মন্ত্র পড়বেন দুই মহিলা পুরোহিত, সন্ধিপুজোয় ১০৮ নারীর আরতি, অভিনব দুর্গাবন্দনা সিয়াটেলে
প্রবাসের মাটিতে শারদোৎসব মানেই এক টুকরো কলকাতাকে খুঁজে পাওয়া। চেনা গন্ধ, পরিচিত মুখ, ঢাকের আওয়াজে আর একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা পুজোর দিনগুলো। যেমন সিয়াটলের ঐকতানের পুজো। এ বার তাদের পুজো ছ’ বছরে পা দিচ্ছে। আগামী ১৭ ও ১৮ অক্টোবর, Renton-এর Hazen High School-এ পুজোর আয়োজন করা হয়েছে।
পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা প্রিয়াঙ্কা দত্ত গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের প্রাণের পুজো। যে পুজো শুধু দেবী আরাধনার নয়, বরং এক টুকরো বাঙালিয়ানাকে আপন করে নেওয়ার, প্রজন্মের সঙ্গে প্রজন্মের সেতুবন্ধন গড়ার এবং একে অপরের পাশে থাকার উৎসব।’
ঐকতানের পুজোর অন্যতম নজরকাড়া দিক হলো, দুই মহিলা পুরোহিতের পৌরোহিত্যে দুর্গার আরাধনা। তাঁরা দুজনেই প্রশিক্ষিত। প্রবাসের মাটিতে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ঐকতানের পুজোকে দিয়েছে নিজস্ব পরিচিতি। পুজোর প্রতিটি মন্ত্র, প্রতিটি আচার যাতে উপস্থিত সকলে বুঝতে পারেন, সেই উদ্দেশে মন্ত্রগুলির অর্থ বাংলায় ও ইংরেজিতে অনুবাদ করে বোঝানো হয়। মন্ত্রের অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করেন উপস্থিত সকলে।
প্রিয়াঙ্কা জানান, ঐকতানের দুর্গোৎসবের আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ১০৮ জন মহিলার অংশগ্রহণে সন্ধিপুজোর আরতি। একসঙ্গে ১০৮ জন নারী যখন প্রদীপ হাতে মা দুর্গার আরতি করেন, তখন সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে ভক্তি, শক্তি ও ঐক্যের এক অপূর্ব প্রকাশ। প্রবাসে থেকেও বাঙালির ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কী ভাবে সম্মিলিত ভাবে উদযাপন করা যায়, এই আয়োজন তারই এক সুন্দর উদাহরণ।
সকলের সম্মিলিত উদ্যোগে আয়োজন হয় দেবী আরাধনার। আরতি থেকে মায়ের ভোগ— সবেতেই থাকে সকলের যোগদান। কেউ আরতির থালা হাতে এগিয়ে আসেন, কেউ প্রসাদ বিতরণে সাহায্য করেন, কেউ অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকেন। এই সম্মিলিত অংশগ্রহণই ঐকতানের পুজোকে করে তোলে সবার নিজের পুজো।
প্রবাসে বড় হতে থাকা নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পরিচিত করে তোলাও এই পুজো উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য। পুজোর পাশাপাশি থাকে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছোট থেকে বড়— সবাই নাচ, গান, কবিতা ও অন্যান্য পরিবেশনার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরেন। মঞ্চ হয়ে ওঠে প্রজন্মের মিলনক্ষেত্র, যেখানে বাঙালির শিকড়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটে আনন্দের মধ্য দিয়ে।
আর বাঙালির পুজো বলে কথা। জমিয়ে খাওয়াদাওয়া তো থাকতেই হবে। খিচুড়ি, পোলাও, ধোকার ডালনা, রুই মাছের কালিয়া, কষা মাংস— চেনা স্বাদে ফিরে আসে কলকাতার পুজোর স্মৃতি। প্রবাসের মাটিতে এই খাবার শুধু রসনাতৃপ্তি নয়, বরং ফেলে আসা দিনগুলিকে আবার একটু ছুঁয়ে দেখার আনন্দ। বাঙালির দুর্গাপুজোর অন্যতম অঙ্গ মাকে বরণ, সিঁদুরখেলা। ঐকতানের সদস্যরাও মেতে ওঠেন সিঁদুরখেলায়।
হতে পারে দু’দিনের পুজো। তবে তিন-চার মাস ধরে চলে পুজোর প্রস্তুতি। যাঁরা পুজোর সাজসজ্জার দায়িত্বে, তারা বহু আগে থেকেই ময়দানে নেমে পড়েন। আসলে এ পুজো সিয়াটেলে থাকা একদল বাঙালির শিকড়ে ফিরে যাওয়ার পথ। একই সঙ্গে সেই সব মানুষগুলোকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানো, যাঁদের শিকড় বিলেতেই। এ পুজো আসলে সম্মিলিত সুরের মতো, ঠিক যেন ঐকতান।