ডিজেল থেকেই হাইড্রোজেন, সেনার গাড়ি ও শিবিরে বিদ্যুৎ জোগাতে নতুন প্রযুক্তি
কলকাতা, ১৩ অক্টোবর ২০২৬: ডিজেলকে ব্যবহার করেই হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ গ্যাস (Hydrogen Technology) তৈরি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। জার্মানির বিজ্ঞানীরা এমনই একটি নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে জাহাজের পাশাপাশি সামরিক যানবাহন, নজরদারি ব্যবস্থা এবং দুর্গম এলাকায় সেনা শিবিরে বিদ্যুৎ সরবরাহে কাজে লাগতে পারে। এই প্রযুক্তির বিশেষত্ব হল, আলাদা করে হাইড্রোজেন সংরক্ষণের বড় ট্যাঙ্ক ছাড়াই জ্বালানি থেকে হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি করে ফুয়েল সেলের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
জার্মানির মাইনৎস শহরে অবস্থিত ফ্রাউনহোফার ইনস্টিটিউট ফর মাইক্রোইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মাইক্রোসিস্টেমস বা আইএমএম এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে। জার্মানির ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কেন্দ্রীয় উদ্ভাবন কর্মসূচি বা জেডআইএম-এর অর্থায়নে ডিমারিট গবেষণা প্রকল্পের অধীনে কাজটি হয়েছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য সামুদ্রিক ক্ষেত্রে ফুয়েল সেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা তৈরি করা।
গবেষকদের দাবি, এই ডিজেল রিফর্মার ও ফুয়েল সেল ব্যবস্থা ২৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আগামী ২০ থেকে ২২ অক্টোবর ২০২৬-এ হামবুর্গে অনুষ্ঠিত হাইড্রোজেন টেকনোলজি ওয়ার্ল্ড এক্সপোতে প্রযুক্তিটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কীভাবে ডিজেল থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করবে এই ব্যবস্থা?
সাধারণ ডিজেল জেনারেটরে জ্বালানি পুড়িয়ে ইঞ্জিন চালানো হয়। সেই যান্ত্রিক শক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াটি আলাদা।
এখানে প্রথমে জাহাজে থাকা ডিজেলকে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে রূপান্তর করে হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি করা হয়। এই যন্ত্রটিকেই বলা হচ্ছে ডিজেল রিফর্মার। এরপর গ্যাসটি আরও প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে যায়, যাতে তা ফুয়েল সেলে ব্যবহার করা যায়।
হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যে তড়িৎ-রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। প্রচলিত ইঞ্জিনের মতো এখানে জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি তৈরি করা হয় না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতিতে বড় ধরনের যান্ত্রিক চলাচলের প্রয়োজন হয় না।
এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হল, জাহাজে আলাদা করে হাইড্রোজেন রাখার জন্য বিশেষ ট্যাঙ্কের প্রয়োজন কমতে পারে। জাহাজের মতো সীমিত জায়গার যানবাহনে অতিরিক্ত ট্যাঙ্ক বসানো কঠিন। পাশাপাশি হাইড্রোজেন সংরক্ষণ ও সরবরাহের জন্য আলাদা পরিকাঠামোও প্রয়োজন হয়। ডিজেল থেকেই হাইড্রোজেনসমৃদ্ধ গ্যাস তৈরি করা গেলে সেই জটিলতা কিছুটা কমানো সম্ভব।
সেনাবাহিনীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
এই প্রযুক্তি সামরিক ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছে ফ্রাউনহোফার আইএমএম। সেনাবাহিনীকে অনেক সময় এমন জায়গায় কাজ করতে হয়, যেখানে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। দূরবর্তী সেনা শিবির, কমান্ড যানবাহন এবং নজরদারি ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত ডিজেল জেনারেটরে ইঞ্জিনের শব্দ এবং তাপ উৎপন্ন হয়। সামরিক অভিযানের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই শব্দ ও তাপ কোনও অবস্থানের উপস্থিতি শনাক্ত করা সহজ করে দিতে পারে। অন্যদিকে, ডিজেল রিফর্মার ও ফুয়েল সেল ব্যবস্থায় বড় আকারের চলমান যন্ত্রাংশ তুলনামূলক কম থাকায় শব্দ এবং তাপের চিহ্ন কমানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারগুলির মধ্যে রয়েছে কমান্ড ও নজরদারি যানবাহনে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং মাঠপর্যায়ের সেনা শিবিরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা। তবে এই ব্যবহারগুলি এখনও সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রযুক্তিটি সামরিক অভিযানে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব পরিবেশে এর পরীক্ষা, নির্ভরযোগ্যতা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতার উপর।
ডিজেলের সহজলভ্যতা বাড়তি সুবিধা
সামরিক ক্ষেত্রে জ্বালানির সহজলভ্যতা এবং সরঞ্জামের ওজন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বহু সামরিক যানবাহন ও জেনারেটরে ডিজেল ব্যবহার করা হয়। ফলে ডিজেলকে নতুন ব্যবস্থায় কাজে লাগানো গেলে আলাদা হাইড্রোজেন সরবরাহের উপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, কম শব্দ, কম তাপ নির্গমন এবং কম ওজনের মতো বৈশিষ্ট্য এই প্রযুক্তিকে সামরিক ব্যবহারের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। তবে প্রকৃত ওজন, জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার ক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
সিন্থেটিক ডিজেল ব্যবহার নিয়েও গবেষণা
ডিমারিট প্রকল্পে গবেষকরা শুধু জ্বালানি রূপান্তরের প্রক্রিয়া পরীক্ষা করেননি। ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, তাপ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও যন্ত্রাংশের নির্ভরযোগ্যতা কীভাবে বজায় রাখা যায়, তা নিয়েও গবেষণা হয়েছে।
পাশাপাশি, এই রিফর্মারে সিন্থেটিক ডিজেল ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উপযুক্ত সিন্থেটিক জ্বালানি ব্যবহার করা গেলে ভবিষ্যতে প্রচলিত ডিজেলের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির সাহায্যেও ব্যবস্থা চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সামনে কী পরিকল্পনা বিজ্ঞানীদের?
হামবুর্গের হাইড্রোজেন টেকনোলজি ওয়ার্ল্ড এক্সপোতে ডিজেল রিফর্মারের পাশাপাশি আরও কয়েকটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করবে ফ্রাউনহোফার আইএমএম। এর মধ্যে রয়েছে মিথানল রিফর্মার, অ্যামোনিয়া থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদনের প্রযুক্তি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মিথেন তৈরির ব্যবস্থা।
নতুন ডিজেল রিফর্মার প্রযুক্তি জাহাজে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও বিকল্প শক্তির ব্যবস্থা তৈরি করার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে এটিকে এখনও পরীক্ষাধীন প্রযুক্তি হিসেবেই দেখা উচিত। বাস্তব ব্যবহারে এর দক্ষতা, খরচ, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণিত হলেই বোঝা যাবে, প্রচলিত ডিজেল জেনারেটরের বিকল্প হিসেবে এটি কতটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business