টাইগমাংশু ধুলিয়ার ডাকাতের গল্পে সেই পুরনো ঝাঁজ নেই
মুম্বই: ‘অ্যানিম্যাল’, ‘ধুরন্ধর’ কিংবা ‘টক্সিক’-এর মতো হিংসাত্মক ও অ্যাকশননির্ভর ছবির সময়ে দাঁড়িয়ে পরিচালক টাইগমাংশু ধুলিয়া যেন ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাঁর পরিচিত জগতে। ডাকাত, বুন্দেলখণ্ডের রুক্ষ প্রান্তর, রাজনীতি, পুলিশ এবং ক্ষমতার অন্ধকার সমীকরণ নিয়ে তৈরি করেছেন ‘ঘামাসান’ (Ghamasaan)। কিন্তু যে তীব্রতা এবং সূক্ষ্মতার জন্য ধুলিয়া পরিচিত, এই ছবিতে তার অনেকটাই অনুপস্থিত।
১৯৯৪ সালের শেখর কাপুরের ‘ব্যান্ডিট কুইন’-এ কাস্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছিলেন ধুলিয়া। পরে ২০১২ সালে ইরফান খানকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন কাল্ট ছবি ‘পান সিং তোমর’। সেই অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই ‘ঘামাসান’-এ প্রতীক গান্ধীকে স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের অফিসার এবং অর্জুন ওয়ারসিকে বাস্তব চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত ভয়ঙ্কর ডাকাত মহারাজা প্যাটেল হিসেবে দেখা যায়।
শুরুতেই হারিয়ে যায় ছবির ‘ঘামাসান’
ছবির সবচেয়ে বড় সমস্যা, মহারাজা প্যাটেল চরিত্রটির পরিচয়। গত ২৫ বছর ধরে সে জঙ্গল ছেড়ে বেরোয়নি। তাকে ধরার জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হয়েছে, অথচ পুলিশ জানেই না সে দেখতে কেমন। তাদের কাছে শুধু একটি তথ্য, মহারাজা ‘ভারী’। এই রহস্যকে কেন্দ্র করে একটা শক্তিশালী ক্যাট-অ্যান্ড-মাউস থ্রিলার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মহারাজার প্রবেশের পরেই সেই উত্তেজনার বড় অংশ যেন হারিয়ে যায়।
মহারাজা শুধু ডাকাত নয়, বুন্দেলখণ্ডের রাজনীতিতেও তার গভীর প্রভাব রয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে মুখ্যমন্ত্রী, শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই নেক্সাসের মাধ্যমেই গোটা ব্যবস্থা চলেছে। কেউ মহারাজার বিরুদ্ধে গেলে কিংবা তার বিশ্বাস ভাঙলে পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর।
Advertisements
মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা কিংবা শিরশ্ছেদ করার মতো নির্মমতার কথাও ছবিতে আসে। কিন্তু এই ভয়াবহ ঘটনাগুলিও দর্শকের মনে সেই অস্বস্তি বা শিহরণ তৈরি করতে পারে না, যা এমন গল্পে প্রয়োজন।
আসল অ্যাকশন আসে শেষ ১৫ মিনিটে
প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের ছবি ‘ঘামাসান’ শুরু থেকেই ধীর গতিতে এগোয়। দীর্ঘ সময় ধরে গল্প চরিত্র, রাজনীতি এবং ক্ষমতার সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু যে আসল ‘ঘামাসান’-এর অপেক্ষা দর্শক করেন, সেটি আসে একেবারে শেষ ১৫ মিনিটে, যখন এসটিএফ মহারাজাকে ধরার জন্য চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করে। এই জায়গাতেই ছবির গতি কিছুটা বাড়ে। তবে ততক্ষণে গল্পের প্রতি দর্শকের আগ্রহ অনেকটাই কমে যায়। অবশ্য সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ছবিগুলোর মতো শুধুমাত্র রক্তপাত ও হিংসার উপর নির্ভর করেননি ধুলিয়া। তাঁর নিজস্ব সংবেদনশীলতা এবং গল্প বলার ধরন ছবিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে।
জাতপাতের রাজনীতি থেকে ক্ষমতার খেলা
ছবির জাতপাতের রাজনীতি, একটি আদিবাসী গ্রামের শিশুদের মহারাজার মৃতদেহ বহন করা কিংবা দুই সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকের মধ্যে গোটা অভিযানের বয়ান কীভাবে তৈরি করা হবে, সেই আলোচনা, সবই ধুলিয়ার স্বাক্ষর বহন করে।
কম দৃশ্যে বেশি কথা বলার এই পদ্ধতি পরিচালকের শক্তি। ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা চিত্রনাট্যে। ধুলিয়া, মানিক বাত্রা এবং আয়ুষ রাঙ্কার লেখা গল্পে সেই ধারালো গতি এবং সংক্ষিপ্ততা নেই, যা ‘ঘামাসান’-কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারত।
বিশেষ করে মহারাজার অতীত সম্পর্কে আরও গভীরে যাওয়া হয়নি। তার চরিত্র কীভাবে তৈরি হল, কীভাবে সে বুন্দেলখণ্ডের রাজনীতি এবং অপরাধ জগতের এত বড় শক্তি হয়ে উঠল, সেই গল্প আরও বিস্তৃত হলে এসটিএফ বনাম মহারাজার লড়াই অনেক বেশি আকর্ষণীয় হতে পারত।
প্রতীক গান্ধীর অভিনয় শক্তিশালী
অর্জুন ওয়ারসির উপর ছবির অন্যতম বড় দায়িত্ব ছিল। কিন্তু মহারাজা প্যাটেল হিসেবে তাঁকে চরিত্রটির সঙ্গে খুব একটা মানানসই মনে হয় না। বাস্তবের ভয়ঙ্কর ডাকাতের যে উপস্থিতি এবং ব্যক্তিত্ব দর্শকের মনে তৈরি হওয়ার কথা, তাঁর অভিনয়ে সেটি পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি।
অন্যদিকে প্রতীক গান্ধী নিজের চরিত্রের প্রতি সম্পূর্ণ সুবিচার করেছেন। এসটিএফ অফিসার হিসেবে তাঁকে বিশ্বাসযোগ্য লাগে। তাঁর অভিনয়ে চরিত্রটির দৃঢ়তা এবং পেশাদারিত্ব দুটোই ধরা পড়েছে। রাজপাল যাদব এবং ইশিতা দত্তও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বুন্দেলখণ্ডের রুক্ষ প্রান্তর ছবির শক্তি
চিত্রগ্রাহক দেব আগরওয়ালের ক্যামেরায় ধরা পড়া বুন্দেলখণ্ডের শুষ্ক ও রুক্ষ ভূদৃশ্য ছবির আবহকে আরও গম্ভীর করে তুলেছে। ধূসর, অনুর্বর প্রান্তর এবং তার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অপরাধ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার গল্প, ‘ঘামাসান’-এর পরিবেশকে বিশ্বাসযোগ্য করে। তবে ধুলিয়া জানিয়েছিলেন, প্রতীক গান্ধী এবং অর্জুন ওয়ারসি ছবিতে একসঙ্গে কোনও দৃশ্য শুট করেননি, কারণ তাঁদের চরিত্রের কোনও সরাসরি দৃশ্যই নেই। এখানেই ছবির একটি বড় সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে। যে মুখোমুখি সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে পুরো গল্প এগোতে পারত, সেটি মূলত কথোপকথন এবং পরোক্ষ উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
‘ঘামাসান’ কেন মনে থাকে না?
টাইগমাংশু ধুলিয়ার ২০১২ সালের ‘পান সিং তোমর’-এ ইরফান খানের মুখে একটি সংলাপ আজও দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে। সেই ছবিতেই তিনি বলেছিলেন, বিহারে বিদ্রোহী তৈরি হয়, ডাকাত বসে থাকে সংসদে। ‘ঘামাসান’-এর মহারাজা প্যাটেল কিন্তু বেশিরভাগ সময় কথা বলেন। অথচ তাঁর মুখে এমন একটি সংলাপও নেই, যা চরিত্রটিকে ছবির বাইরে দর্শকের মনে বাঁচিয়ে রাখবে।
সমস্যাটা এখানেই। ছবিতে রাজনীতি আছে, অপরাধ আছে, রক্ত আছে, ক্ষমতার লড়াই আছে, কিন্তু সেই প্রাণশক্তিটাই নেই যা এই উপাদানগুলিকে একসঙ্গে জুড়ে একটি স্মরণীয় ডাকাতের গল্প তৈরি করতে পারে।
‘ঘামাসান’ তাই খারাপভাবে তৈরি ছবি নয়। বরং এতে একজন দক্ষ পরিচালকের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু গল্পের সম্ভাবনা, চরিত্রের গভীরতা এবং চিত্রনাট্যের ধার যদি আরও একটু বাড়ানো যেত, তাহলে ছবিটি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত।
রায়: ভালো বিষয় এবং কিছু শক্তিশালী অভিনয় থাকা সত্ত্বেও ‘ঘামাসান’ শেষ পর্যন্ত তার নিজের নামের মতো তীব্র সংঘর্ষ তৈরি করতে পারে না।