নতুন প্রযুক্তির দাপটে ভাষাও ক্রমশ বিপন্ন?
এই যে কথ্য ভাষার নানান দ্বন্দ্বের হাত ধরে লিখিত আকারে বিবর্তিত হওয়ার প্রক্রিয়া, নিকোলাস কার তাঁর ২০১০ সালের ‘দ্য শ্যালোজ়’ গ্রন্থে সেই স্ববিরোধকেই ভাষা ও মনস্তত্ত্বের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রসারিত করলেন। তাঁর মতে, কথা বলা মানবপ্রজাতির স্বাভাবিক ক্ষমতা, কিন্তু পড়া ও লেখা অর্জিত প্রযুক্তি। শ্রুত বা মৌখিক সংস্কৃতিতে ভাষা তাই স্মৃতির সীমায় নিবদ্ধ— ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, পরিচিত বাক্যবন্ধ, আবৃত্তি ইত্যাদিই জ্ঞানের আধার। লেখা ভাষাকে মুক্ত করল। দীর্ঘতর যুক্তি, বিমূর্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যক্তিমানসের বাইরে বেরিয়ে এল জ্ঞান। এখান থেকেই প্রযুক্তির সঙ্গে ভাষার দ্বান্দ্বিক সংসার-যাপন শুরু। অর্থাৎ লিখন পদ্ধতি, যা পরে হায়ারোগ্লিফিক্স, গ্রিক, লাতিন ইত্যাদি ধাপ পেরিয়ে আজকের হাজার অক্ষরমেলায় উপনীত, তা ভাষার প্রথম প্রযুক্তিগত প্রকাশ।
একই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার দুই বিপরীত গতিকে দু’ভাবে প্রকাশ করলেন কেলি ও কার। কেলির অনুমান, হাতিয়ার-প্রযুক্তির ব্যবহারই হয়তো ভাষার জন্মের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক ক্ষমতার সৃষ্টি করেছিল। অন্য দিকে পরবর্তী লেখনী-প্রযুক্তি কী ভাবে ভাষাকে এবং তার মাধ্যমে মানুষের চেতনাকে পুনর্গঠিত করেছে, কার সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। উভয় দিকের আলোচনাতেই এক আদিম সত্য বারংবার উঠে এসেছে— প্রযুক্তি মানব মস্তিস্কে নতুন নতুন বৌদ্ধিক ক্ষমতা যেমন জাগিয়ে তুলতে পারে, আবার প্রযুক্তির হাতে নির্দিষ্ট কোনও ক্ষমতার হস্তান্তর হলে ব্যবহারের অভাবে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট সেই অংশ দুর্বলও হয়ে যেতে পারে। আজ সে কথা নিউরোবায়োলজির গবেষণায় বারংবার প্রমাণিত।
সেই প্রাগৈতিহাসিক শিকারভূমি আর প্লেটো-র এথেন্স পেরিয়ে আবার স্মার্টফোনের পর্দায় ফিরি আসুন। গেমিং ও লাইভস্ট্রিম সংস্কৃতি থেকে ‘রিজ়’ কয়েক প্রজন্ম নয়, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে মূল ধারার কথ্য ভাষায় পৌঁছে গিয়েছিল। ইয়ুটিয়ুবের একটি সিরিজ় থেকে উঠে আসা জেন আলফার ‘স্কিবিডি’ বারংবার ব্যবহারের ভিতর দিয়ে নানান অর্থ অর্জন করে শেষ পর্যন্ত জায়গা পেল কেমব্রিজ অভিধানে। থরো-র লেখায় ১৮৫৪ সালে প্রথম নথিভুক্ত ‘ব্রেন রট’ অপ্রয়োজনীয় অনলাইন বিষয়বস্তু গেলার অভ্যাস বোঝাতে শুধু যে ফিরেই এসেছে তা-ই নয়, ২০২৩ থেকে ২০২৪-এর মধ্যে শব্দটির ব্যবহার ২৩০ শতাংশ বেড়েছে বলেই খোদ অক্সফোর্ড-এর মত। অর্থাৎ প্রযুক্তির বিস্তার, মূলত সমাজ মাধ্যম ও এআই চ্যাটবট ব্যবহারের সঙ্গে ভাষা ব্যবহারের এই সঙ্কুচিত হয়ে আসার একটা সাময়িক সম্পর্ক বেশ স্পষ্ট।