কে জি সুব্রহ্মণ্যন : কাগজ-জোড়া রঙ রেখার প্রতিদিনের কাব্যকথা
অতনু বসু
৯২ বছর জীবনভর পড়াশুনো লেখালিখি অধ্যাপনা গ্রন্থপ্রকাশ বক্তৃতা চিত্রভাস্কর্যই করে গেলেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সিনারিও অব মডার্ন ইন্ডিয়ান আর্ট-এর ধারাবাহিক আবহেও কে জি সুব্রহ্মণ্যন-এর নাম নীলাভ- হীরক ঔজ্জ্বল্যে খোদিত থাকবে বলাই বাহুল্য। নিজস্ব সৃষ্টির সমস্ত রকম দৃশ্যশিল্প-সহ তাঁর এলিট ইন্টেলেকচুয়াল ডিসিপ্লিন-এর মাহাত্ম্য অপরিসীম। তাঁর বিস্ময়কর লেখালিখি ও সংকলন এখনও শিল্পকলার ছাত্রছাত্রী, বিশেষজ্ঞদের কাছে আকর গ্রন্থ। শিল্পীর ৫৯টি কাজ নিয়ে আকৃতি আর্ট গ্যালারি আয়োজিত, ‘দ্য পোয়েট্রি অব দ্য এভরিডে: কে জি সুব্রহ্মণ্যন অ্যান্ড দ্য আর্ট অব সিয়িং’ নামের প্রদর্শনীটি সদ্য শেষ হলো।
সব কাজই কাগজে করা, কোনও-কোনও কাজ কাগজের দু’দিকেই ড্রয়িং। কালার পেন্সিল, বলপয়েন্ট পেন, ক্রেয়ন, ইঙ্ক, গোয়াশ, ওয়াটার কালার, মার্কার পেন, ব্রাশ ওয়ার্ক, ওয়াশ অ্যান্ড পেন ইঙ্ক, লিনোকাট, ওয়ক্স পেন্সিল, পেন্সিলের এতো কাজ একসঙ্গে দেখা গভীর অভিজ্ঞতা দর্শকের।
কে জি সুব্রহ্মণ্যন, ওরফে ‘মাণি দা’ দ্বিমাত্রিক চিত্রশিল্পে মাধ্যমের বৈচিত্রেই শুধু নয়, একটা কৌতূহলোদ্দীপক টেকনিক, অনন্যসাধারণ স্টাইল, কম্পোজ়িশন, অ্যারেঞ্জমেন্টকে লেজেন্ডারি করে তুলেছিলেন। বর্তমান প্রদর্শনীর প্রায় অধিকাংশ ড্রয়িং বেসড্ ওয়ার্ক বা গোয়াশ, ওয়াটার কালার, ব্রাশ ওয়ার্ক, ওয়াশ অ্যান্ড পেন ইঙ্ক-এও সহজে চোখ না সরানোর একটা অভিজ্ঞতার রেশ রেখে দিয়ে গিয়েছেন দর্শকের জন্য। আপাতদৃষ্টিতে সরু লাইনসের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন জটিল আবহের একদিকে ছোট্ট অথচ গভীর ড্রামাটিক একটি ইমেজকে প্রখর করেছেন, আবার ওই সমূহ কম্পোজ়িশনের কোথাও হঠাৎই একটু খেলাচ্ছলে রঙিন ক্রেয়ন ঘষে দিয়ে ছবির নিহিত অর্থ স্পষ্ট করেছেন। যেখানে তা করেননি, সে সব ড্রয়িংয়ে কয়েকটি বিভাজন করে তিন-চার রকম রঙে তাদের সম্পূর্ণতা দিয়েছেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে, একই ছবিতে দু’টি তিনটি এমনকী চারটি মাধ্যমকেও ব্যবহার করেছেন। এই অনলস ক্রিয়ার চর্চা তাঁর দীর্ঘকালীন এক নীরিক্ষাপর্বের সূচনা থেকে উৎসারিত হয়ে পট ও মাধ্যম একটি বিবর্তিত বাঁকের দিকে চলে গিয়েছিলো। যেখানে পটের বিপরীত পিঠের ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিলো তাঁর ‘রিভার্স পেন্টিং’-এর এক অপূর্ব সমাহার। যদিও সে প্রসঙ্গ এখানে অপ্রয়োজনীয়, তবু অমন অ্যারেঞ্জমেন্ট, কম্পোজ়িশন থেকে আহরিত বাস্তবতাও তো পরবর্তীতে কিছু ড্রয়িং–এ প্রতিফলিত হয়েছে। সেই উৎসমুখের কিছু দৃষ্টান্ত অনুষঙ্গ হিসেবেও এ সব ড্রয়িংয়ের মধ্যেও স্মৃতিচিহ্নের মতো উস্কে দেয়। তারই কিছু আংশিক প্রতিফলনকে প্রত্যক্ষ করা যায় বলেই এ সব কথা উল্লেখ করতে হলো। কে জি কিন্তু বরাবরই তাঁর কম্পোজ়িশনে আক্ষরিক অর্থে একটি ড্রামাটিক মুভমেন্টকে বাস্তবায়ন করে গিয়েছেন ভিন্ন দ্বিমাত্রিকতায়। ২০০৩-এ দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট’–এ তাঁর রেট্রোস্পেকটিভ এক্সিবিশন দেখে এ ধারণা আরও স্পষ্ট হয়েছিলো। আমৃত্যু তাঁর অবিরল অজস্র কাজে তবু সেই দীর্ঘকালীন চেনা ছন্দের অবিস্মরণীয় রেখাঙ্কন বা কম্পোজ়িশনের ম্যাজিক কিন্তু কোনও ভাবেই সরে যায়নি অন্য কোনও বাঁকে। বরং এ প্রদর্শনীর অতি সরলীকরণের বহু ড্রয়িংয়েও অতি চেনা বহু অভিব্যক্তি কিন্তু কোথাও অনতি অতীতের অবিকল কিছু নাটকীয় মুহূর্তকে মনে পড়িয়ে দেয়।

প্রধানত মানুষ, (কিছু পশু পাখি), বিবিধ অভিব্যক্তি, নানান অঙ্গভঙ্গীর মধ্যে দিয়েই যে কথোপকথন তিনি রচনা করেছিলেন কুশীলব বা তাঁর সৃষ্টির নায়ক-নায়িকার মধ্যে, সেখানে বারবার তিনি এই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, এই মুহূর্তটি একটি নাটকীয় দৃশ্যকল্পের মতো হলেও তা অতি নাটকীয় নয়, আবার কোনও ভাবেই সচিত্রকরণও নয়। দর্শকের মনে হতেই পারে কোনও ড্রয়িং হয়তো কোনও পেন্টিং-এর খসড়া, তাও নয়, ওটিই একটি পূর্ণাঙ্গ ড্রয়িং। যেখানে কিছু টুকরো অংশকে আলাদা ভাবে যুক্ত করেছেন সমগ্র কাজটিতে, যখন তা সন্নিবেশিত হয়ে একটিই সংগঠন তৈরি করছে গোটা ঘটনাটিতে। রং কোথাও কিছুটা উজ্জ্বল হলেও প্রগাঢ় নয়, অনেক ক্ষেত্রে আপাত নিরীহ বর্ণের আবছায়ার মধ্যেও একটি ড্রয়িং তার নিজস্বতাকে প্রখর, বাঙ্ময় করে তুলেছে। পেন্সিলে করা মকবুল ফিদা হুসেনের প্রতিকৃতি, সাদার প্রাধান্য রাখা গোয়াশের চারটি মুখ বা বিস্তারিত চোখে কাউকে দেখা বা হাত পা ছড়িয়ে কথা বলার মুহূর্তগুলো আশ্চর্য সব বার্তা বহন করে। ড্রয়িংয়ের কাজেও হাইলাইট আলাদা রঙে বা পেপার হোয়াইটের ব্যবহার তার প্রতীকী তাৎপর্যকেই ইঙ্গিত করে। প্রতিটি মুখাবয়ব, অভিব্যক্তি, মুহূর্ত, নাটকীয়তা, রৈখিক কাব্যময়তার এই দৃশ্যকল্প কি সহজে দর্শন থেকে অন্তর্হিত হতে পারে?
