৫৬ বছর বয়সে প্রতিদিন ২১ কিমি দৌড়, টানা ১৯০০ দিন, দৃষ্টান্ত প্রাক্তন সেনার
বয়স যে কেবল একটা সংখ্যা আর মনের অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনও বাধাই যে পথ আটকাতে পারে না, তা প্রতিদিন ভোরবেলায় শান্তিনিকেতনের লাল মাটির রাস্তায় প্রমাণ করে চলেছেন এক প্রাক্তন সেনা জওয়ান। নাম শঙ্কর বিশ্বাস। বয়স ৫৬ পেরিয়েছে, কিন্তু শরীরের উদ্যম হার মানাবে যেকোনো তরুণ অ্যাথলিটকেও। প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটেয় যখন চারপাশ নিশ্চুপ থাকে, তখন নিয়ম করে রানিং শু পায়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। লক্ষ্য একটাই—টানা ২১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা। ঝড়-বৃষ্টি হোক কিংবা গরম, বিগত ১৯০০ দিনে এক দিনের জন্যও এই রুটিনে কোনও ছেদ পড়েনি।
২০০৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর
১৯৮৬ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘আর্মি অর্ডন্যান্স কোর’-এ যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেকেন্দরাবাদে প্রাথমিক প্রশিক্ষণের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব সামলেছেন। সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং পরবর্তীতে ‘প্যারা বেসিক’ প্রশিক্ষণ তাঁর শারীরিক ক্ষমতাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। ২০০৬ সালে দীর্ঘ ২০ বছরের সেনা জীবন থেকে অবসর নেন। অবসরের পর কয়েক বছর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তিনি ২০১৯ সাল থেকে ম্যারাথন দৌড় শুরু করেন। ২০২০ সালে যুক্ত হন ‘১০০ ডেজ অফ রানিং’ (HDOR) চ্যালেঞ্জের সঙ্গে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক অনুপ্রেরণামূলক এই যাত্রা।

টানা ১৯০০ দিন ধরে প্রতিদিন গড়ে ২১ কিলোমিটার বা তার বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সম্প্রতি এক অনন্য নজির গড়েছেন তিনি। উৎসবের দিন হোক কিংবা ব্যক্তিগত কোনও বিশেষ মুহূর্ত—দৌড় কখনই বাদ যায়নি। বর্ষাকালে যখন আকাশে ঘন ঘন বজ্রপাত হয় এবং একটানা বৃষ্টি নামে, তখনও তিনি নিজেকে নিরাপদ রেখে শান্ত মাথায় নিজের লক্ষ্য পূরণ করেন। সাধারণ দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি।
সাধারণ জীবনযাপনেই বাজিমাত
এই শারীরিক সক্ষমতার রহস্য কী? কোনও জাঁকজমকপূর্ণ জিম বা কঠিন ডায়েট চার্ট নয়, শঙ্করবাবুর ভরসা অতি সাধারণ জীবনযাপন। ঘরের তৈরি সাধারণ খাবার, কম তেল-মশলা, পর্যাপ্ত জল, সামান্য দুধ এবং পুষ্টির জন্য কিছু ড্রাই ফ্রুটস—ব্যস, এটুকুই। তাঁর বিশ্বাস, কৃত্রিম সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধের ওপর ভরসা না করে নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাসের মাধ্যমেই আজীবন সুস্থ থাকা সম্ভব।

আজকের দিনে যখন তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগই আট-নয় ঘণ্টার দীর্ঘ ডেস্ক-জব ও অলস জীবনযাত্রার শিকার, তখন এই ৫৬ বছরের প্রবীণ যোদ্ধার লড়াই যেন এক উজ্জ্বল আলোর দিশা। নিজের ব্যক্তিগত লক্ষ্যের কারণে পেশাদারভাবে কাউকে প্রশিক্ষণ দিতে না পারলেও, পথচলতি মানুষ বা তরুণরা যখন তাঁর কাছে শরীরচর্চার পরামর্শ চান, তিনি তাঁদের পথ দেখান।

তাঁর বার্তা অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর—‘সবাইকেই রানিং বা যেকোনও শারীরিক কার্যকলাপকে জীবনের অঙ্গ করে নেওয়া উচিত। দৌড়তে না পারলে দ্রুত হাঁটুন, সামান্য ঘাম ঝরান। শরীরচর্চাকে সঙ্গে রাখলে তবেই ওষুধের ওপর নির্ভর না করে আজীবন সুস্থ থাকা যায়।’ অবসরপ্রাপ্ত এই সেনা জওয়ানের ডায়েট আজ কেবল রাস্তার দূরত্ব মাপে না, বরং বহু মানুষকে নতুন করে বাঁচার ও সুস্থ থাকার অনুপ্রেরণা জোগায়।