পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা, চাপে ইমরান খানের দল
পাকিস্তানের (Pakistan) উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার। রবিবার এই সিদ্ধান্তের পর জেলবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান…
পাকিস্তানের (Pakistan) উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার। রবিবার এই সিদ্ধান্তের পর জেলবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিত হয়েছে। প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, একের পর এক জঙ্গি হামলা এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাকে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে পাকিস্তান সরকার। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর প্রদেশে সেনা মোতায়েনের নির্দেশও দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে, ইমরান খানের মুক্তি এবং তাঁর চিকিৎসার দাবিতে পিটিআই সমর্থকদের ইসলামাবাদমুখী আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংবিধানের ধারায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা
পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি সংবিধানের ২৩২(১) এবং ২৩৪(১) ধারার অধীনে জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপতির ঘোষণায় প্রদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং জঙ্গি কার্যকলাপ মোকাবিলায় প্রাদেশিক সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদী হামলার তীব্রতা সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে খাইবার পাখতুনখোয়ার নির্বাচিত প্রাদেশিক প্রশাসন তার ক্ষমতা হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী এবং অ্যাডভোকেট জেনারেলকে তাঁদের পদ ছাড়তে হবে। এর ফলে ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃত্বে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে।
তবে জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে জঙ্গি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে কেন্দ্র। অন্যদিকে, পিটিআই এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।
ইমরানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদমুখী পিটিআই সমর্থকরা
ইমরান খানের মুক্তি এবং তাঁর যথাযথ চিকিৎসার দাবিতে পিটিআই সমর্থকরা আন্দোলন জোরদার করেছেন। ২০২৩ সাল থেকে দুর্নীতি এবং অন্যান্য মামলায় কারাবন্দি রয়েছেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর দল এই মামলাগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এই প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। গত ৪ অক্টোবর লাক্কি মারওয়াত থেকে মিছিল শুরু হয়। এরপর একাধিক জেলা পেরিয়ে সমর্থকরা ইসলামাবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পিটিআইয়ের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল রাজধানীতে পৌঁছে অবস্থান বিক্ষোভ করা।
কিন্তু ইসলামাবাদে প্রবেশের বিভিন্ন রাস্তায় বাধা তৈরি করেছে প্রশাসন। রাজধানীর প্রবেশপথ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শিপিং কনটেনার ব্যবহার করে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। ফলে আন্দোলনকারীদের যাত্রা এবং রাজধানীতে প্রবেশের পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়েছে।
এর আগে পিটিআই এবং কেন্দ্রের মধ্যে বিক্ষোভ কর্মসূচি নিয়ে দুই দফা আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সেই আলোচনা থেকে কোনও সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসেনি। রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
জরুরি অবস্থা নিয়ে কী বলছে ইমরানের দল?
জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে পিটিআই। ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দলের মুখপাত্র জুলফিকার বুখারি এই পদক্ষেপকে ‘হাস্যকর সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, খাইবার পাখতুনখোয়ায় দেশের একমাত্র বৈধভাবে নির্বাচিত সরকার রয়েছে।
বুখারি সতর্ক করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে আরও রক্তপাত, অস্থিরতা এবং পার্শ্ববর্তী ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের সুযোগ সব সময় ছিল। কিন্তু জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত থেকে বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্রের সরকারের আলোচনার সদিচ্ছা ছিল না।
তবে এগুলি পিটিআইয়ের নেতার বক্তব্য। কেন্দ্রের সরকার জরুরি অবস্থা জারির পক্ষে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জঙ্গি হামলার যুক্তি তুলে ধরেছে। দুই পক্ষের মধ্যে এই বিরোধের ফলে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কতটা খোলা রয়েছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অতীতের সংঘর্ষ ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
পাকিস্তানে ইমরান খানের সমর্থকদের আগের বিক্ষোভগুলির কয়েকটি সহিংস রূপ নিয়েছিল। ২০২৪ সালে বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচির সময় নিরাপত্তাকর্মী এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে ইসলামাবাদমুখী পিটিআই সমর্থকদের আন্দোলন, অন্যদিকে কেন্দ্রের সরকারের জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিত হওয়া এবং সেনা মোতায়েনের নির্দেশ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এখন নজর থাকবে আন্দোলনকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ, কেন্দ্রের সরকারের অবস্থান এবং পিটিআইয়ের সঙ্গে আলোচনার কোনও নতুন উদ্যোগ হয় কি না, তার দিকে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানোর জন্য দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে খাইবার পাখতুনখোয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ইমরান খানের মুক্তির দাবিকে ঘিরে বিরোধ কত দ্রুত মিটবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।