‘টিপসি নাইট স্কুল’: ককটেল উইথ কালচার, শহরের বিভিন্ন পানশালায় আড্ডার সেশন
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
কল্পনা করুন, আপনি শহরের প্রিয় বারে বসে। পছন্দের পানীয়র গ্লাস হাতে। আশপাশের অপরিচিত লোকজনের কথোপকথনের বদলে আপনার কানে আসছে কোনও এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা কোনও নামকরা ডাক্তারের গলা। তাঁদের বক্তব্যের বিষয়, ভূত কি সত্যিই আছে? যদি না থাকে, তা হলে আমরা ভূতে ভয় পাই কেন? কিংবা কেন আমরা হাসি, হাসলে কি সত্যিই হার্ট ভালো থাকে? যুক্তিহীন দাবি নয়, রীতিমতো ‘অ্যাকাডেমিক ডিসকাশন’।
নিছক কল্পনা বা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, শহরের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পানশালায় এমনই আড্ডার সেশন নিয়মিতই বসে। শুধু পান এবং পানীয় বা নিছক আড্ডা নয় — বলা যেতে পারে ‘কালচার উইথ ককটেল’–এর এমন ট্রেন্ড কয়েক বছর আগে ইউএসএ–তে চালু হয়েছে ‘লেকচার্স অন ট্যাপ’ নাম দিয়ে। নিউ ইয়র্ক থেকে সান ফ্রানসিস্কো, ফিলাডেলফিয়া থেকে বস্টন — ট্রেন্ড ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। অচিরেই সাত সমুদ্র পেরিয়ে ওই কনসেপ্ট এসেছে ভারতেও।
এ দেশে বহু ‘প্রথমের’ সূত্রপাত হয়েছে কলকাতায়। এ বারও তার ব্যতিক্রম হলো না। দুই বান্ধবী প্রৈতি শীল আচার্য এবং অনলীনা সান্যাল ‘টিপসি নাইট স্কুল’ নাম দিয়ে ৩১ মে প্রথম এমন অভিনব আড্ডার আয়োজন করেন শহরে। সে দিন ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স’– এর বিজ্ঞানী সৌমিত্র সেনগুপ্তর ‘হিডন মিস্ট্রিজ় অফ স্পেস অ্যান্ড টাইম’ নামের বক্তৃতায় বুঁদ হয়ে ছিলেন ৩০–৪০ জন ‘আড্ডাবাজ’।
২০২৪–এর ইউএসএ নয়, ক্লাসরুমের বাইরে কোনও ক্যাফে বা বারে কখনও কড়া কফির মাগ অথবা হার্ড ড্রিঙ্কসের গ্লাস সহযোগে আড্ডার এমন নজির নাকি পাওয়া যায় ১৯৩০–এর দশকের জার্মানির গাটেনগেন শহরেও। গাটেনগেন বিশ্ববিদ্যালয় তখন চাঁদের হাট। কোনও ঘরে ক্লাস নিচ্ছেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, কোথাও বা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের মতো বিজ্ঞানীরা। আর বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে শহরের বিভিন্ন বার ও ক্যাফেতে বসত এমনই আড্ডার সেশন। ১৯৩০–এর জার্মানিরও দু’হাজার বছর আগে গ্রিসের শরীরচর্চার আখড়াগুলোয় যে এমন ভাবেই শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মগজকে মজবুত করারও ব্যবস্থা ছিল, তার বর্ণনা আছে সত্যজিৎ রায়ের ‘আগন্তুক’ ছবিতেই। সেই কনসেপ্টই এ বার একটু অন্য রূপ ধরে খাস কলকাতায়।
টিপসি নাইট স্কুল–এর পরিকল্পনা যাঁরা করেছেন, সেই প্রৈতি ও অনলীনা তাঁদের এই অভিনব উদ্যোগ সম্পর্কে ‘এই সময়’–কে বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত আমরা আটটা এমন সেশনের ব্যবস্থা করেছি। ৩১ মে থেকে কলকাতার বিভিন্ন পানশালায় এই ধরনের সেশন চালু হয়েছে। নবম সেশনটি হতে চলেছে ৮ অক্টোবর।’ আর আড্ডায় আলোচনার বিষয়বস্তু? কখনও ১৯ ও ২০ শতকে বাঙালির শরীরচর্চা নিয়ে ‘ফ্রম ষষ্ঠীচরণ টু স্যান্ডো গেঞ্জি’ আবার কখনও গণতন্ত্র ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ে ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্মস, প্রোপাগান্ডা অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’। বর্তমান যুগের খাওয়াদাওয়া এবং পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়েছে জুলাইয়ের বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যায়। সেই টপিকের নাম ছিল ‘হোয়াই ব্রকোলি উইল নট সেভ ইয়োর লাইফ’। বাদ পড়েনি ভিনগ্রহীদের নিয়ে আলোচনাও।
আটটির মধ্যে ছ’টি আড্ডা সেশনেই হাজির ছিলেন ভবানীপুরের সাগ্নিক সমাদ্দার। তিনি বলছেন, ‘এলিয়েনস ওভার ক্যালকাটা: হাউ টুক টু সাই–ফাই, অ্যান্ড দেন লস্ট ইন্টারেস্ট (অলমোস্ট) — এই আলোচনা তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।’ সাগ্নিক বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে পানীয় নিয়ে আড্ডায় বসা আমাদের অনেকের কাছেই নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই আড্ডা একেবারে অন্যরকম। এমন বিষয় নিয়ে আড্ডা হয়, তা আপনাকে মানসিক ভাবে তরতাজা করে তুলবেই।’
লোভ হচ্ছে? এমন একটা আড্ডা সেশনে উপস্থিত থাকতে চাইছেন? উপায় জানিয়ে দিচ্ছেন প্রৈতি ও অনলীনা। ইনস্টাগ্রামে টিপসি নাইট স্কুল–এ নজর রাখুন অথবা offlyn.life থেকে পরের সেশনের স্লট বুক করুন। আড্ডার মুখরোচক উপাদানে পছন্দের পানীয় আরও সুস্বাদু লাগবে।