লাদাখের দুর্গম সীমান্তে নজরদারি ও হামলার ক্ষমতা বাড়াতে ২২৫ ড্রোন কিনছে সেনা - 24 Ghanta Bangla News
Home

লাদাখের দুর্গম সীমান্তে নজরদারি ও হামলার ক্ষমতা বাড়াতে ২২৫ ড্রোন কিনছে সেনা

Spread the love

কলকাতা, ১৩ অক্টোবর: লাদাখের দুর্গম ও উচ্চ পার্বত্য সীমান্তে নজরদারি এবং সামরিক অভিযানের সক্ষমতা বাড়াতে ২২৫টি এফপিভি বা ফার্স্ট পারসন ভিউ ড্রোন কেনার বরাত দিয়েছে ভারতীয় সেনা (Indian Army)। গুরুগ্রামের সংস্থা অ্যারোড্রোন রোবোটিক্স প্রাইভেট লিমিটেড এই ড্রোনগুলি সরবরাহ করবে। সেনার প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সংস্থাটি এই বরাত পেয়েছে। পরীক্ষার সময় ড্রোনগুলি ১৭,৫০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত উড়েছে।

লাদাখের বহু সেনা পোস্ট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮,০০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। সেখানে প্রতিকূল আবহাওয়া, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে নজরদারি ও রসদ পৌঁছে দেওয়া যথেষ্ট কঠিন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ওই অঞ্চলে সেনার মোতায়েন বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে সীমান্ত এলাকায় ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে চিনও। ফলে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি হাতে রাখা ভারতের সামরিক আধুনিকীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

১৭,৫০০ ফুট উচ্চতায় পরীক্ষা, কী কাজ করবে নতুন ড্রোন?

অ্যারোড্রোন রোবোটিক্সের প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রণদীপ হুন্ডালের নেতৃত্বে সংস্থাটি সামরিক ড্রোন তৈরি করে। দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ের পরীক্ষার মাধ্যমে এই বরাত চূড়ান্ত হয়েছে। পরীক্ষায় ড্রোনগুলির উড়ানের স্থায়িত্ব, নির্ভুলতা, গতি এবং অন্যান্য কার্যকরী সক্ষমতা যাচাই করা হয়।

তবে পরীক্ষার সময় ১৭,৫০০ ফুট উচ্চতায় উড়তে পারা মানেই ড্রোনগুলির অনুমোদিত সর্বোচ্চ কার্যকরী উচ্চতা সেটাই, এমন নয়। পরীক্ষার উচ্চতা এবং সেনার ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ উচ্চতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

এফপিভি ড্রোনে ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি দৃশ্য দেখে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সামরিক অভিযানে এগুলি নজরদারি, লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আক্রমণ চালানোর কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। হালকা ও বহনযোগ্য হওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনাদের সঙ্গে এই ড্রোন নিয়ে যাওয়াও তুলনামূলকভাবে সহজ।

হিমালয়ে ড্রোন ওড়ানো এত কঠিন কেন?

উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ড্রোন চালানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল পাতলা বাতাস এবং তীব্র ঠান্ডা। সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় বায়ুর ঘনত্ব প্রায় ৪০ শতাংশ কম থাকে। ফলে ড্রোনের প্রপেলার কম বাতাসের মধ্যে কাজ করে এবং পর্যাপ্ত লিফট ও থ্রাস্ট তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে ড্রোনের মোটর বেশি গরম হয়ে যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী বড় বা ভিন্ন ধরনের প্রপেলার এবং মোটরের বিন্যাস ব্যবহার করতে হয়। তবে তাতে বিদ্যুতের খরচও বাড়তে পারে।

ঠান্ডা আবহাওয়ায় লিথিয়াম-ভিত্তিক ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমে যায়। ব্যাটারির ভোল্টেজ দ্রুত কমতে পারে এবং ব্যবহারযোগ্য চার্জের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটারির ক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থার প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। তাই উড়ানের আগে ব্যাটারি গরম রাখা এবং উড়ানের সময় তাপ নিরোধক ব্যবস্থা ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া পাহাড়ের খাঁজ, উঁচু শৈলশিরা এবং পাথুরে চূড়া রেডিও সিগন্যাল আটকে দিতে পারে। ফলে ড্রোনের ভিডিও বা নিয়ন্ত্রণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রেডিও তরঙ্গের বাধা বা জ্যামিংও এফপিভি ড্রোনের কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

চিনের সঙ্গে সীমান্তে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি?

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর ভারত ও চিনের সেনা উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। এই এলাকায় নজরদারি চালানো এবং দূরবর্তী সেনা পোস্টে রসদ পৌঁছে দেওয়া সব সময় সহজ নয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় সেনা, খচ্চর এবং চিতা হেলিকপ্টারের মতো পুরনো হেলিকপ্টারের উপর নির্ভর করতে হয়।

হেলিকপ্টারে রসদ পাঠানোর খরচ বেশি এবং আবহাওয়ার কারণে উড়ান বাতিলও হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু কাজে ড্রোন তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত রসদ পৌঁছে দিতে পারে। পাশাপাশি শত্রুপক্ষের গতিবিধি আগে থেকে শনাক্ত করতে পারলে সেনাদের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ে।

চিনও সীমান্তে নজরদারি, নিরাপত্তা, রসদ পরিবহণ এবং জরুরি পরিষেবায় ড্রোন ব্যবহারের উপর জোর দিচ্ছে। মাউন্ট এভারেস্টের কাছে ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার জন্য চিনের একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার খবরও সামনে এসেছে। তবে ভারতীয় সেনার নতুন ড্রোনের কার্যক্ষমতা ও চিনের ব্যবহৃত ড্রোনের মধ্যে সরাসরি তুলনা করতে হলে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত তথ্য প্রয়োজন।

দেশীয় ড্রোন নির্মাতাদের উপর বাড়ছে নির্ভরতা

ভারতে সামরিক ড্রোন নির্মাণে একাধিক দেশীয় সংস্থা কাজ করছে। অ্যারোড্রোন রোবোটিক্স সামরিক নজরদারি, যুদ্ধ এবং রসদ পরিবহণের জন্য ড্রোন তৈরি করে। সংস্থাটির দাবি, তাদের প্ল্যাটফর্মে নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সামরিক প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি বদলানো সম্ভব।

এ ছাড়া অ্যাপোলিয়ন ডায়নামিক্স, কোয়ান্টাম টেক, ড্রোনইয়ার্ডস এবং রাইজিং স্টারের মতো সংস্থার ড্রোন সেনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে একটি সামরিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। অপটিমাস-সহ আরও কয়েকটি সংস্থার ড্রোন পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে বলে ওই গবেষণায় জানানো হয়েছে।

গবেষণায় একটি সংস্থার অন্তর্ভুক্ত ড্রোনের কাঠামোর দাম প্রায় ১.৪ লক্ষ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি একটি নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর দামের তথ্য, ২২৫টি ড্রোনের বর্তমান বরাতের মোট খরচ নয়। এই বরাতের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি।

অপারেশন সিঁদুরের পর সেনার আধুনিকীকরণে ড্রোনের গুরুত্ব

ভারতীয় সেনার আধুনিকীকরণ কর্মসূচিতে ড্রোন এবং ড্রোন-বিরোধী প্রযুক্তি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অপারেশন সিঁদুরের সক্রিয় পর্যায়ের পর সেনা নজরদারি, চালকবিহীন ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং দ্রুত সরঞ্জাম কেনার উপর আরও জোর দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেনার প্রতিটি পদাতিক ব্যাটালিয়নে অশনি ড্রোন প্লাটুন গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই প্লাটুনগুলি নজরদারি এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আক্রমণাত্মক অভিযানে ড্রোন ব্যবহার করতে পারে। পাশাপাশি চালকবিহীন আকাশযানের অন্তর্ভুক্তি, উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সেনায় বিশেষ ব্যবস্থাও তৈরি করা হচ্ছে।

ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি শত্রুপক্ষের ড্রোন আটকানোর প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। রেডিও-নিয়ন্ত্রিত ড্রোনকে জ্যামিংয়ের মাধ্যমে অকার্যকর করা, বন্দুক বা স্বল্পমূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা এবং ড্রোনের ঝাঁক ব্যবহার করার মতো পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডিআরডিও লেজার-ভিত্তিক ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থাও তৈরি করেছে।

লাদাখে ২২৫টি এফপিভি ড্রোন কেনার বরাত ভারতীয় সেনার ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাকে বাস্তব সরবরাহের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার একটি পদক্ষেপ। উচ্চ পার্বত্য সীমান্তে নজরদারি, পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানে এই প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় নির্মাতাদের অংশগ্রহণ বাড়লে ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার লক্ষ্যও এগিয়ে যেতে পারে।

Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *