ভারতে এত ধর্মের সহাবস্থান কীভাবে হল? | Why india has so many religions historical coexistence explainer
একই গলির দুই ধারে এক জায়গায় মন্দির, কয়েক কদম দূরে মসজিদ, আবার তার পাশেই হয়তো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে চার্চ কিংবা গুরুদ্বার। শহরের পুরনো অলিগলি দিয়ে হেঁটে গেলে দৃশ্যটি বড্ড চেনা। ভারতে এটি কোনও পূর্বপরিকল্পিত মানচিত্রের ফল নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি সভ্যতার ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার ইতিহাস।
শেষ জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ হিন্দু, ১৪ শতাংশের কিছু বেশি মুসলিম এবং বাকি অংশ জুড়ে রয়েছে খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এবং ক্ষুদ্র কিছু সম্প্রদায় যেমন পার্সি ও ইহুদি। আপাতদৃষ্টিতে পরিসংখ্যানটিকে একটি বিশাল গোষ্ঠী এবং কয়েকটি ছোট সম্প্রদায়ের সমাহার মনে হলেও, এর পেছনের ঐতিহাসিক গভীরতা রূপকথাকেও হার মানায়।
বিশ্বের চারটি বড় ধর্মের জন্ম এই ভারতেই। হিন্দুধর্মের নির্দিষ্ট কোনও একক প্রতিষ্ঠাতা বা সূচনালগ্ন নেই; হাজার বছর ধরে বিকশিত এক দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের ফসল এটি। আনুমানিক ২৫০০ বছর আগে ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের। আর তুলনামূলকভাবে অনেকটাই পরে, পঞ্চদশ শতকে পঞ্জাবের মাটিতে গুরু নানকের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় শিখ ধর্ম। এই চার মূল ধারা এককথায় ভারতীয় ভূখণ্ডেরই নিজস্ব সন্তান।
অন্যদিকে, বহিরাগত ধর্মগুলোর আগমন ঘটেছিল ভিন্নভাবে, যার সময়রেখা অনেকের জন্যই বেশ চমকপ্রদ। সাধারণত ধারণা করা হয়, ইউরোপীয়দের আগমনের সঙ্গেই ভারতে খ্রিস্টধর্মের প্রবেশ ঘটেছিল। কিন্তু ইতিহাস বলে, খ্রিস্টাব্দের মাত্র ৫২ সালে, যখন ইউরোপের বড় অংশ খ্রিস্টধর্মের নামও শোনেনি, তখন যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই সেন্ট থমাস কেরালা উপকূলে পদার্পণ করেছিলেন। ঠিক একইভাবে, উত্তর ভারতে কোনও ধরনের সামরিক অভিযানের বহু আগেই আরব বণিকদের হাত ধরে ভারতের পশ্চিম উপকূলে পা রেখেছিল ইসলাম ধর্ম। কেরালার ‘চেরামান জুমা মসজিদ’ পৃথিবীর প্রাচীনতম সক্রিয় মসজিদগুলোর অন্যতম হিসেবে গণ্য হয়। অন্যদিকে, সহস্রাব্দেরও আগে পারস্যে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন পার্সিরা। আজ সারা বিশ্বে তারাই পার্সি বা জরোঅস্ট্রিয়ান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় অংশ। পাশাপাশি, কেরালা ও কোঙ্কন উপকূলে বাস করা ক্ষুদ্র ইহুদি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস এতটাই প্রাচীন যে, আধুনিক ইজরায়েল গঠন বা অ্যান্টি-সেমিটিজমের বহু আগে থেকেই তাদের অবস্থান এখানে সুপ্রতিষ্ঠিত।
স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ভারতের এই ধর্মীয় বৈচিত্র্য হঠাৎ কিংবা আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। বর্তমান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের জন্ম হওয়ার বহু আগেই এই ভৌগোলিক মানচিত্রে প্রতিটি ধর্ম শিকড় গেড়েছিল।
স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এত বৈচিত্র্য এবং ভিন্নতাকে একটি দেশ কীভাবে সামলে রেখেছে? কেন এটি সংঘাতের চূড়ান্ত কারণ হয়ে ওঠেনি?
এর উত্তর মেলে ভারতের সংবিধানে। অনুচ্ছেদ ২৫ থেকে ২৮ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ ধর্ম পালন, প্রচার ও পছন্দের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রের জন্য নিরপেক্ষতার সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ১৯৭৬ সালে সংবিধানে আনুষ্ঠানিকভাবে “ধর্মনিরপেক্ষ” শব্দটি যোগ করা হয়, তবে একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র কাঠামো ১৯৫০ সালে সংবিধান কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই গড়ে উঠেছিল।
অবশ্য এই ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহাবস্থান বারবার নানা পরীক্ষা ও প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। কোন উৎসবে সরকারি ছুটি মিলবে, বিয়ে বা সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব ধর্মীয় আইন কীভাবে প্রযোজ্য হবে কিংবা সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকার রক্ষার সীমানা কতখানি—এসব নিয়ে বিতর্ক আজকের আদালতের এজলাস থেকে সোশাল মিডিয়ায় অব্যাহত।
তবে তর্ক-বিতর্কের ঊর্ধ্বে ইতিহাস আমাদের এক দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। ভারত শত শত বছর ধরে নতুন নতুন বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে গ্রাস না করে বা নিজে হারিয়ে না গিয়ে আপন করে নিয়েছে। আবার এই মাটি থেকেই নতুন আদর্শ ও ধর্মকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। বিরোধ বা ভিন্নমত কখনওই মুছে যায়নি, তবে সেটি দেশের কাঠামোকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলতেও পারেনি।
ভারতের এই ধর্মীয় বৈচিত্র্যময় মানচিত্রকে হয়তো কোনও একক সমীকরণ বা সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি মূলত একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংলাপ, যা আমাদের জন্মের বহু আগে থেকে শুরু হয়েছে। আর আজকেও আমাদের শহরের কোনও না কোনও সাধারণ গলিতে সেই একই সহাবস্থানের গল্প নীরবে লেখা হয়ে চলেছে।