শেষবার তিনজন - 24 Ghanta Bangla News
Home

শেষবার তিনজন

Spread the love

মূল গল্প: ডেড উয়োম্যান্‌স সিক্রেট | লেখক: গি দ্য মোপাসাঁ

ভাষান্তর: ইরাবান মুন্সি

একটুও কষ্ট পেলেন না তিনি। কী নিশ্চিন্ত, নির্ভার মৃত্যু! তাঁর মতো একজন আগাগোড়া সৎ ও সংবেদনশীল নারীর মৃত্যু বোধ হয় ঠিক এমনটাই হওয়া উচিত। নিজের বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে রয়েছেন তিনি। আচমকা চোখে পড়লে মনে হবে, অবেলার গভীর ঘুম। তিনি বৃদ্ধ হয়েছিলেন। তবে, তাঁকে এমন ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে বয়স টের পাওয়া যায় না। মুখের চামড়া থেকে শোকের শেষতম বিন্দুটিও মিলিয়ে গিয়েছে। পরিপাটি করে বাঁধা লম্বা চুল। তার মধ্যে অতি যত্নে বসানো সেই মুখ প্রশান্তিতে ভরা। দেহে এখন প্রাণ নেই ঠিকই, কিন্তু, ওই মুখ দেখলে বোঝা যায়, যে প্রাণটি ছিল, তা কখনও তার কর্তব্যপালনে একচুলও নড়চড় করেনি। মৃত্যুর মুহূর্তে কি কোনও অনুতাপ তাঁকে স্পর্শ করেছিল? মুখ দেখে তা বোঝা যায় না। স্পর্শ করে থাকলেও কোথাও তার আর কোনও চিহ্ন নেই।

বিছানা জুড়ে পড়ে আছে তাঁর মৃত শরীর। ওই বিছানার পাশেই হাঁটু গেড়ে কাঁদছিল তাঁর দুই সন্তান। পুত্র অতি কড়া একজন বিচারক। প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই কড়া বলে বদনাম আছে। সম্প্রতি পরপর কয়েকটা রায় দিয়ে সেই বদনাম বাড়িয়েছে। কন্যার আগের নাম ছিল মার্গেরিত, সন্ন্যাস নেওয়ার পরে নাম বদলে হয়েছে সিস্টার ইউলালি। ছোটবেলা থেকেই দুই ভাইবোন মায়ের কাছে নীতিশিক্ষার আগামুড়ো গুলে খেয়ে মানুষ। ধর্মীয় নিয়মনীতি অক্ষরে-অক্ষরে পালন করতে হবে। কোনও ধরনের চারিত্রিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। মায়ের নীতিশিক্ষা পেয়ে ছেলে বড় হয়ে নামকরা বিচারক হলো। আইনকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করা শুরু করে অতি দুর্বল আর বিপদে পড়া অসহায় মানুষদেরও একফোঁটা দয়া না দেখিয়েই কঠোর শাস্তি দিতে শুরু করল। আর মেয়ে? মায়ের শাসনে বড় হয়ে পাপ আর পুণ্যের নানা বেড়াজালে আটকে পুরুষদের প্রতি একরাশ ঘৃণায় শেষমেশ ঈশ্বরকেই বিয়ে করে বসল!

এই দুই ভাইবোন তাদের বাবাকে প্রায় চিনতই না। ‘বাবা’ বলতে আবছা একটু স্মৃতি রয়েছে। আর কিছু মনে নেই তাদের। বাবা কে ছিল, কোথায় চলে গেল, কিছুই জানা হয়নি তাদের। আসলে জানানো হয়নি। শুধু এটুকুই তারা দুই ভাইবোন ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছে যে, তাদের মা-কে খুব কষ্ট দিয়েছিল লোকটা।

বিছানার একপ্রান্ত থেকে মৃতার ঝুলে পড়া হাতটা ধরে ডুকরে কাঁদছিল সন্ন্যাসিনী। সৌন্দর্য কী অনায়াস পূর্ণতা পেয়েছে সেই হাতে! অপর হাতটি তখনও কুঁচকে থাকা বিছানার চাদরটা ধরে রয়েছে। প্রাণের শেষবিন্দুটুকু বেরিয়ে যাওয়ার সময়ের ছটফটানির স্বাক্ষর বহন করছে সেই হাত। মৃত মায়ের হাত ধরে বসে কাঁদছে মেয়ে। এমন সময়েই ঘরের দরজায় কয়েক বার আস্তে টোকা পড়ল। কান্নায় নুইয়ে পড়া মাথা তুলে তাকাল সিস্টার ইউলালি। পাদ্রি এসেছেন। রাতের খাওয়া সেরে উঠেছেন সবে। দেখেই বোঝা যায়, চরম তৃপ্তি করে ভরপেট খেয়ে ফেলেছেন। মুখ লাল, হাঁপ ধরেছে।

মুখে জোর করে একটা পেশাদারি দুঃখ ফুটিয়ে তুলেছেন সেই পাদ্রি। মৃত্যু আসলে তার রুটিরুজি। দুঃখে বিগলিত হয়ে পড়লে তাঁর চলবে কী করে! তবে, শোকগ্রস্ত হওয়ার অভিনয়টা তো একটু করতেই হয়! স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ক্রুশচিহ্ন এঁকে প্রয়াত নারীর কান্নায় ভেঙে পড়া কন্যার কাছে এসে বললেন, ‘আহা রে! এ যে কী কষ্ট! শেষ সময়টায় তোমাদের পাশে থাকতে এলাম। আমিও এই কষ্টের শরিক।’

সিস্টার ইউলালি কান্না থামিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ, ফাদার। কিন্তু, আমি আর আমার ভাই এই সময়টা মায়ের কাছে, মায়ের সঙ্গে একটু একা থাকতে চাই। শেষবারের মতো আমরা তিনজন আবার একসঙ্গে থাকতে চাই। যেমন থাকতাম আগে, বহু বহু বছর আগের সেই দিনগুলোয়, যখন আমরা… আমরা… আমরা খুব ছোট, আর আমাদের অস… অসহায় মা… ’

কথা আটকে গেল। বাকিটুকু আর বলতে পারল না।

মাথা নিচু করে রইলেন পাদ্রিসাহেব। রাতের ঘুমটা লাটে উঠবে না ভেবে তাঁর মুখে সকলের অলক্ষ্যেই স্বস্তি ফিরে এল। মুখে বললেন, ‘ভেবেছিলাম, এমন অসময়ে তোমাদের পাশে থাকব। কিন্তু, তোমরা তা চাও না যখন…’

হাঁটু গেড়ে বসে ক্রুশচিহ্ন এঁকে প্রার্থনা করলেন। তার পর ওই মাথা নিচু করেই বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে মৃদু বিড়বিড় করলেন, ‘খুব ভালো মানুষ ছিলেন’।

ঘরে এখন তিনজন। মৃতা ও তাঁর

দুই সন্তান।

মাঝরাত। অন্ধকারে একটা ঘড়ির একটানা মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা নুড়িপাথরের মতো অনাদরে পড়ে থাকা জ্যোৎস্না খোলা জানলা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ছিল। বাড়ির আশপাশের মাঠ থেকে, বন থেকে কোনও শব্দ আসছে না। মৃত্যুর মলিন, বিষণ্ণ ও বুকে ধক করে লাগা সত্যটি জোনাকির মতো দপদপ করে জ্বলে।

বিছানার একপাশে কন্যা আর একপাশে পুত্র। কড়া বিচারক পুত্র আচমকা পাঁচ বছরের শিশুর মতো ‘ও মা! মা! ও মা!’ করে কেঁদে উঠল।

মেয়ে কাঁদছিল ‘যিশু! যিশু! মা-কে নিয়ে নিলে! যিশু!’

পাদ্রি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই মৃত্যুর সত্য আরও বেশি করে জ্যান্ত হয়ে উঠল ঘরের ভিতর।

বিছানার দু’পাশ থেকে মায়ের শরীর ছুঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে এক সময়ে হাঁপিয়ে গেল দুই ভাইবোন।

কান্না থামল।

মায়ের মুখের দিকে পলকহীন চেয়ে থাকে ভাইবোন। যে মা আর কখনও কথা বলবে না, দুপুরবেলায় বিকেলবেলাগুলোয় হেসে উঠবে না, তার সেই কথার শব্দ, তার সেই হাসির শব্দ মনে করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে তারা দু’জনে।

মনে পড়ল, কোনও কথা খুব জোর দিয়ে বলার সময়ে গানের তাল দেওয়ার ভঙ্গিতে হাতটা একটু নাড়ত মা।

বোন হঠাৎ বলে উঠল, ‘দাদা, তোর মনে আছে, মায়ের চিঠি পড়ার নেশার কথা? একই চিঠি বারবার ফিরে পড়ত। ওই সময়ে মনে হতো, মায়ের জীবনটাই আসলে লুকিয়ে রয়েছে ওই চিঠিগুলোর মধ্যেই। কী বিরক্ত লাগত আমার মাঝেমাঝে! একবার বলেওছিলাম, একই চিঠি তো সব। কী আনন্দ পাও তুমি পড়ে? মা আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল।’

বোন একটু থামল। তার পর বলল, ‘ওই চিঠিগুলো সব ড্রয়ারে রয়েছে। একটা কাজ করবি? দু’জনে মিলে মায়ের চিঠিগুলো পড়বি? মা যখন ডেকে ডেকে চিঠি পড়ে শোনাতে চাইত, পাত্তা দিতাম না। কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে, মা তো চলে গেল, মা যাদের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে আলাপ করাতে চাইত, তাদের কথা একটু জানি। যে দাদু-দিদিমাকে কোনওদিন দেখিনি, মা-কে চিঠি লিখত তারা, তাদেরও হয়তো কিছুটা জানা যাবে চিঠিগুলোর মাধ্যমে। তাদের চিঠিগুলোও তো এখানেই আছে। মায়ের জীবনের অনেকটা রয়ে গেছে ওই ড্রয়ারেই’।

ড্রয়ার থেকে হলদে হয়ে যাওয়া মলিন কাগজের গোটা দশেক ছোট ছোট গোছা বার করল দু’জনে। বহু বছর ধরে অতি যত্নে রাখা চিঠির গোছা। প্রতিটি চিঠিই সুতো দিয়ে সুন্দর করে বাঁধা, একটির পাশে আর একটি সাজানো। ড্রয়ার থেকে চিঠির গোছা বের করে মেঝেতে এনে রাখল মার্গারিত ও তার দাদা।

চিঠিগুলো এক লহমা দেখলে মনে হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডাঁই হয়ে পড়েছিল ওগুলো। যাদের কথা একমাত্র মৃত মানুষটি ছাড়া কেউ কখনও ভাবেনি!

প্রথম চিঠিতে লেখা, ‘আমার আদরের মেয়ে’। আর একটিতে, ‘আমার মিষ্টি পুঁচকে মেয়েটা’। কোনওটাতে একটু কাব্যিক: ‘আমার স্নেহের সন্তান’। কোনওটায় আবার, ‘আমার প্রিয় কন্যা’। একই মানুষ একই মানুষের উদ্দেশে চিঠি লিখছে অথচ বারবার নতুন সম্বোধন। বিষয়টা ভেবে, এত শোকের মধ্যেও একটু মজা লাগল ওদের।

মায়ের চিঠিগুলো জোরে জোরে পড়তে শুরু করল মেয়ে। মায়ের জীবনের নানা ঘটনার সাক্ষী ওই চিঠিগুলো। মায়ের চিঠি পড়ছে মেয়ে। আর মায়ের বিছানায় গালে হাত দিয়ে বসে তা মন দিয়ে শুনছে ছেলে। মায়ের তীক্ষ্ণ ও আলোছায়াময় মুখের আদল পাওয়া ভাইবোন চিঠিগুলোর মাধ্যমে মায়ের হাত ধরেই স্পর্শ করে নিচ্ছিল নিজেদের অজানা ও অচেনা অতীতকে। চিঠির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশও স্পন্দিত জীবনের মধ্যে দিয়ে ফিরে ফিরে আসছে। মৃত মা ও জীবন্ত দুই সন্তানকে একই সঙ্গে দুঃখী ও সুন্দর দেখাচ্ছিল।

চিঠি পড়া হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে মেয়ে বলল, ‘এগুলো সব মায়ের সঙ্গেই কবরে যাবে। মায়ের বন্ধু ছিল এগুলো। চিঠিগুলো দিয়ে মায়ের গোটা শরীরকে মুড়ে দেব। মা কখনও বলেনি এ কথা, তবে আমি নিশ্চিত যে বেঁচে থাকলে, মা-ও এই প্রস্তাবে

সায় দিত’।

কথা বলতে বলতেই একটা নতুন চিঠির গোছা তুলে নিল সিস্টার ইউলালি। এগুলোর কোনওটাতেই নাম লেখা নেই। তার থেকে একটি তুলে নিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে উঁচু গলায় পড়তে শুরু করল সে: ‘প্রিয়তমা, তোমাকে ভালোবেসে পাগল হয়ে গিয়েছি। গতকাল থেকে নরকের আগুনে পুড়ে যাচ্ছি আমি। তোমার চোখ, তোমার হাসি, তোমার কথা বলার ভঙ্গি, আসলে তোমার স্মৃতি আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। আর যতবার এমনটা হচ্ছে, ততবারই, ঠিক সেই মুহূর্তে আবার টের পাচ্ছি, আমার ঠোঁট আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তোমার ঠোঁটকে। একে অপরকে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে ধরছে দুটো শরীর। আমার চোখের সামনে তোমার চোখ, আমার শরীরের নীচে তোমার শরীর। আমি তোমাকে ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি! তুমি আমাকে পাগল করে দিয়েছ। আবার তোমাকে পাব, এই প্রচণ্ড ইচ্ছেই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই একটিমাত্র ইচ্ছেই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবেও সারা জীবন। আমার সমস্ত শরীর তোমাকে ডাকছে, তোমাকে প্রবল ভাবে পেতে চাইছে। তোমার চুমুর স্বাদ এখনও আমার মুখে, আমার স্মৃতিতে…’

সিস্টার ইউলালির পড়া থেমে গেল। এতক্ষণ মায়ের পাশে বিছানায় গালে হাত দিয়ে বসে থাকা বিচারকও টানটান হয়ে উঠে বসল।

তার পর বোনের হাত থেকে চিঠিটি ছিনিয়ে নিল। কোনও সই আছে কি? নেই। ‘যে শুধুই তোমার কথা ভাবে’ কথাটির নীচে একটা নাম লেখা— অঁরি।

বাবার স্মৃতি ততটা না থাকলেও, বাবার নামটা দুই ভাইবোনই জানে। তাদের বাবার নাম— রেনে।

এবার ওই নামহীন চিঠির গোছা থেকে আর একটি চিঠি বার করে আনল মৃতার পুত্র। পড়া শুরু করল, ‘তুমি আদর না করলে আমি আর বাঁচতে পারব না…’

পড়া থামিয়ে ছেলে উঠে দাঁড়াল। এক মুহূর্তের জন্য মৃতার দিকে তাকাল। এই তাকানো মায়ের দিকে সন্তানের তাকানো নয়। দণ্ডিতের দিকে বিচারকের চাহনি। মৃতা নির্বিকার। রাত গভীর হলো।

সন্ন্যাসিনী কন্যা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। দাদার দিকে চেয়ে ছিল সে। বাইরের হাওয়া এসে ঘরে থাকা বেশ কয়েকটা মোমবাতির মধ্যে একটা-দুটো নিভিয়ে দিল।

চিঠির গোছাগুলো এলোমেলো করে ছুড়ে দিয়ে ড্রয়ারটা বন্ধ করে মায়ের বিছানার চারপাশের পর্দা টেনে দিয়ে অতি ধীরে ঘরের শেষ প্রান্তের বড় খোলা জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল

মৃতার পুত্র।

মেয়ে মাথা নিচু করে বসে ছিল।

পর্দার আড়ালে মায়ের মৃত শরীর। জানলার সামনে ইজ়িচেয়ারে বসে রইল ছেলে। মেঝেতে বসে রইল মেয়ে। মায়ের মুখটা আর কেউ দেখল না। তার পর অনেকক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না।

ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণ বাদে ইজ়িচেয়ার থেকে উঠে এল বিচারক-পুত্র। পর্দার ভিতরে পড়ে আছে মায়ের মৃতদেহ। ওই দিকে একবারও আর না তাকিয়ে

একটি বাক্যই বলল সে: ‘চল বোন, এবার আমরা যাই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *