নদী আর পর্বতকে ইচ্ছেমতো পাল্টানো যায়?
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের চিরহিমায়িত ভূমি দু’টি প্রধান স্তরে বিভক্ত, যা তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। প্রথমটি হলো সক্রিয় স্তর অর্থাৎ মাটি আর শিলার উপরিভাগের স্তর। এটা গ্রীষ্মকালে স্বাভাবিক ভাবে গলে যায়, আবার শীতকালে জমে যায়। আর দ্বিতীয়টি হলো, পার্মাফ্রস্ট কোর অর্থাৎ পর্বতের গভীরতম, স্থায়ী ভাবে হিমায়িত অভ্যন্তর। উচ্চ হিমালয়ের এই বরফ পর্বতের কঠিন শিলাস্তরের ভিতরের গভীর ফাটল, চিড় আর খাঁজগুলো সিমেন্টের মতো জমিয়ে আটকে রাখে।
প্রশ্ন হলো, পার্মাফ্রস্ট কী ভাবে গলে গিয়ে হিমালয়ের ভূমিধসের কারণ হয়। ভূ-পদার্থবিজ্ঞানীরা এ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক চারটি স্তরের ভূ-যান্ত্রিক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া লক্ষ করেছেন। হিমায়িত অবস্থায় ফাটলের শিলা ভেতরের বরফের জন্যে জুড়ে থাকে। এর ফলে শিলাস্তরের বিশাল খণ্ডগুলোও একসঙ্গে আটকে থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে এই বরফই গলে তরল জলে পরিণত হয়ে যায়। তার ফলে কাঠামোগত বরফের সিমেন্ট উধাও হয়ে গেলে পর্বতের অভ্যন্তরের গভীরে ফাটলগুলো সম্পূর্ণ ভাবে অবলম্বনহীন হয়ে পড়ে। অন্য দিকে বরফ গলে যাওয়ার ফলে বরফগলা জল শিলার ফাটলের আঁটোসাঁটো জালির মধ্যে আটকে পড়ে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আরও গলিত জলকে এই ফাটলগুলির মধ্যে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয়, যা প্রচণ্ড হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ সৃষ্টি করে। এই চাপ একটা হাইড্রোলিক জ্যাক-এর মতো কাজ করে, যা শিলাস্তরের বিশাল খণ্ডগুলিকে পর্বতের মুখ থেকে বাইরের দিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। এ রকম অবস্থায় বরফের পরিবর্তে জল থাকার ফলে অ-স্থিতিশীল স্তরগুলোর মধ্যে ঘর্ষণ অনেক কমে যায়। অমসৃণ শিলার সঙ্গে অমসৃণ শিলার ঘর্ষণের পরিবর্তে তরল জল একটা মসৃণ আর পিচ্ছিল সীমারেখা তৈরি করে। তখনই পাহাড়ের প্রচণ্ড ওজনের শিলাপিণ্ডটি তার আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা হারিয়ে উপর থেকে পিছলে পড়ে যায়। ঘর্ষণ কমে গেলে আর চাপটা সহ্যের সীমার বাইরে পৌঁছে গেলে, ভূমির ঢাল একটা সঙ্কটের মধ্যে পড়ে। নেপালের বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও এই ধসটি হিমবাহের নীচের মূল শিলাস্তরের গভীরে ঘটেছিল। যখন অ-স্থিতিশীল ভিত্তিটি ভেঙে পড়ে, তখন এটি বিস্ফোরক আকারে লক্ষ লক্ষ টন কঠিন শিলা, উপরি ভাগের মাটি আর উপরের হিমবাহের বরফকে নিয়ে ধসে পড়ে।