সেই ‘আখরি শমা’ ও মুঘল সাম্রাজ্যের পতন
দিল্লিতে আন্দোলনের যে তীব্রতা দেখা দিয়েছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই তা কড়া হাতে দমন করে ব্রিটিশ। প্রত্যাঘাত অসম্ভব বুঝে, ২০ সেপ্টেম্বর লাল কেল্লা ছেড়ে পূর্বপুরুষ হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় গ্রহণ করেন জ়াফর। পতন হয় মুঘল রাজত্বের। ১৫২৬-এ যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার এমন করুণ পরিসমাপ্তি হবে— কে জানত!
‘করতে হ্যায় উয়োহ ইস তরাহ জ়াফর দিল পে জফায়েঁ,
জ়াহির মেঁ ইয়ে জানো কি জ়ফা কুছ নহিঁ করতে।’
জ়াফর নিজেও কি মেনে নিতে পেরেছিলেন এই ভাগ্য-বিড়ম্বনা? তিনি সম্রাট অবশ্যই, কিন্তু তা তো নিছক নামে! প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশদের পেনশনভোগী। তদুপরি, একজন কবি। সিংহাসনে বসেছেন ১৮৩৭-এ, কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই তাঁর কবিতাচর্চার শুরু— যৌবনেই। কবি হিসেবে পেয়েছেন সম্মান ও খ্যাতিও। তথাকথিত বিলাস ও প্রমোদে ডুবে থাকার প্রচলিত ভাষ্যের প্রাবল্যে প্রায়ই আড়ালে থেকে যায় তাঁর দীর্ঘ কাব্যচর্চার কাহিনি। সম্রাটের মধ্যে লুকিয়ে যে কবি, তিনি কি মেনে নিতে পেরেছিলেন এই পরিণতি?
২১ সেপ্টেম্বর ক্যাপ্টেন হডসনের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন জ়াফর। প্রতিশ্রুতি পেলেন, প্রাণে মারা হবে না তাঁকে। তবে রেহাই পেলেন না জ়াফরের দুই পুত্র মির্জ়া মুঘল ও মির্জ়া খিজির সুলতান। তা ছাড়াও, দরবারের বহু লোককে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। জ়াফরকে ঘিরে শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদীদের বিচার। অভিযোগ— ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, পেনশনভোগী হয়েও বিশ্বাসঘাতকতা, ইউরোপীয়দের হত্যায় সহায়তা প্রভৃতি। আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন জ়াফর। কিন্তু তা অনুকূলে যায়নি, বলাই বাহুল্য। ১৮৫৮-র মার্চ মাসে আদেশ হয়, নির্বাসনে পাঠানো হবে তাঁকে। তখন তাঁর বয়স তিরাশি বছর।
সমসময়ের শ্রেষ্ঠ উর্দু কবি মির্জ়া গালিবের সমর্থন ছিল ইংরেজদের প্রতি। ফলে, দিনলিপিতে জ়াফর সম্পর্কে উল্লেখ খুব বেশি পাওয়া যায় না। তিনি লিখছেন— ‘আমি সম্রাট আর সম্রাট-তনয়দের পরিণতি সম্পর্কে কিছুই লিখিনি, অথচ এ সব ঘটনা দিল্লি শহর বিজয়ের কথায় প্রথমেই লেখা উচিত ছিল। না লেখার কারণ একটাই। আমার সব কিছু ছিল কানে শোনা ঘটনা। আর ছিল শুনতে পাইনি এমন সব ঘটনাও।’ এই সব পড়ে মনে হয়, জ়াফরের প্রতি সহানুভূতি হারাননি গালিব। স্মৃতিতে কি উঁকি দিচ্ছিল একসঙ্গে কবিতাচর্চার দিনগুলি?