২৫ বছরে সাফল্যের দীর্ঘ যাত্রা - 24 Ghanta Bangla News
Home

২৫ বছরে সাফল্যের দীর্ঘ যাত্রা

Spread the love

সুনীল বনসল

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের রাজনৈতিক যাত্রা শুধু ক্ষমতার অলিন্দে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সংগঠন গড়ে তোলা, আদর্শকে ধারণ করা, মানুষের সেবা এবং রাষ্ট্র নির্মাণের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন। নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক যাত্রাকেও সেই বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতেই দেখতে হবে। এটি এমন এক স্বয়ংসেবকের পথচলা, যিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শাখা থেকে জনসেবার শিক্ষা পেয়েছেন, বিজেপির সংগঠনে কাজ করতে করতে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন, গুজরাটের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০০১–এর ৭ অক্টোবর নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। ২০২৬–এ সরকারের প্রধান হিসেবে তাঁর ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং দেশের অগ্রগতির লক্ষ্যে তিনি ধারাবাহিক ভাবে কাজ করেছেন। তবে নরেন্দ্র মোদীর গল্প ২০০১-এ শুরু হয়নি। তার পিছনে রয়েছে কয়েক দশকের সাংগঠনিক জীবন, শৃঙ্খলা এবং আদর্শগত প্রশিক্ষণ।

আরএসএস-এর স্বয়ংসেবক থেকে দেশের সেবক

নরেন্দ্র মোদীর জীবনের বিকাশ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। তাঁর সাংগঠনিক জীবনের সূচনা আমেদাবাদে। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পর্বই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভিত তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে তিনি বিজেপির সংগঠনে সক্রিয় হন। দলের বিভিন্ন স্তরে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতে করতে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিজের জায়গা তৈরি করেন। ২০০১–এর ৭ অক্টোবর যখন নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন রাজ্য এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ২০০১–য়ে কচ্ছ-সহ গুজরাতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিধ্বংসী ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত হয়েছিল। তার আগে হয়েছিল খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও। এই সব চ্যালেঞ্জ সামলে ১৩ বছর ধরে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি এমন এক প্রশাসনিক মডেল গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যেখানে পরিকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগ, বিদ্যুৎ, কৃষি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সামগ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

বিজেপি নেতা থেকে প্রধানমন্ত্রী

২০১৪–এর লোকসভা নির্বাচন ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০১৪–এর ২৬ মে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ২০১৯–এ বিজেপি ফের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ২০২৪–এ তিনি তৃতীয় বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই যাত্রাতেই স্পষ্ট, এক জন সাধারণ সাংগঠনিক কর্মী কী ভাবে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচিত প্রশাসনিক পদে পৌঁছেছেন। ২০১৪–এর পরে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে ‘প্রধান সেবক’ ধারণাটি বিশেষ ভাবে যুক্ত হয়। এর মূল ভাবনা হলো, ক্ষমতা কোনও বিশেষ অধিকার নয়, ক্ষমতা আসলে একটি দায়িত্ব।

‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ থেকে ‘বিকশিত ভারত’

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর শাসনকালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য— সার্বিক জনকল্যাণমূলক এবং উন্নয়নমুখী কর্মসূচি গ্রহণ। জনধন যোজনা, স্বচ্ছ ভারত অভিযান, উজ্জ্বলা যোজনা, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত এবং প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তরের মতো একাধিক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় গরিব মানুষের কল্যাণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাসস্থান, পরিচ্ছন্নতা, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা, রান্নার গ্যাস, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রয়োজনকে সামনে রেখে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর রাজনৈতিক ভাবনা পরে ‘সবকা প্রয়াস’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে।

ডিজিটাল ইন্ডিয়া : বদলে যাওয়া শাসনব্যবস্থা

নরেন্দ্র মোদী সরকারের সময়কালের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো ভারতের জনজীবনের দ্রুত ডিজিটাল যুগে পদার্পন। ডিজিটাল পেমেন্ট, ইউপিআই, আধার-ভিত্তিক পরিষেবা, প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তর এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার নাগরিক ও সরকারের মধ্যে পরিষেবা আদানপ্রদানের ধরন বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের ডিজিটাল সাফল্য গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৩–এ ভারতের জি২০ সভাপতিত্বের সময়ে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, গ্লোবাল সাউথ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন এক বৃহত্তর প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য হলো প্রশাসনকে আরও সরাসরি, দ্রুত এবং নাগরিক-কেন্দ্রিক করে তোলা।

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর সময়কালে এমন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার প্রভাব ভারতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী হয়েছে। যেমন— ২০১৬–এর নোটবন্দি, ২০১৭–তে জিএসটি চালু, ২০১৯–এ জম্মু ও কাশ্মীর সংক্রান্ত সাংবিধানিক পরিবর্তন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং নতুন রেল ও ফৌজদারি আইনে বিভিন্ন পরিবর্তন। এই সিদ্ধান্তগুলি যেমন সমর্থন পেয়েছে, তেমন হয়েছে সমালোচনাও। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, নাগরিকের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলির উপর তার প্রভাবের ভিত্তিতে।

বিশ্বমঞ্চে নতুন ভারত

গত এক দশকে বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভূমিকা নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হয়ে উঠেছে। কোয়াড, জি২০, গ্লোবাল সাউথ, আন্তর্জাতিক সৌর জোট-সহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক মঞ্চে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৩ সালে ভারতের জি২০ সভাপতিত্ব বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠকে আরও জোরালো ভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটি ছিল ভারতের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। তাঁর জমানায় বিদেশনীতি বারবার একটি বার্তা সামনে এনেছে— বিশ্বব্যবস্থায় ভারত শুধু অংশগ্রহণকারী হয়ে থাকবে না, বরং নিজের প্রভাব তৈরিতে সক্ষম একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

স্বয়ংসেবকের মূল্যবোধ এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব

নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক যাত্রাকে বুঝতে হলে তাঁর স্বয়ংসেবক-জীবনকেও বুঝতে হয়। সঙ্ঘ পরিবার থেকে তিনি পেয়েছেন সংগঠনের মূল্যবোধ। বিজেপির কর্মী হিসেবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা-এই তিনটি স্তর মিলেই তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে গড়ে তুলেছে। ২০২৫–এ প্রশাসনিক জীবনের ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পরেও তিনি বলেছিলেন, দেশসেবাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সম্মান এবং কর্তব্য।

২৫ বছর: লক্ষ্যের গণ্ডি পেরিয়ে এক দীর্ঘ যাত্রা

২৫ বছরের দীর্ঘ সময়ে তাঁর এই যাত্রা বিস্তৃত হয়েছে তিনটি আলাদা ভূমিকায়— আরএসএস-এর স্বয়ংসেবক, বিজেপির সংগঠক ও নেতা এবং গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এই ২৫ বছরে ভারতও একাধিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, পরিকাঠামো, ডিজিটাল পেমেন্ট, সামাজিক সুরক্ষা, বিদেশনীতি এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন ঘটেছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর অবদান

স্বাধীনতার পরে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ- এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। শুধু নির্বাচনী সাফল্যের নিরিখে তাঁর অবদানকে বিচার করা যথেষ্ট নয়। তাঁর শাসনের বৈশিষ্ট্য হলো- সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা, জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বিস্তার, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয়তা এবং দেশের সামনে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্থির করা। যে কোনও নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত সময়ের মাপকাঠিতে হয়। সে দিক থেকে নরেন্দ্র মোদীর ২৫ বছরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবন স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

সেবা থেকে সংকল্প

নরেন্দ্র মোদীর ২৫ বছরের এই দীর্ঘ পথচলাকে যদি একটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তা হলে বলা যায়-এটি ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বের যাত্রা। পদ ছাপিয়ে সেবার যাত্রা। এটি শুধু একজন ব্যক্তির যাত্রা নয়, একটি ভাবনা এবং সেই ভারতের সংকল্পের যাত্রা, যে ভারতকে তিনি ‘বিকশিত ভারত’ হিসেবে দেখতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *