মিসাইলের ঘাটতিতে F-16-এর কামানে ভরসা ইউক্রেনের, ফিরছে পুরনো কৌশল?
মস্কো: রাশিয়ার বিরুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষায় (Ukraine War) বড় সমস্যার মুখে ইউক্রেন। দেশটির হাতে থাকা এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের জন্য এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলের ঘাটতি এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে…
মস্কো: রাশিয়ার বিরুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষায় (Ukraine War) বড় সমস্যার মুখে ইউক্রেন। দেশটির হাতে থাকা এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের জন্য এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলের ঘাটতি এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে দিনের বেলায় কয়েকটি অভিযানে পাইলটদের বিমানের অভ্যন্তরীণ ২০ মিলিমিটার কামানের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। মূলত রুশ ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইল প্রতিহত করার অভিযানে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।
দ্য ওয়ার জোনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে ইউক্রেনীয় সেনাকর্মীরা নতুন মিসাইলের চালান কখন দেশে পৌঁছবে, তার উপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছেন। সম্ভাব্য রুশ আকাশ হামলার আগে মিসাইল পৌঁছনোর সময় পর্যন্ত ঘণ্টা ও মিনিট গুনে অপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এফ-১৬-তে মিসাইলের ঘাটতি কতটা গুরুতর?
দ্য ওয়ার জোনের প্রতিবেদনে নিউজম্যাক্সের সাংবাদিক শেলবি ওয়াইল্ডারের একটি সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ইউক্রেনের ১০৭তম এয়ার উইংয়ের কমান্ডার, যিনি ‘ফ্যান্টম’ কলসাইন ব্যবহার করেন, মিসাইলের ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের এফ-১৬ বিমানগুলি বর্তমানে মূলত রুশ ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইল থেকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষা করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বিমানগুলি শুধু প্রচলিত অর্থে শত্রু যুদ্ধবিমানের সঙ্গে আকাশযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, ইউক্রেনের বৃহত্তর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি মোবাইল স্তর হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
Read More: ইরানের গোপন পরমাণু কেন্দ্রে নির্মাণকাজ, পাহাড়ে ঘেরা ‘পিকঅ্যাক্স’ সাইটে হামলার হুঙ্কার ট্রাম্পের
Advertisements
কামানেই রুশ ড্রোন ঠেকানোর চেষ্টা
এফ-১৬ বিমানের অন্যতম অস্ত্র হল তার অভ্যন্তরীণ ২০ মিলিমিটার কামান। সাধারণত আধুনিক যুদ্ধবিমানের প্রধান আকাশযুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে দূরপাল্লার বা স্বল্পপাল্লার এয়ার-টু-এয়ার মিসাইলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু মিসাইলের সরবরাহ কমে গেলে পাইলটদের কাছে কামান একটি শেষ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। ইউক্রেনীয় কমান্ডারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্র ছাড়া একটি যুদ্ধবিমান কার্যত অকেজো। তাই তিনি আরও এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার, এআইএম-১২০ অ্যামর্যাম এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের আবেদন জানিয়েছেন।
শুধু এফ-১৬ নয়, প্যাট্রিয়ট মিসাইল নিয়েও চাপ
ইউক্রেনের সমস্যা শুধু এফ-১৬-র মিসাইলেই সীমাবদ্ধ নয়। রুশ ড্রোন ও মিসাইল হামলা মোকাবিলায় দেশটির বৃহত্তর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও অস্ত্রের প্রয়োজন বাড়ছে। কিয়েভ পশ্চিমা অংশীদারদের কাছ থেকে আরও প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর পাওয়ার চেষ্টা করছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভহেনি খমারা এই সপ্তাহে জানিয়েছেন, প্রায় ১,০০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে এর বেশিরভাগ সরবরাহ আগামী কয়েক বছরে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর চাপ থেকেই যাচ্ছে।
Read More: দক্ষিণ চিন সাগরে ‘ব্রহ্মোস বলয়’: চিনের বেড়াজালে কৌশলগত ফাঁদ পাতছে ভারত?
কেন এফ-১৬ এত গুরুত্বপূর্ণ?
রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলির কাছ থেকে আধুনিক যুদ্ধবিমান পাওয়ার চেষ্টা শুরু করে। লক্ষ্য ছিল নিজেদের বিমানবাহিনীকে শক্তিশালী করা এবং রুশ বিমানবাহিনীর মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাড়ানো। এই প্রচেষ্টায় নেদারল্যান্ডস এবং ডেনমার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ইউক্রেনীয় পাইলটদের প্রশিক্ষণ এবং এফ-১৬ সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা হয়। আমেরিকাও এই উদ্যোগে সমর্থন দেয়। প্রথম এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ২০২৪ সালে ইউক্রেনে পৌঁছয়।
ইউক্রেনকে মোট ৭৯টি এফ-১৬ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
ইউক্রেনকে ইউরোপের চারটি দেশ মোট ৭৯টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে:
- ডেনমার্ক: ১৯টি
- নেদারল্যান্ডস: ২৪টি
- নরওয়ে: ৬টি
- বেলজিয়াম: ৩০টি
এই বিমানগুলির অন্যতম প্রধান ভূমিকা হল রুশ আকাশ হামলা মোকাবিলা এবং ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা।
পাঁচটি এফ-১৬ ইতিমধ্যেই হারিয়েছে ইউক্রেন
ইউক্রেনের হাতে এফ-১৬ আসার পর থেকেই এই বিমানগুলি বিভিন্ন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় পাঁচটি এফ-১৬ হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার পরেও ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এই যুদ্ধবিমানগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এফ-১৬-এর বিশেষ সুবিধা হল, এগুলি মোবাইল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিভিন্ন এলাকা থেকে দ্রুত মোতায়েন করা যায় এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে আকাশপথে আসা হুমকি মোকাবিলা করার চেষ্টা করা সম্ভব।
Read More: আমেরিকার হামলায় ধ্বংস ৫ ইরানি ট্যাঙ্কার, জর্ডনের ঘাঁটিতে পালটা মিসাইল হানা
রাশিয়ার ড্রোন হামলা বাড়ায় চাপ
রাশিয়ার ড্রোন এবং ক্রুজ মিসাইল হামলা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার উপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে। গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষা করতে ইউক্রেনকে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। স্থলভিত্তিক প্যাট্রিয়টের মতো ব্যবস্থা এবং আকাশে এফ-১৬, এই দুই স্তরের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রতিটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর বা মিসাইলের প্রয়োজন। সরবরাহ কমে গেলে একই সংখ্যক হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা কেন মনে পড়ছে?
আধুনিক যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে দূরপাল্লার মিসাইলই সাধারণত প্রধান অস্ত্র। কিন্তু মিসাইলের ঘাটতির কারণে এফ-১৬-র ২০ মিলিমিটার কামানের উপর নির্ভর করার খবর যুদ্ধবিমানের ইতিহাসের পুরনো যুগের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। যদিও এটিকে সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশলে ফিরে যাওয়া বলা ঠিক হবে না, কারণ এফ-১৬ একটি অত্যন্ত আধুনিক যুদ্ধবিমান এবং তার সামগ্রিক অস্ত্র ও সেন্সর ব্যবস্থা অনেক বেশি উন্নত। তবে মিসাইলের ঘাটতির কারণে কামানকে ফের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য পরিস্থিতি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন মিসাইল সরবরাহ। এফ-১৬ বিমানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার, এআইএম-১২০ অ্যামর্যাম এবং অন্যান্য আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর না থাকলে ইউক্রেনের এই বিমানগুলির কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে। ফলে রাশিয়ার আকাশ হামলা মোকাবিলায় আগামী দিনে ইউক্রেনের জন্য শুধু নতুন যুদ্ধবিমান নয়, পর্যাপ্ত অস্ত্র সরবরাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।