‘ওরা আর আসবে না’...আসন্ন সে দিন? - 24 Ghanta Bangla News
Home

‘ওরা আর আসবে না’…আসন্ন সে দিন?

Spread the love

কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

এমনটা যে হতে পারে, সেই আশঙ্কা করা হয়েছিল ৬৪ বছর আগেই। ১৯৬২-তে ইউএসএ-র পরিবেশবিজ্ঞানী র‌্যাচেল কারসনের লেখা ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। ওই বছরই মে মাসে রিলিজ় করেছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিটি। ওই বই আর সিনেমা— দু’জায়গাতেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল পাখিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। র‌্যাচেল আশঙ্কা করেছিলেন এমন এক দিনের, যেখানে আর কোনও পাখি থাকবে না। আর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে তো পরিযায়ী পাখিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়াবহ এক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছিল, ‘একবার ওরা হয়তো আর আসবে না। হয়তো মাঝরাস্তায় তারা মরে বৃষ্টির ফোঁটার মতো টুপ টুপ করে কোথাও…’

১৯৬২-তে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন এক বিখ্যাত পরিবেশবিদ এবং এক বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক, সেটাই সত্যি হতে চলেছে ২০২৬-এ। পরিযায়ী পাখিদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতি চার বছর অন্তর প্রকাশিত ‘স্টেট অফ দ্য ওয়ার্ল্ডস বার্ডস’ রিপোর্টে সম্প্রতি সামনে এসেছে। যেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতি ৯টি পরিযায়ী পাখির মধ্যে অন্তত একটি প্রজাতি এখন বিলুপ্তির আশঙ্কায়। শুধু তা-ই নয়, কোকিল, ঘুঘু এবং আর্কটিক টার্নের মতো পরিচিত পরিযায়ী পাখি-সহ প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রজাতির সংখ্যা কমে গিয়েছে গত কয়েক বছরে।

ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশ ও মহাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে ছুটে চলা পরিযায়ী পাখিদের অস্তিত্বেই ক্রমশ ঘনাচ্ছে বিপদের মেঘ। আন্তর্জাতিক পাখি সংরক্ষণ সংস্থা ‘বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল’-এর তৈরি এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে সেপ্টেম্বরে হওয়া ‘গ্লোবাল ফ্লাইওয়েজ় সামিট’–এ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করা কোটি কোটি পাখির চলাচলের পথকে পক্ষী বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘ফ্লাইওয়ে’ বলা হয়। সেই পথ বরাবর পাখিদের বাসস্থান ও খাদ্যভূমি রক্ষা করাই এখন সংরক্ষকদের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

Migratory Birds

সাম্প্রতিক কালে ইতিমধ্যেই ‘স্লেন্ডার-বিলড কার্লিউ’ নামে একটি পরিযায়ী পাখির প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। গত কয়েক শতকে ইউরেশিয়া ও আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে এটিই প্রথম নথিভুক্ত পাখি-বিলুপ্তির ঘটনা। গত ১৫০ বছরে বিশ্বে মোট সাতটি পরিযায়ী পাখির প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

সব চেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সামুদ্রিক পাখি ও উপকূল অঞ্চলের জলাভূমির বাসিন্দা পাখিদের। রিপোর্ট বলছে, তাদের অস্তিত্ব নির্ভর করে, এমন বাস্তুতন্ত্রই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত এক দশকের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, পরিযায়ী পাখিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ১,০৯৯টি জীববৈচিত্র-ক্ষেত্রের ৫৮ শতাংশের অবস্থাই হয় ‘খারাপ’ অথবা ‘অত্যন্ত খারাপ’।

কেন এমন দশা? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস করে সেগুলিকে কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তন, দূষণ, অতিরিক্ত শিকার, বহিরাগত প্রজাতির বিস্তার এবং বিশ্ব উষ্ণায়ন— সব মিলিয়েই বিপদ বাড়ছে। শুধু ইউরোপ, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ককেশাস ও আরব উপদ্বীপেই প্রতি বছর আনুমানিক ১ কোটি ৩১ লক্ষ থেকে ৪ কোটি ২৭ লক্ষ পরিযায়ী পাখিকে বেআইনি ভাবে ধরা বা হত্যা করা হয়। মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য বহু পাখিকে জাল কিংবা আঠাযুক্ত কাঠি দিয়ে ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। ছোট ছোট দ্বীপের অবস্থা আরও খারাপ। মানুষের হাত ধরে ওই সব দ্বীপে পৌঁছচ্ছে ইঁদুরের মতো আগ্রাসী প্রাণী। যারা সামুদ্রিক পাখির ডিম ও ছানার জন্য বড়সড় বিপদের কারণ হয়ে উঠছে।

তবে পুরো ছবিটিই হতাশার নয়। ‘বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রধান বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট বুচার্টের দাবি, সংরক্ষণে সাফল্যের নজিরও রয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে বহু প্রজাতিকে বিপন্মুক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। বুচার্টের বক্তব্য, ‘সমাধান নাগালেই রয়েছে। এ বার ফ্লাইওয়ে জুড়ে তা কার্যকর করার পালা।’

সেপ্টেম্বরে নাইরোবি সম্মেলনে সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও বিজ্ঞানীরা এবং সংরক্ষণ সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিনিধিরা ‘নাইরোবি ফ্লাইওয়েজ় ডিক্লারেশন’-এ সই করেছে। তিনটি উন্নয়ন ব্যাঙ্কও তাদের ঋণ প্রদানের কাঠামোয় ফ্লাইওয়ে সংরক্ষণকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিযায়ী পাখিদের পথের বাসস্থান রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে বরাদ্দ হবে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। ফলে পাখিদের আকাশপথ বাঁচানোর লড়াই এ বার আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তাও পেতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *