বিষের শিশিতে খুনের গল্প, সিগারেটের প্যাকেটে পুরোনো কলকাতার কথা, বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন শহরে
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
অন্য রকম এক প্রদর্শনী। যা মনে পড়াবে পানুগোপাল আর নিশানাথদের। এবং তারানাথ তান্ত্রিককেও।
কানে কম শুনত পানুগোপাল। উত্তেজিত হলে তার কথা আটকেও যেত। কিন্তু সেই পানুগোপালই দেখে ফেলেছিল মোহনপুরের গোলাপ কলোনির মালিক, প্রাক্তন বিচারপতি নিশানাথ সেনকে খুন হতে। সাক্ষীকে বাঁচিয়ে রাখার ঝুঁকি নেয়নি খুনি। তাই, পানুগোপালের কানে দেওয়ার ওষুধেই সবার অলক্ষ্যে সে মিশিয়ে দিয়েছিল তামাকজাত তীব্র বিষ ‘নিকোটিন’। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিড়িয়াখানা’ উপন্যাসে প্রাক্তন অধ্যাপক নেপাল গুপ্ত ব্যোমকেশকে জানিয়েছিলেন, কেমিস্ট্রি জানা কেউ এক প্যাকেট সিগারেট থেকেই তৈরি করতে পারেন যথেষ্ট পরিমাণ নিকোটিন।
পরের ঘটনা বিহারের। উপন্যাসের নাম ‘বহ্নি–পতঙ্গ’। দীর্ঘ রোগভোগের পরে সেরে উঠেছিলেন দীপনারায়ণ সিং। তখনও সপ্তাহে এক বার তাঁর ইঞ্জেকশন চলছিল। এক সকালে নিয়মমাফিক ইঞ্জেকশন দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই থেমে গেল তাঁর হৃদস্পন্দন। ওষুধে মিশেছিল দক্ষিণ আমেরিকার ভয়ঙ্কর বিষ ‘কিউরারি’। যে রহস্যের সমাধান করেছিলেন ব্যোমকেশই।
গোয়েন্দা কাহিনিতে বিষ যেন অপরাধেরই এক চেনা চরিত্র। আর্সেনিক মেশানো খাবার, ব্র্যান্ডিতে ক্লোরাল হাইড্রেট, ক্ষত বাঁধার পট্টিতে সায়ানাইড—‘হু-ডান-ইট’ জ্যঁরের সাহিত্যের পাতায় বিষের ব্যবহার নতুন নয়। আর বিষপ্রয়োগের কথা উঠলেই মনে পড়ে আগাথা ক্রিস্টির কথা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রেড ক্রসের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি, পরে ওষুধ বিতরণের প্রশিক্ষণ নেন। রসায়ন, ওষুধপত্র ও বিষ সম্পর্কে সেই জ্ঞানই ছাপ ফেলেছিল তাঁর রহস্য-সাহিত্যে। তাঁর ৬৬টি রহস্য উপন্যাসে ৩০-এর বেশি চরিত্রকে ‘ক্রাইম কুইন’ বিষপ্রয়োগে হত্যা করিয়েছিলেন আগাথা।
‘দ্য মিস্টিরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস’ থেকে ‘দ্য পেল হর্স’, ‘আ পকেট ফুল অফ রাই’, ‘স্পার্কলিং সায়ানাইড’, ‘ডেথ ইন দ্য ক্লাউড্স’, ‘ক্রক্ড হাউস’, ‘স্যাড সাইপ্রেস’—একের পর এক কাহিনিতে বিষ হয়ে উঠেছিল হত্যার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। আগাথা ক্রিস্টির রসিক মন্তব্য ছিল, ‘আমাকে যদি ভালো মানের এক বোতল বিষ দেওয়া হয়, তা হলেই আমি নিখুঁত অপরাধের কাহিনি তৈরি করে দিতে পারি।’ শুধু ক্রিস্টি নন, সমসাময়িক ক্রাইম লেখিকাদের মধ্যে ডরোথি এল সেয়ার্স এবং নাইয়ো মার্শের বিভিন্ন গল্পেও এসেছে ভয়ঙ্কর বিষপ্রয়োগের ঘটনা।
সাহিত্যের সেই বিষ এ বার যেন উঠে আসছে বাস্তবের তাক থেকে। কাল, শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনের জন্য মধু গুপ্ত লেনের জগজ্জ্যোতি গ্রন্থাগার ও অবৈতনিক পাঠাগারে শুরু হচ্ছে এক বিরল প্রদর্শনী। সংগ্রাহক সৌভিক মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ নিয়ে আয়োজন করা এই প্রদর্শনীতে দেখা যাবে পুরোনো কলকাতায় ব্যবহৃত বিভিন্ন বিষের শিশি। তার সঙ্গে থাকবে ১৯১৮ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত কলকাতার বাজারে চালু থাকা নানা রকম সিগারেটের প্যাকেট এবং মদের বোতলের লেবেলের সংগ্রহও।
সেই তালিকায় রয়েছে তারানাথ তান্ত্রিকের পছন্দের ‘পাসিং শো’, তৎকালীন জনপ্রিয় ‘কাঁচি’ সিগারেট। থাকবে এখনকার বিপুল জনপ্রিয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিবর্তনের নজিরও। অর্থাৎ বিষের শিশির পাশেই দেখা যাবে সেই সময়কার ধূমপানের ইতিহাস।
বহু পুরোনো গুদামঘর এবং বিভিন্ন মেলা ঘুরে ঘুরে এই সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন সৌভিক। তাঁর কথায়, ‘শিশির মধ্যে কোন ধরনের বিষ রয়েছে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশিটি। সে কালে বিষ ব্যবহার করার পরে শিশি ভেঙে দেওয়ার নিয়ম ছিল— অনেকটা এখনকার ডিসপোজ়েবল সিরিঞ্জের মতো। তাই, এই ধরনের শিশি পাওয়া খুব কঠিন। এর অনেকগুলোই এখন অ্যান্টিক।’
সংগ্রহে থাকা সকল উপাদান অবশ্য নিছক প্রাণঘাতী বিষ নয়। এমন কিছু রাসায়নিক উপাদানও রয়েছে, যেগুলি এক সময়ে গণ্য হতো ‘ভালো বিষ’ হিসেবে— অর্থাৎ নির্দিষ্ট মাত্রায়, নির্দিষ্ট প্রয়োজনে সে সবের ব্যবহার হতো চিকিৎসাতেও। ফলে, প্রদর্শনীটি শুধু বিষ ও বিষ দিয়ে খুনের কাহিনি ফিরে দেখা নয়। এর মধ্যে ধরা থাকছে পুরোনো কলকাতার চিকিৎসা, ওষুধ, ধূমপান এবং অপরাধজগতের এক বিস্মৃত ইতিহাসও