Tata Motors ও Stellantis-এর বড় চুক্তি, ভারতে তৈরি গাড়ি যাবে ৫০টিরও বেশি দেশে
ভারতে গাড়ি তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ করল Tata Motors ও Stellantis। দুই সংস্থা একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে ভারতে নতুন গাড়ি তৈরি করা হবে এবং সেগুলি বিশ্বের ৫০টিরও বেশি বাজারে বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই চুক্তিতে Tata Motors-এর গাড়ি তৈরির প্রযুক্তি ও ভেহিকল আর্কিটেকচার ব্যবহার করার সুযোগ পাবে Stellantis। অন্যদিকে, নতুন গাড়ির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে সেগুলিকে তৈরি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে সংস্থাটির ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
এই প্রকল্পে Tata Passenger Electric Mobility (TPEM)-ও যুক্ত রয়েছে। এটি Tata Motors Passenger Vehicles (TMPV)-এর ইলেকট্রিক গাড়ি সংক্রান্ত সহযোগী সংস্থা। নতুন গাড়িগুলি তৈরি করা হবে মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে রঞ্জনগাঁওয়ে অবস্থিত দুই সংস্থার যৌথ উদ্যোগের কারখানায়।
রঞ্জনগাঁও কারখানায় তৈরি হবে নতুন গাড়ি
Tata Motors ও Stellantis-এর যৌথ উদ্যোগ Fiat India Automobiles Private Limited (FIAPL)। দুই সংস্থারই ৫০ শতাংশ করে মালিকানা রয়েছে এই যৌথ উদ্যোগে। রঞ্জনগাঁওয়ের কারখানায় বর্তমানে Tata Nexon, Altroz এবং Curvv-এর মতো গাড়ি তৈরি হয়। পাশাপাশি Jeep-এর একাধিক মডেলও এই কারখানায় উৎপাদিত হয়।
এই কারখানায় Jeep Compass ও Jeep Meridian তৈরি করা হয়। এছাড়াও Completely Knocked Down (CKD) পদ্ধতিতে Jeep Grand Cherokee এবং Jeep Wrangler-এর অ্যাসেম্বলির কাজ হয়। CKD পদ্ধতিতে গাড়ির বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে এনে স্থানীয় কারখানায় সেগুলি জোড়া লাগানো হয়।
রঞ্জনগাঁও কারখানায় শুধু গাড়ি তৈরির ব্যবস্থাই নেই, রয়েছে পাওয়ারট্রেন উৎপাদনের পরিকাঠামোও। এখানে ইঞ্জিন, ট্রান্সমিশন এবং ইলেকট্রিক গাড়ির ট্র্যাকশন মোটর তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে প্রচলিত পেট্রোল-ডিজেল ইঞ্জিনের পাশাপাশি ইলেকট্রিক ড্রাইভট্রেন সংক্রান্ত উৎপাদনেও এই কারখানার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
Tata Motors-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করবে Stellantis
চুক্তি অনুযায়ী, Tata Motors তাদের নিজস্ব ভেহিকল আর্কিটেকচার এবং গাড়ি তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেবে Stellantis-কে। ভেহিকল আর্কিটেকচার বলতে গাড়ির মূল কাঠামো, বিভিন্ন যন্ত্রাংশের বিন্যাস এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত নকশাকে বোঝায়। এই ভিত্তির উপর নির্ভর করেই একটি গাড়ির বিভিন্ন মডেল তৈরি করা সম্ভব হয়।
Stellantis তাদের ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাধ্যমে নতুন গাড়িগুলির উন্নয়নের কাজ করবে। পাশাপাশি, যে আন্তর্জাতিক বাজারগুলিতে গাড়িগুলি বিক্রি করা হবে, সেখানকার নিয়মকানুন, ক্রেতাদের চাহিদা এবং রাস্তার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গাড়িগুলিকে তৈরি করা হবে।
এর ফলে Tata Motors-এর গাড়ি তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহার করে Stellantis ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক মডেল তৈরি করার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা ও উৎপাদন পরিকাঠামো কাজে লাগিয়ে একাধিক দেশের বাজারের জন্য গাড়ি তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে চুক্তিতে থাকা নতুন গাড়িগুলির নাম, নির্দিষ্ট সেগমেন্ট, ইঞ্জিনের ধরন এবং লঞ্চের সময়সূচি সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছবে নতুন গাড়ি
এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গাড়ি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা। রঞ্জনগাঁও কারখানা থেকে ইতিমধ্যেই জাপান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় গাড়ি রপ্তানি করা হয়। নতুন চুক্তির ফলে Tata Motors-এর আর্কিটেকচারের উপর ভিত্তি করে তৈরি Stellantis-এর গাড়িও এই উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছতে পারে।
ভারতে গাড়ি তৈরির জন্য ইতিমধ্যেই উন্নত পরিকাঠামো এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই সুবিধাগুলিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন বাজারের জন্য আলাদা প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রক চাহিদা পূরণ করতে হয় গাড়ি নির্মাতাদের। নতুন চুক্তিতে সেই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে একই মূল প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের উপযোগী গাড়ি তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে দুই সংস্থার।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির MoU-র পর চূড়ান্ত চুক্তি
Tata Motors ও Stellantis-এর এই চুক্তির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত একটি Memorandum of Understanding (MoU)-এর মাধ্যমে। সেই সময় দুই সংস্থা ভারতে ও বিদেশের বাজারে উৎপাদন, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছিল।
এবারের চূড়ান্ত চুক্তিতে গাড়ির প্রযুক্তি ও ভেহিকল আর্কিটেকচার ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়েছে। দুই সংস্থার মধ্যে শিল্পক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব অবশ্য নতুন নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা রয়েছে।
এই নতুন উদ্যোগ সেই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে পারে। আগে যেখানে সহযোগিতার মূল ক্ষেত্র ছিল উৎপাদন ও শিল্প পরিকাঠামো, সেখানে এবার আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গাড়ি উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
Jeep, Citroen, Fiat-সহ একাধিক ব্র্যান্ডের মালিক Stellantis
Stellantis একটি আন্তর্জাতিক গাড়ি নির্মাতা গোষ্ঠী। এর অধীনে রয়েছে Jeep, Citroen, Fiat, Peugeot, Opel, Maserati এবং Alfa Romeo-সহ মোট ১৪টি অটোমোবাইল ব্র্যান্ড।
ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সংস্থাটির ব্যবসা বিস্তৃত। ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদন পরিকাঠামো ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য নতুন গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা Stellantis-এর ব্যবসায়িক কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
অন্যদিকে, Tata Motors-এর কাছে এই চুক্তি তাদের গাড়ি তৈরির প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে রঞ্জনগাঁওয়ের মতো বিদ্যমান উৎপাদন কেন্দ্রকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন কতটা হবে, তা প্রকল্পের পরবর্তী বিবরণের উপর নির্ভর করবে।
ভারতের গাড়ি শিল্পে কী প্রভাব পড়তে পারে?
Tata Motors ও Stellantis-এর এই চুক্তি ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে উৎপাদন এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরছে। ভারতীয় প্রযুক্তি ও কারখানা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গাড়ি তৈরি করা গেলে দেশের উৎপাদন পরিকাঠামোর ব্যবহার বাড়তে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের জন্যও নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে নতুন গাড়ির উৎপাদন কবে শুরু হবে, কোন কোন মডেল প্রথমে বাজারে আসবে এবং কোন ৫০টিরও বেশি দেশে সেগুলি বিক্রি করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
Tata Motors ও Stellantis-এর চূড়ান্ত চুক্তি দুই সংস্থার দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে আরও বিস্তৃত করার পদক্ষেপ। ভারতের উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য নতুন গাড়ি তৈরিই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
Essential Business Intelligence, Sharp Market Insights, Practical Personal Finance Advice, Daily Fuel, Gold and Silver Prices and Latest Stories – On Kolkata24x7 Business