মিসাইল নয়! ড্রোন ধ্বংসে চার লেজার অস্ত্র বাছল আমেরিকা
ড্রোনের ঝাঁক বা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’-এর বাড়তে থাকা হুমকি মোকাবিলায় নতুন ধরনের অস্ত্র (Laser Weapons) ব্যবস্থার দিকে আরও জোর দিচ্ছে আমেরিকা। সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং…
ড্রোনের ঝাঁক বা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’-এর বাড়তে থাকা হুমকি মোকাবিলায় নতুন ধরনের অস্ত্র (Laser Weapons) ব্যবস্থার দিকে আরও জোর দিচ্ছে আমেরিকা। সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা বাড়াতে চারটি উন্নত লেজার ও হাই-পাওয়ার্ড মাইক্রোওয়েভ অস্ত্র ব্যবস্থাকে অপারেশনাল পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার জানিয়েছে, এই অস্ত্রগুলির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে একটি ডিরেক্টেড এনার্জি পাইলট প্রোগ্রামের আওতায়। দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষার জন্য ড্রোন-বিরোধী সক্ষমতা তৈরি ও সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা জয়েন্ট ইন্টারএজেন্সি টাস্ক ফোর্স ৪০১ এই পরীক্ষামূলক কর্মসূচির নেতৃত্ব দেবে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রচলিত ইন্টারসেপ্টর বা গতিশক্তিনির্ভর অস্ত্রের পাশাপাশি সরাসরি শক্তি বা ‘ডিরেক্টেড এনার্জি’ প্রযুক্তিকে বাস্তব অপারেশনাল পরিবেশে ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে আমেরিকা।
চারটি অস্ত্র ব্যবস্থায় নজর
পাইলট প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচিত চারটি সিস্টেম হল,
- অ্যারোভায়রমেন্টের প্যালেটাইজড হাই এনার্জি লেজার
- এপিরাসের লিওনিডাস হাই-পাওয়ার্ড মাইক্রোওয়েভ সিস্টেম
- কর্ডের ফায়ারফ্লাই হাই এনার্জি লেজার
- বোয়িংয়ের কমপ্যাক্ট লেজার ওয়েপন সিস্টেম
এই চারটি ব্যবস্থা মূলত ডিরেক্টেড এনার্জি অস্ত্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিকে তুলে ধরে। তার মধ্যে দুটি উচ্চশক্তির লেজার এবং অন্যটি হাই-পাওয়ার্ড মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। ড্রোন মোকাবিলায় এই দুই ধরনের প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
কীভাবে কাজ করে লেজার অস্ত্র?
হাই এনার্জি লেজার অস্ত্র প্রচণ্ড শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক এনার্জি ব্যবহার করে ড্রোনের বিরুদ্ধে আঘাত হানে। লেজার রশ্মি নির্দিষ্টভাবে ড্রোনের কোনও গুরুত্বপূর্ণ অংশের দিকে কেন্দ্রীভূত করা হয়। দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় শক্তিশালী রশ্মি ধরে রাখতে পারলে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। এর ফলে ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সেটি অকার্যকর বা ধ্বংস হতে পারে। লেজার অস্ত্রের অন্যতম বড় সুবিধা হল এর জন্য প্রচলিত গোলাবারুদ প্রয়োজন হয় না। একই সঙ্গে লেজার আলোর গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে পৌঁছতে পারে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর মতে, ডিরেক্টেড এনার্জি অস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতি শটের খরচ প্রচলিত কাইনেটিক ইন্টারসেপ্টরের তুলনায় কম হতে পারে। পাশাপাশি প্রচলিত গোলাবারুদের মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক মিসাইল বা ইন্টারসেপ্টর সঙ্গে বহন করার সীমাবদ্ধতাও তুলনামূলকভাবে কম। তবে লেজার প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট অংশে পর্যাপ্ত সময় ধরে রশ্মি ধরে রাখতে হয়। এছাড়া বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি এবং অন্যান্য পরিবেশগত কারণও এর কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রের কাজ আলাদা
হাই-পাওয়ার্ড মাইক্রোওয়েভ বা এইচপিএম অস্ত্র লেজারের মতো ড্রোনের কাঠামো গরম করে ধ্বংস করার বদলে তার ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে। অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক এনার্জি ব্যবহার করে এই অস্ত্র ড্রোনের ইলেকট্রনিক সিস্টেমে ক্ষতি বা সাময়িক বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এর ফলে ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক উপাদান অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এই প্রযুক্তির আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত এলাকায় এনার্জি প্রয়োগের সম্ভাবনা। ফলে একসঙ্গে একাধিক ইলেকট্রনিক লক্ষ্যবস্তুকে প্রভাবিত করা সম্ভব হতে পারে।
ড্রোন সোয়ার্ম মোকাবিলায় নতুন কৌশল
একটি বা দুটি ড্রোনের পরিবর্তে একসঙ্গে বহু ড্রোন আক্রমণ চালালে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ড্রোনের দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যয়বহুল মিসাইল ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি করতে পারে। এই কারণেই ডিরেক্টেড এনার্জি অস্ত্র নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। লেজার এবং মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে দ্রুত একাধিক ড্রোনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই এমন হাই-পাওয়ার্ড মাইক্রোওয়েভ সিস্টেম পরীক্ষা করেছে, যেগুলি একাধিক আনম্যানড এয়ারক্রাফটকে বিঘ্নিত, অকার্যকর বা ধ্বংস করার জন্য তৈরি।
লেজার, মাইক্রোওয়েভ ও প্রচলিত অস্ত্র একসঙ্গে
আমেরিকার বর্তমান কৌশলে লেজার বা মাইক্রোওয়েভ অস্ত্রকে প্রচলিত ড্রোন-বিরোধী অস্ত্রের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন প্রযুক্তিকে একসঙ্গে ব্যবহার করে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করাই লক্ষ্য।
নতুন পাইলট প্রোগ্রামে নির্বাচিত চারটি সিস্টেমের অপারেশনাল পরীক্ষা সেই কৌশলেরই অংশ। বাস্তব পরিস্থিতিতে এই অস্ত্রগুলি কতটা কার্যকরভাবে ড্রোন শনাক্ত, প্রতিহত এবং ধ্বংস করতে পারে, সেই বিষয়টি পরীক্ষার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হবে।
ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষায় এই ধরনের ডিরেক্টেড এনার্জি প্রযুক্তি ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মিসাইল বা প্রচলিত গোলাবারুদের পাশাপাশি আলোর গতিতে কাজ করা লেজার এবং ইলেকট্রনিক সিস্টেমকে লক্ষ্য করা মাইক্রোওয়েভ অস্ত্র তাই ড্রোন-বিরোধী প্রতিরক্ষায় নতুন একটি অধ্যায় তৈরি করছে।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।