জাহাজের কুক হয়ে পাড়ি সোমালিয়ায়, জলদস্যুদের হাতে খুন কলকাতার যুবক - 24 Ghanta Bangla News
Home

জাহাজের কুক হয়ে পাড়ি সোমালিয়ায়, জলদস্যুদের হাতে খুন কলকাতার যুবক

Spread the love

এই সময়: কলকাতার একবালপুরের নবাব আলি লেনের একচিলতে টালির ঘর যেন কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। বছর খানেক আগে ছেলে তনভীর–উজ–জামানের (৩৮) বিয়ে দিয়েছিলেন বাবা–মা। তার মাস ছয়েকের মাথায় বিদেশি জাহাজের কুক হিসেবে তিনি পাড়ি দেন সুদূর সোমালিয়ার উদ্দেশে। কিন্তু ঘরের ছেলে যে আর কোনও দিন ঘরে ফিরবেন না— সেটা ভাবতেও পারেননি কেউ। গত ২১ এপ্রিল সোমালিয়ার জলদস্যুদের খপ্পরে পড়ে তনভীরদের অয়েল ট্যাঙ্কার। সে খবর পাওয়ার পর থেকে উদ্বেগ আর আতঙ্ক নিয়ে দিন–রাত কাটিয়েছেন তনভীরের বাবা, বছর ৭৫–এর মহম্মদ নূর–উজ–জামান, বছর ৬৫–এর মা আনোয়ারি বেগম। মঙ্গলবার সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী, পান্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্স (পিএমপিএফ) জলদস্যুদের কবল থেকে ট্যাঙ্কারটিকে মুক্ত করতে গেলে দু’পক্ষের মধ্যে গুলিযুদ্ধ চলে। সেই সময়ে তনভীর–সহ পাঁচ জন নিহত হয়েছেন‍ বলে জানিয়েছে সোমালিয়ার একটি নিউজ় পোর্টাল।

মঙ্গলবার এই ঘটনাটি ঘটলেও পণ্যবাহী জাহাজে কর্মরত নাবিক ও ক্রু–দের সংগঠন ‘ফরোয়ার্ড সিমেনস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ (এফএসইউআই) বৃহস্পতিবার বিষয়টি সামনে এনেছে।সোমালিয়ার একটি নিউজ় পোর্টালকে উদ্ধৃত করে একাধিক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তনভীর ছাড়াও নিহতদের তালিকায় রয়েছেন পাকিস্তানের তিন জন ও মিয়ানমারের এক জন নাগরিক। পালাউ–এর (পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের একটি স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র) পতাকাবাহী ‘এমটি অনার ২৫’ নামে ওই ট্যাঙ্কারটিকে গত ২১ এপ্রিল আটক করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। সেই ট্যাঙ্কারে ছিলেন তনভীর-সহ ১৭ জন। সংবাদসংস্থা ‘বিবিসি সোমালি’র দাবি, ১৭ জন ক্রু–র মধ্যে এক জন ভারতীয়, ১০ জন পাকিস্তানি, চার জন ইন্দোনেশিয়ান এবং শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের এক জন করে নাগরিক ছিলেন। পান্টল্যান্ড মেরিটাইম ফোর্সের অবশ্য দাবি, জলদস্যুদের উপরে হামলা চালানোর আগেই তারা পাঁচ জনকে খুন করেছিল। তবে কী ভাবে বা কবে তাঁদের খুন করা হয়েছে, তা এ দিন রাত পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি।

বৃহস্পতিবার তনভীরের বাবা–মা জানান, ছেলে ২০১৯ থেকেই বিভিন্ন জাহাজ সংস্থায় কাজ করেছেন। শেষ বার ‘ওয়ার্ড মেরিটাইম এনার্জি প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে সোমালিয়ার একটি সংস্থা তাঁকে নিয়োগ করে। তাঁদের ট্যাঙ্কারটি জলদস্যুদের কবলে পড়ার পরে জাহাজের ক্যাপ্টেনের ফোন থেকে শেষ বার তনভীর যোগাযোগ করেছিলেন পরিবারের সঙ্গে। দিদি রেশমাকে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাড়ি ফিরতে চাই। ফিরব তো?’ বেশি কথা না–হলেও সেই সময়ে জলদস্যুদের অত্যাচারের আভাসও পেয়েছিলেন তনভীরের পরিবার। কিন্তু তারপরেও তাঁরা অপেক্ষায় ছিলেন, ছেলে বাড়ি ফিরবে। সেটা আর হলো না।

তনভীরের জামাইবাবু আলতাব খানের কথায়, ‘গত চার মাস ধরে আমরা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার এবং বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। ই–মেল পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোনও সাহায্য আমরা পাইনি। এখন একটাই অনুরোধ, ওর দেহটা যেন আমাদের তাড়াতাড়ি দিয়ে দেওয়া হয়।’

অপহরণের খবর আসার পর থেকে পরিবারের তরফে তনভীরের ভাগ্নে রাজা আলতাজ় খান সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, জলদস্যুরা ট্যাঙ্কারটিকে কব্জা করার পরে ক্যাপ্টেনের ফোন থেকে মাঝেমধ্যে আটকে পড়া ক্রু–দের বাড়িতে যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো। আলতাজ়ের কথায়, ‘যে ক’বার কথা হয়েছে, তনভীর বলত, ওদের ছাড়ার জন্য ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মুক্তিপণ চাইছে জলদস্যুরা। এও বলত, যে বেঁচে থাকার জন্য সামান্য খাবার আর নোংরা জল দেওয়া হতো ওদের। খুব বেশি কথা হতো না।’ পরিবারের দাবি, ফোন পাওয়ার পরে তাঁরা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ করে সাহায্য চাইলেও মেলেনি। তাঁর সংযোজন, ‘ক্যাপ্টেনের ফোন থেকেই গত মঙ্গলবার আমি প্রথমে তনভীরের মৃত্যুর খবর জানতে পারি। তখনও বিশ্বাস করিনি। আমি ক্যাপ্টেনকে অনুরোধ করি, যদি কোনও ছবি কিংবা ভিডিয়ো ওঁরা পাঠাতে পারেন। জাহাজের ক্রু, এক পাকিস্তানি নাগরিকের সাহায্যে ছবি ও ভিডিয়ো দেখে ওর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হই। তারপরেই ওর বাবা–মাকে বিষয়টা জানাই।’

তনভীরের বাবা মহম্মদ নূর–উজ–জামানও ১৯ বছর বয়স থেকে জাহাজে কাজ করতেন। তবে এমন ঘটনা যে তাঁর ছেলের সঙ্গেই ঘটবে, সেটা এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না তিনি। বৃদ্ধ বাবা–মায়ের আর্তি, ‘ছেলের দেহটা যেন অন্তত ফিরে পাই।’ যে সংস্থার হয়ে তনভীর কাজে গিয়েছিলেন, তার মালিক সোমালিয়ারই বাসিন্দা। অভিযোগ, জলদস্যুদের সঙ্গে ‘ডিল’ করতে সেই সংস্থা কিংবা মালিকের তরফে তৎপরতা দেখানো হয়নি। উল্টে, খবর যাতে বাইরে না আসে, সেই চেষ্টা হয়েছে।

প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার ব্যারেল তেল নিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিশুর উদ্দেশে রওনা হয়েছিল তনভীরদের ট্যাঙ্কারটি। সোমালিয়ার মিডিয়ার দাবি, মঙ্গলবার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পরে বেশ কয়েকজন জলদস্যু পালানোর পথ না–পেয়ে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিলেও বাকিরা উপকূলের দিকে চম্পট দেয়। উদ্ধার হওয়া ট্যাঙ্কারটিকে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে সোমালিয়ার বোসাসো বন্দরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *