয়ামগুলিতে এই যৌথ পরিষেবা চালুর কোনও নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি দুই সংস্থা। ৯ অক্টোবর ২০২৬ সিঙ্গাপুরে একটি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে এই উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সেখানকার প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বাজারে পরিষেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য স্টেডিয়াম, হোটেল, বিপণিবিতান এবং অফিসে উন্নত আলোকসজ্জা ও পেশাদার অডিও ব্যবস্থা একসঙ্গে সরবরাহ করা। ফলে ভবিষ্যতে আইপিএলের মতো বড় ক্রিকেট প্রতিযোগিতার স্টেডিয়ামগুলিতেও আলো ও শব্দের সমন্বিত ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ভারতে এই পরিষেবা কবে চালু হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
কেন প্রথমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে বেছে নিল দুই সংস্থা?
বোস প্রফেশনালের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক রপ্তানি বাজারের আঞ্চলিক ডিরেক্টর নিত্তিন দারগান জানিয়েছেন, প্রথম পর্যায়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ভারতের মতো বড় ও জটিল বাজারের তুলনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম প্রকল্প বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ।
দুই সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার জন্য কর্মী, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বিক্রয় সহযোগী এবং প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। তাই শুরুতেই একাধিক বড় বাজারে পরিষেবা চালু করার বদলে একটি অঞ্চলে কার্যকর মডেল তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।
দারগানের বক্তব্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সফল প্রকল্প তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে এই পরিষেবা আন্তর্জাতিক স্তরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিগনিফাইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আস টেম্পেলম্যানও জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের কার্যকারিতা যাচাই করতে প্রায় ১২ মাস সময় ধরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, দুই সংস্থার ঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের অক্টোবর নাগাদ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরীক্ষামূলক পর্যায়ের অভিজ্ঞতা পাওয়া যেতে পারে। তবে এটি ভারতে পরিষেবা চালুর ঘোষিত সময়সীমা নয়।

১৮০ দিনের পরিকল্পনায় কী থাকছে?
৯ অক্টোবরের সমঝোতাপত্র অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ১৮০ দিনের একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট বাজার চিহ্নিত করা, প্রথম কয়েকটি প্রদর্শনমূলক প্রকল্প তৈরি করা এবং সরাসরি প্রযুক্তি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।
এই সময়সীমা ধরে এগোলে ২০২৭ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে প্রাথমিক পরিকল্পনার পর্যায় শেষ হওয়ার কথা। তবে ১৮০ দিনের পরিকল্পনা শেষ হওয়া এবং সম্পূর্ণ ১২ মাসের আঞ্চলিক পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষ হওয়া এক বিষয় নয়।
টেম্পেলম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না, বিক্রয় ও পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে। স্টেডিয়ামের মতো বড় প্রকল্পে সাধারণত পরামর্শদাতা, সিস্টেম ইন্টিগ্রেটর এবং প্রযুক্তি ইনস্টল করার সংস্থাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুই সংস্থাকে সেই অংশীদারদের একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।
আলো ও শব্দ একসঙ্গে কীভাবে কাজ করবে?
এই অংশীদারিত্বে সিগনিফাই সরবরাহ করবে ইন্টারঅ্যাক্ট, ডাইনালাইট এবং কালার কিনেটিক্সের মতো সংযুক্ত আলোকসজ্জা প্রযুক্তি। অন্যদিকে, বোস প্রফেশনাল দেবে লাউডস্পিকার, অ্যামপ্লিফায়ার এবং কন্ট্রোলস্পেস অডিও প্রসেসিং ব্যবস্থা।
সাধারণত বড় স্টেডিয়ামে আলো ও শব্দের ব্যবস্থা আলাদা ঠিকাদার বা প্রযুক্তি সংস্থার মাধ্যমে তৈরি হয়। ফলে নকশা, তারের বিন্যাস, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ইনস্টলেশনের সময়সূচির মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে। নতুন উদ্যোগে শুরু থেকেই দুটি ব্যবস্থাকে একসঙ্গে পরিকল্পনা করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সিগনিফাইয়ের অ্যারেনাভিশন ফ্লাডলাইট ইন্টারঅ্যাক্ট স্পোর্টস সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ম্যাচের আগে, খেলার বিরতিতে কিংবা ম্যাচ শেষে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী আলোর প্রদর্শনী চালানো সম্ভব। বোস প্রফেশনালের অডিও ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে সেই আলোর প্রদর্শনী সঙ্গীতের তালের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচালনা করা যেতে পারে।
এতে স্টেডিয়ামে দর্শকদের অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয় করে তোলার সুযোগ থাকবে। শুধু ক্রিকেট বা ফুটবল নয়, কনসার্ট, হোটেল, অভিজ্ঞতাভিত্তিক বিপণন কেন্দ্র এবং আধুনিক অফিসেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভারতের ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আগে থেকেই রয়েছে দুই সংস্থার কাজ
ভারতে সিগনিফাই এবং বোস প্রফেশনালের পৃথক প্রকল্প রয়েছে। তবে এই প্রকল্পগুলি যৌথ উদ্যোগের অংশ নয়।
আমদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে ৫৮০টি ফিলিপস অ্যারেনাভিশন এলইডি ফ্লাডলাইট সরবরাহ করেছিল সিগনিফাই। স্টেডিয়ামটিতে সর্বোচ্চ ১,১০,০০০ দর্শক বসতে পারেন। সংস্থাটির দাবি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সম্প্রচার সংক্রান্ত মান পূরণ করা এলইডি আলো ব্যবহার করা ভারতের প্রথম ক্রিকেট স্টেডিয়াম এটি।
অন্যদিকে, রাজস্থানের নাথদ্বারায় ৩৪,০০০ আসনবিশিষ্ট মদন পালিওয়াল মিরাজ স্পোর্টস সেন্টারের অডিও ব্যবস্থা তৈরি করেছে বোস প্রফেশনাল। সেখানে অ্যারেনা ম্যাচ লাউডস্পিকার এবং শো ম্যাচ সাবউফার ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু স্পিকার মাটি থেকে প্রায় ৩০ মিটার উচ্চতায় বসানো রয়েছে। কনসার্টের সময় এই ব্যবস্থায় শব্দের মাত্রা ১০০ ডেসিবেলেরও বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই দুটি প্রকল্পই আলাদা চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থাৎ, ভারতে স্টেডিয়ামের আলো ও শব্দের জন্য বর্তমানে দুই সংস্থার প্রযুক্তি থাকলেও সেগুলি যৌথভাবে সরবরাহ করার নতুন মডেল এখনও চালু হয়নি।
আইপিএলের মাঠে কবে দেখা যেতে পারে এই প্রযুক্তি?
ভারতে এই যৌথ পরিষেবা চালুর কোনও নির্দিষ্ট তারিখ দুই সংস্থার তরফে জানানো হয়নি। ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ২০২৭ সালের এপ্রিলের গোড়ার দিকে শেষ হওয়ার কথা। আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ১২ মাসের পরীক্ষামূলক পর্যায় চললে তা ২০২৭ সালের অক্টোবর নাগাদ শেষ হতে পারে।
ফলে ২০২৭ সালের আইপিএল মরশুমের মধ্যেই এই যৌথ ব্যবস্থা ভারতের স্টেডিয়ামগুলিতে চালু হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনও ভারতীয় স্টেডিয়াম তার আগে নতুন আলো বা শব্দের ব্যবস্থা কিনতে চাইলে আপাতত আলাদা সরবরাহকারীর কাছ থেকেই সেই পরিষেবা নিতে হবে।
সিগনিফাইয়ের ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়িক পরিকাঠামো, পরিবেশক, ইনস্টলার এবং ৩৭৩টি ফিলিপস স্টোর রয়েছে বলে টেম্পেলম্যান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, বোস প্রফেশনালের ভারতেও ব্যবসায়িক সহযোগী রয়েছে। তবু দুই সংস্থার যৌথ পরিষেবা চালু করতে হলে ভারতের বাজারের জন্য আলাদা পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত অংশীদার এবং ইনস্টলেশন ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।
সিগনিফাই ও বোস প্রফেশনালের উদ্যোগ স্টেডিয়ামের আলো এবং শব্দকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনার একটি পদক্ষেপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ফলাফলই ঠিক করতে পারে এই মডেল কত দ্রুত অন্য বাজারে ছড়িয়ে পড়বে। ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য আপাতত অপেক্ষা করতে হবে, কারণ আইপিএলের মাঠে এই যৌথ প্রযুক্তি কবে দেখা যাবে, তার উত্তর এখনও মেলেনি।
Get your daily dose of tech news and insight. Follow us on X, Facebook, WhatsApp and Google News for instant updates. Catch all the action on our YouTube channel.