পুজো এলো, ঢাকি এলো, বাজল কাঁসর-ঘণ্টা
সে বছরে গঙ্গার স্রোত ভাসিয়ে দিয়েছিল বেশ কয়েকটি গ্রামকে। যদিও জল নামল কিন্তু এক অজানা জ্বর কাবু করে দিয়েছিল প্রায় প্রত্যেককেই। তিন পুরুষের ঢাকি জনার্দন ছিল ওই শিশুটির বাবা। দু’বছরেই শহরের পরিবেশ বেশ রপ্ত করে ফেলেছিল সে। সারাদিন কাঁসর হাতে বাবাকে সঙ্গ দেওয়া। রাতে ব্যস্ততা কমলে বাবার সঙ্গেই কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেওয়া। কিন্তু পুজোর মুখেই ঘটে গেল অঘটন। জনার্দনের জ্বর আর কমে না। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো সদর হাসপাতালে। কিন্তু ভোর রাতে আর তার জ্ঞান ফিরল না। জনার্দনের ১৮ জন ঢাকি-সঙ্গীর মাথায় বাজ পড়ল। কলকাতার প্রায় তিনটি পুজো কমিটি প্রায় এক বছর আগেই নগদ টাকায় অগ্রিম বায়না সেরে রেখেছে। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেও জনার্দনের শেষ যাত্রার শ্মশানসঙ্গী হয়েও তারা ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসে মহালয়ার ভোরে পা রাখল শহরে। মনে বিষাদ কিন্তু শহরের আকাশে-বাতাসে উৎসবের আমেজ। বাবা নেই কিন্তু মায়ের ইচ্ছায় গ্রামের মণিকাকার হাত ধরে চলে এসেছে সেই শিশুও। তার মা বাসন্তী ছোটবেলা থেকেই হরিশচন্দ্রপুরের এক ঢাকি পরিবারের মেয়ে। জানে এই বিপদজনক পরিস্থিতি কাটিয়ে তাকেই যে স্বাবলম্বী হতে হবে। শুধু তাই নয়, বাসন্তী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বাও। ঈশ্বর সব কেড়ে নিলেও তিনিই ফিরিয়ে দেন জীবনের চালিকা শক্তি। লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন ঢাকির দল ফিরে আসতেই সেই ছেলে ছুটে গিয়ে মায়ের হাতে ধরিয়ে দিল সেই ট্রফি। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিভিন্ন গ্রামে ঢাকিদের রমরমা কিছুটা বেশি। কারণ শহরে এদের চাহিদা শুধু সার্বজনীন পুজোয় নয়, বাবুদের ব্যক্তিগত পারিবারিক উৎসবেও এখন ডাক পড়ে তাঁদের। দূরত্ব কম হওয়ায় এঁদের যখন তখন ডাকলেই চলেও আসেন। খরচও নাগালের মধ্যে। তবে গ্রামবাংলার চড়ক উৎসবে এঁদের ব্যস্ততা আদি অনন্তকালের। তখন শহরে এঁদের দেখা মেলে কম। গ্রামীণ এই ক্ষুদ্রশিল্পের ঐতিহ্য যাঁরা ধরে রেখেছেন, পরিসংখ্যান বলছে, তাঁদের বংশ পরম্পরার মধ্যেই তা বেশি সীমাবদ্ধ। নতুন প্রজন্মের কাছে গুরুত্ব কিছুটা হারিয়েছে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে। কিছুটা পারিবারিক অনাগ্রহে। তবে এর ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই। উত্তর ২৪ পরগনার মছলন্দপুর সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রামে আজও নতুন ঢাক তৈরি ও পুরোনো ঢাকের কাঠ বদলানো হয়। সারা বছরেই তার চাহিদা থাকে। বাংলাদেশ থেকেও ঢাকিরা এসে থাকেন। বর্তমানে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের কারণে সেই দেশের চাহিদা অনেকাংশেই কম। রায়গঞ্জ, হলদিবাড়ি, কোচবিহারের কিছু অংশে নতুন ঢাকের ভালোই চাহিদা ছিল। বহু ঢাকি এই কারণেই সমবায় সমিতি থেকে ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে থাকেন। যা আগে তাঁরা পেতেন না।