ভারতের এ-স্যাট পরীক্ষায় চমকে গিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ভারতের অ্যান্টি-স্যাটেলাইট বা এ-স্যাট ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা (Mission Shakti) আন্তর্জাতিক মহলে বড় আলোড়ন তৈরি করেছিল। এবার সেই পরীক্ষার সময়কার অভিজ্ঞতা সামনে এনে এক প্রাক্তন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে অপ্রস্তুত করে দিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত যে মহাকাশে একটি নিজস্ব স্যাটেলাইটকে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করতে চলেছে, তা পরীক্ষার আগে মার্কিন গোয়েন্দা মহল বুঝতে পারেনি।
ভারতীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ওডিশার ড. এপিজে আবদুল কালাম দ্বীপ থেকে ‘মিশন শক্তি’ নামে এ-স্যাট পরীক্ষা চালায়। ডিআরডিওর তৈরি ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর একটি ভারতীয় উপগ্রহকে লো আর্থ অরবিটে ‘হিট-টু-কিল’ পদ্ধতিতে আঘাত করে ধ্বংস করে।
কীভাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বিষয়টি জানতে পারে?
প্রাক্তন ন্যাশনাল রিকনাইস্যান্স অফিস বা এনআরও কর্মকর্তা ডেভিড গ্রুশ সম্প্রতি জো রোগান পডকাস্টে ২০১৯ সালের ঘটনাটি স্মরণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ওডিশার উপকূলে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জন্য নোটাম বা নোটিস টু এয়ারমেন জারি করেছিল।
অর্থাৎ, একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা হতে চলেছে, সে বিষয়ে মার্কিন পক্ষের ধারণা ছিল। কিন্তু সেটি যে কোনও সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নয়, বরং মহাকাশে থাকা একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করার এ-স্যাট পরীক্ষা, সেটি গে থেকে জানা ছিল না বলে গ্রুশ দাবি করেছেন। গ্রুশ তখন এনআরও-র অপারেশনস সেন্টারে দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, পরীক্ষা সফল হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। তিনি মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং একই সঙ্গে মার্কিন মহাকাশ সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
স্যাটেলাইট ধ্বংসের পরই শুরু হয় ধ্বংসাবশেষের হিসাব
মহাকাশে কোনও স্যাটেলাইটকে সরাসরি আঘাত করলে তার টুকরো ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই ধ্বংসাবশেষ বা অরবিটাল ডেব্রিস অন্য স্যাটেলাইটের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গ্রুশের বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষার পর এনআরও-তে প্রথম দিকের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় ছিল এই ধ্বংসাবশেষ। কারণ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার স্যাটেলাইটগুলিও পৃথিবীর কক্ষপথে সক্রিয় থাকে। তিনি জানিয়েছেন, পরীক্ষার পর তিনি দ্রুত এনআরও পরিচালকের কাছে গিয়ে পরিস্থিতি জানান। এরপর অরবিটাল বিশ্লেষকদের ধ্বংসাবশেষের সম্ভাব্য বিস্তারের এলাকা হিসাব করতে বলা হয়, যাতে প্রয়োজন হলে কোনও মার্কিন মহাকাশযান বা স্যাটেলাইটের কক্ষপথ পরিবর্তন করা যায়।
‘মিশন শক্তি’র লক্ষ্য ছিল Microsat-R
ভারতের পরীক্ষায় ধ্বংস হওয়া স্যাটেলাইটটির নাম ছিল Microsat-R। ডিআরডিওর তথ্য অনুযায়ী, মিশন শক্তির মাধ্যমে ভারত লো আর্থ অরবিটে থাকা একটি স্যাটেলাইটকে সরাসরি আঘাত করে ধ্বংস করার সক্ষমতা প্রদর্শন করে। পরীক্ষার মাধ্যমে ভারত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চিনের পর চতুর্থ দেশ হিসেবে এ-স্যাট সক্ষমতা প্রদর্শন করে। ভারতের সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, পরীক্ষাটি দেশের মহাকাশ সম্পদ রক্ষার সক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৭ মার্চ জাতীয় ভাষণে ‘মিশন শক্তি’র ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে পরিচালিত হয়েছিল এবং ভারত এ-স্যাট সক্ষমতা অর্জনকারী চতুর্থ দেশ হয়েছে।
মহাকাশে ধ্বংসাবশেষ নিয়ে উদ্বেগ
ভারতের এ-স্যাট পরীক্ষার পর মহাকাশে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। নাসার তৎকালীন প্রশাসক জিম ব্রাইডেনস্টাইন পরীক্ষাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস-এর নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।,বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, পরীক্ষার পর প্রায় ৪০০টি ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত হয়েছিল। একটি গবেষণাপত্রেও নাসার শনাক্ত করা প্রায় ৪০০টি ডেব্রিসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছিল, স্যাটেলাইটটিকে তুলনামূলক কম উচ্চতায় আঘাত করা হয়েছিল, যাতে তৈরি হওয়া ধ্বংসাবশেষ দ্রুত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। ডিআরডিও-র প্রকাশিত তথ্যেও মিশন শক্তির লক্ষ্যকে লো আর্থ অরবিটের প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উচ্চতায় থাকা স্যাটেলাইট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত কেন এতদিন আগে থেকে জানায়নি?
গ্রুশের বক্তব্যের মূল বিষয় এখানেই। তাঁর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা হবে বলে নোটাম জারি করা হলেও পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আগে থেকে জানতে পারেনি। ভারতীয় সরকারি বিবৃতিতে মিশন শক্তিকে একটি অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। ডিআরডিও জানিয়েছিল, একটি দ্রুতগতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা স্যাটেলাইটকে নির্ভুলভাবে আঘাত করাই ছিল পরীক্ষার মূল চ্যালেঞ্জ। ফলে পরীক্ষাটি সফল হওয়ার পর মার্কিন সংস্থাগুলির সামনে শুধু ভারতের নতুন এ-স্যাট সক্ষমতার বিষয়টি নয়, সম্ভাব্য মহাকাশ ধ্বংসাবশেষের গতিপথও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্রও আগে এ-স্যাট পরীক্ষা করেছে
মহাকাশে স্যাটেলাইট ধ্বংস করার প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কের আরেকটি দিকও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেও অতীতে এ-স্যাট প্রযুক্তির পরীক্ষা চালিয়েছে। ফলে ভারতের ২০১৯ সালের পরীক্ষাকে ঘিরে মহাকাশের সামরিকীকরণ এবং ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকি নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি বড় শক্তিগুলির নিজেদের মহাকাশ অস্ত্র কর্মসূচিও আলোচনায় আসে। ভারতের মিশন শক্তি অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেছিল। ডিআরডিওর নথি অনুযায়ী, পরীক্ষাটি ভারতকে এ-স্যাট সক্ষমতা প্রদর্শনকারী চতুর্থ দেশে পরিণত করে।
২০১৯ সালের সেই পরীক্ষার গুরুত্ব
মিশন শক্তি ভারতের জন্য শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ছিল না। এটি মহাকাশে থাকা একটি দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুকে স্থলভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর দিয়ে আঘাত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছিল। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডিআরডিও-র ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর ‘হিট-টু-কিল’ পদ্ধতিতে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে এবং পরীক্ষার সব উদ্দেশ্য পূরণ করে।
অন্যদিকে, ডেভিড গ্রুশের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে ২০১৯ সালের সেই মুহূর্তে মার্কিন মহাকাশ গোয়েন্দা ব্যবস্থার সামনে তৈরি হওয়া তাৎক্ষণিক উদ্বেগের একটি ছবি পাওয়া যায়। বিশেষ করে কক্ষপথে থাকা মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইটগুলির জন্য ধ্বংসাবশেষ কতটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেটিই তখন দ্রুত মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়েছিল।
তবে গ্রুশের এই বর্ণনা তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য হিসেবে দেখা উচিত। ভারতের পরীক্ষা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্যের ক্ষেত্রে ডিআরডিও এবং ভারত সরকারের প্রকাশিত নথিই মূল সরকারি সূত্র।
Defence News-এর সর্বশেষ আপডেট। ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মহড়া, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির খবর পড়ুন।