আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী! অবসরের আগে তেজস যুদ্ধবিমানে শেষ উড়ান এপি সিংয়ের
অবসরের আগে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তেজস যুদ্ধবিমানে শেষবারের মতো উড়ান সম্পন্ন করলেন ভারতীয় বায়ুসেনাপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিং। রবিবার রাজস্থানের যোধপুরে ‘তরঙ্গ শক্তি ২০২৬’ মহড়া চলাকালীন এই উড়ান সম্পন্ন করেন তিনি। আগামী ৩১ অক্টোবর তাঁর অবসর নেওয়ার কথা। দীর্ঘ সামরিক জীবনে বিমান চালানোর প্রতি ভালোবাসা এবং দেশের সেবায় আত্মনিয়োগের যে পরিচয় তিনি দিয়েছেন, এই শেষ যুদ্ধবিমান উড়ান তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল।
ভারতীয় বায়ুসেনা সামাজিক মাধ্যমে এই বিশেষ মুহূর্তের কথা জানিয়েছে। বায়ুসেনার তরফে বলা হয়েছে, এপি সিংয়ের উড়ান জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা এটি। তাঁর এই উড়ান ছিল দেশীয় তেজস হালকা যুদ্ধবিমানে, যে বিমানের পরীক্ষামূলক উড়ান কর্মসূচির সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
যোধপুরে তরঙ্গ শক্তি মহড়ায় শেষ উড়ান
রবিবার যোধপুরে অনুষ্ঠিত বহুজাতিক বিমান মহড়া ‘তরঙ্গ শক্তি ২০২৬’-এর সময় তেজস যুদ্ধবিমান নিয়ে আকাশে ওড়েন এপি সিং। এই মহড়ায় অংশগ্রহণকারী বন্ধুদেশের যুদ্ধবিমানগুলির পাশাপাশি সূর্যকিরণ অ্যারোবেটিক দলের বিমানও তাঁর উড়ানের সঙ্গে ছিল বলে জানিয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা।
বায়ুসেনার বার্তায় তাঁর দীর্ঘ উড়ান জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, অবসরের পরেও দেশের প্রতি তাঁর সেবা ও দায়বদ্ধতা শেষ হবে না। বার্তার শেষে বায়ুসেনা জানিয়েছে, একজন যুদ্ধবিমানের পাইলট সব সময়ই যুদ্ধবিমানের পাইলট থাকেন।
এপি সিংয়ের এই উড়ান তাই কেবল অবসরের আগে একটি আনুষ্ঠানিক উড়ান নয়। দেশীয় যুদ্ধবিমান তেজসের সঙ্গে তাঁর পেশাগত সম্পর্ক এবং দীর্ঘ সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতার কারণেও ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কী এই তরঙ্গ শক্তি ২০২৬?
‘পাওয়ার ইন পার্টনারশিপ’ বা অংশীদারিত্বের শক্তি, এই মূল ভাবনাকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের তরঙ্গ শক্তি মহড়ার আয়োজন করা হয়েছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত যোধপুরের এয়ার ফোর্স স্টেশনে চলে এই মহড়া।
এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন দেশের বায়ুসেনার মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণ, আকাশপথে সমন্বিত কৌশল অনুশীলন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী বাহিনীগুলির অপারেশনাল সক্ষমতা তুলে ধরা এবং একসঙ্গে কাজ করার দক্ষতা উন্নত করাও ছিল এই মহড়ার অন্যতম লক্ষ্য।
বহুজাতিক এই আয়োজনের মধ্যে বায়ুসেনাপ্রধানের তেজস উড়ান দেশীয় যুদ্ধবিমানের গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
পরীক্ষামূলক উড়ান থেকেই তেজসের সঙ্গে সম্পর্ক
এয়ার চিফ মার্শাল এপি সিংয়ের তেজস যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সম্পর্ক বহু পুরনো। তিনি ১৯৮৪ সালের ২১ ডিসেম্বর ভারতীয় বায়ুসেনায় কমিশন লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি একজন যোগ্য ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টর এবং পরীক্ষামূলক উড়ানের পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
বায়ুসেনাপ্রধান হওয়ার আগে তাঁর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বায়ুসেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর স্থিরপক্ষ ও ঘূর্ণিপাখার বিমান মিলিয়ে ৫,০০০ ঘণ্টারও বেশি উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল।
তিনি ২২ নম্বর স্কোয়াড্রনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় স্কোয়াড্রনটি মিগ-২৭ যুদ্ধবিমানে সজ্জিত ছিল। পরে মস্কোতে মিগ-২৯ আপগ্রেড প্রকল্প পরিচালনাকারী দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। এ ছাড়া এয়ারক্রাফট অ্যান্ড সিস্টেমস টেস্টিং এস্টাবলিশমেন্টে প্রধান পরীক্ষামূলক পাইলট হিসেবেও কাজ করেছেন।
তবে তেজসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ফ্লাইট টেস্ট সেন্টারে প্রকল্প পরিচালক বা প্রজেক্ট ডিরেক্টর (ফ্লাইট টেস্ট) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তেজসের পরীক্ষামূলক উড়ানের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।
তেজস প্রকল্পে ADA, HAL ও বায়ুসেনার ভূমিকা
ভারতের দেশীয় হালকা যুদ্ধবিমান তেজসের নকশা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি বা ADA প্রধান ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা HAL এই যুদ্ধবিমানের উৎপাদনের প্রধান অংশীদার।
ভারতীয় বায়ুসেনার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে বিমানের অপারেশনাল চাহিদা নির্ধারণ, পাইলট সরবরাহ এবং ব্যবহারকারী হিসেবে বিমানটির কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন করা। এপি সিংয়ের পরীক্ষামূলক উড়ানের অভিজ্ঞতার কারণে তেজস প্রকল্পের প্রযুক্তিগত ও পরিচালনাগত বিষয়গুলি সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ ধারণা রয়েছে।
তেজস সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে HAL-এর সমালোচনা করার ক্ষেত্রেও তাঁর এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। কারণ, ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। নতুন যুদ্ধবিমান সময়মতো হাতে পাওয়া তাই বায়ুসেনার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এপি সিং মিগ-২১ যুদ্ধবিমানও চালিয়েছেন। তিনি ভারতীয় বায়ুসেনার শেষ বায়ুসেনাপ্রধান, যিনি এই যুদ্ধবিমান উড়িয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে মিগ-২১ দুর্ঘটনা বাড়তে শুরু করার পর এয়ার চিফ মার্শাল এওয়াই টিপনিসের সময় থেকে এই বিশেষ রীতির সূচনা হয়েছিল বলে জানা যায়।
৩১ অক্টোবর নতুন বায়ুসেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ
এপি সিংয়ের অবসরের পর ভারতীয় বায়ুসেনার পরবর্তী প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন বর্তমানে বায়ুসেনার ভাইস চিফ এয়ার মার্শাল আশুতোষ দীক্ষিত। তাঁকে এয়ার চিফ মার্শাল পদমর্যাদায় পরবর্তী চিফ অফ দ্য এয়ার স্টাফ হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। ৩১ অক্টোবর বিকেল থেকে তাঁর নিয়োগ কার্যকর হবে।
অন্যদিকে, ৯ অক্টোবর একটি সেমিনারে বক্তব্য রাখেন এপি সিং। তরঙ্গ শক্তি মহড়া এবং ভারতীয় বায়ুসেনার ৯৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সেন্টার ফর অ্যারোস্পেস পাওয়ার অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এই সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
সেখানে বায়ুসেনার বিবর্তনের কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৩২ সালে মাত্র চারটি ওয়াপিটি বিমান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ভারতীয় বায়ুসেনা। সেখান থেকে ক্রমশ উন্নতি করে আজ বিশ্বের অন্যতম প্রধান বায়ুসেনায় পরিণত হয়েছে এই বাহিনী।
এপি সিংয়ের শেষ তেজস উড়ান তাই তাঁর ব্যক্তিগত কর্মজীবনের একটি স্মরণীয় মুহূর্ত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের দেশীয় যুদ্ধবিমান কর্মসূচির সঙ্গেও বিশেষভাবে যুক্ত। পরীক্ষামূলক উড়ান থেকে শুরু করে বায়ুসেনার সর্বোচ্চ পদে পৌঁছনো পর্যন্ত তাঁর অভিজ্ঞতা তেজসের উন্নয়ন ও ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।