সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ! আখে ভর্তুকি নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া - 24 Ghanta Bangla News
Home

সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ! আখে ভর্তুকি নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া

Spread the love

কলকাতা: ভারতের আখ ও চিনি নীতিকে (Sugarcane Subsidy) ঘিরে ফের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিতর্ক তৈরি হল। ভারতের দেওয়া আখ-সংক্রান্ত সহায়তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও-র নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে অস্ট্রেলিয়া। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫, টানা সাতটি চিনি মরশুমে ভারত ডব্লিউটিও-র নিয়মে অনুমোদিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি সহায়তা দিয়েছে বলে দাবি করেছে অস্ট্রেলিয়া।

ডব্লিউটিও-র কৃষি চুক্তি বা এগ্রিমেন্ট অন এগ্রিকালচারের নিয়ম অনুযায়ী, ভারত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু কৃষি সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পায়। ভারতের কোনও টোটাল অ্যাগ্রিগেট মেজারমেন্ট অব সাপোর্ট বা মোট কৃষি সহায়তার প্রতিশ্রুত সীমা নেই। তবে নন-এক্সেম্পট বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত নয় এমন পণ্যভিত্তিক সহায়তা সংশ্লিষ্ট কৃষিপণ্যের মোট উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশের মধ্যে রাখার নিয়ম রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া মনে করছে, আখের ক্ষেত্রে ভারত এই সীমা ধারাবাহিকভাবে অতিক্রম করেছে।

Read More: ভারত-ইসরায়েল অংশীদারিত্বে সবজি চাষে নতুন স্বপ্ন দেখছে ভারতের কৃষকরা

ডব্লিউটিও-তে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাখ্যা চাওয়া

বুধবার সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডব্লিউটিও-তে জমা দেওয়া একটি নথিতে অস্ট্রেলিয়া ভারতের কাছে আখ ও চিনি সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ নীতি সম্পর্কে আরও ব্যাখ্যা চেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বক্তব্য, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চিনি উৎপাদক এবং তৃতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক। ফলে ভারতের চিনি বাজারে কোনও বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের উপর পড়তে পারে।

Advertisements


   


   

অস্ট্রেলিয়ার দাবি, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত সাত বছরে ভারতের আখের জন্য দেওয়া এএমএস বা অ্যাগ্রিগেট মেজারমেন্ট অব সাপোর্ট ডব্লিউটিও কৃষি চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের ৪ নম্বর ধারায় নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

কীভাবে ভারতের সহায়তার হিসাব করল অস্ট্রেলিয়া?

ভারতে প্রতি চিনি মরশুমে আখের জন্য ফেয়ার অ্যান্ড রেমুনারেটিভ প্রাইস বা এফআরপি নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় সরকার। অস্ট্রেলিয়ার জমা দেওয়া নথিতে এফআরপিকে একটি প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত দাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই দাম কার্যত চিনিকলগুলির কৃষকদের কাছ থেকে আখ কেনার ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতম দাম বা ফ্লোর প্রাইস হিসেবে কাজ করে।

এছাড়াও বেশি উৎপাদন দক্ষতার জন্য কৃষকদের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থের বিষয়টিও অস্ট্রেলিয়া বিবেচনায় নিয়েছে। কিছু রাজ্যে কৃষকরা চিনিকলের কাছ থেকে স্টেট অ্যাডভাইজড প্রাইস বা এসএপি-র আওতায় অতিরিক্ত অর্থও পান। অস্ট্রেলিয়া এই এফআরপি, এসএপি এবং অন্যান্য অর্থপ্রদানের বিষয়গুলিকে একত্র করে ভারতের বাজার মূল্য সহায়তা এবং এএমএস হিসাব করেছে।

Read More: ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ, বড় ঝুঁকিতে ভারতের বাসমতি রফতানি

সাত বছরে কত টাকার সহায়তার দাবি?

অস্ট্রেলিয়ার জমা দেওয়া নথিতে উল্লেখ করা হিসাব অনুযায়ী, ভারতের আখের বাজার মূল্য সহায়তা ২০১৮-১৯ সালে ১.১২৫ ট্রিলিয়ন টাকা বা ১৫.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে ১.৫২ ট্রিলিয়ন টাকা বা ১৭.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২২-২৩ সালে এই সহায়তার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১.৫৫ ট্রিলিয়ন টাকা বা ১৮.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল বলে অস্ট্রেলিয়ার হিসাব। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই অস্ট্রেলিয়া দাবি করছে, সাত বছর ধরে ভারতের আখের ক্ষেত্রে বাজার মূল্য সহায়তা ডব্লিউটিও-র অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করেছে।

এর আগেও ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল

আখ এবং চিনি নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার এই অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল এবং গুয়াতেমালা আলাদাভাবে ডব্লিউটিও-তে ভারতের চিনি ও আখ সংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিল। ওই তিনটি বিরোধের জন্য ২০১৯ সালের আগস্টে ডব্লিউটিও প্যানেল গঠন করা হয়।

২০২১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ডব্লিউটিও প্যানেল তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছিল, ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯ পর্যন্ত টানা পাঁচটি চিনি মরশুমে ভারত আখ উৎপাদকদের এমন নন-এক্সেম্পট পণ্যভিত্তিক অভ্যন্তরীণ সহায়তা দিয়েছে, যা উৎপাদনের মোট মূল্যের ১০ শতাংশের ডব্লিউটিও সীমা অতিক্রম করেছে।

ভারত সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল

২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভারত ডব্লিউটিও প্যানেলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল করা হয়েছিল ডব্লিউটিও-র অ্যাপিলেট বডিতে। কিন্তু বর্তমানে এই সংস্থা কার্যত কাজ করতে পারছে না। ফলে প্যানেলের রিপোর্ট এখনও ডব্লিউটিও-র ডিসপিউট সেটলমেন্ট বডি বা বিরোধ নিষ্পত্তি সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেনি। এর ফলে আগের বিরোধের আইনি অবস্থান এখনও জটিল হয়ে রয়েছে।

Read More: কৃষিখাতে বিশাল ভর্তুকি মোদী সরকারের! ৩০০০ র ইউরিয়ার বস্তা এখন মোটে ৩০০ টাকা

২০২৪ সালেও ফের প্রশ্ন তুলেছিল আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া

২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের আখের ভর্তুকি নিয়ে ফের প্রশ্ন ওঠে। সে সময় আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে ভারতের চিনি ও আখ সংক্রান্ত ভর্তুকি নিয়ে একটি কাউন্টার-নোটিফিকেশন জমা দেয়। দুই দেশ হিসাব করে জানিয়েছিল, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত ভারতের আখের বাজার মূল্য সহায়তা উৎপাদনের মোট মূল্যের ৯২ শতাংশ থেকে ১০১ শতাংশের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ডব্লিউটিও-র অনুমোদিত ১০ শতাংশ সীমার তুলনায় ভারতের সহায়তা বহুগুণ বেশি ছিল।

ভারতের পাল্টা যুক্তি কী?

অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার হিসাব অবশ্য ভারত মেনে নেয়নি। ভারতের যুক্তি ছিল, এফআরপি এবং স্টেট অ্যাডভাইজড প্রাইস বা এসএপিকে বাজার মূল্য সহায়তা হিসেবে গণ্য করা যায় না। কারণ আখ সরাসরি কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার কৃষকদের কাছ থেকে কেনে না। ভারতের বক্তব্য, আখ কেনে চিনিকলগুলি। তাই সরকার নির্ধারিত দামকে সরকারি বাজার মূল্য সহায়তা হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।

ডব্লিউটিও প্যানেল অবশ্য এই যুক্তি মানেনি

২০২১ সালের রিপোর্টে ডব্লিউটিও প্যানেল ভারতের এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। প্যানেলের বক্তব্য ছিল, কোনও কৃষিপণ্যের বাজার মূল্য সহায়তা হিসাব করার জন্য সরকারকে সরাসরি সেই পণ্য কিনতেই হবে, এমন কোনও শর্ত নেই। অর্থাৎ সরকার সরাসরি আখ না কিনলেও, সরকার নির্ধারিত দাম কীভাবে বাজারে কার্যকর হচ্ছে এবং কৃষকদের কী ধরনের মূল্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা ডব্লিউটিও-র নিয়মের অধীনে বিবেচনা করা যেতে পারে।

কেন বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চিনি উৎপাদক এবং রফতানিকারক। তাই আখের দাম, কৃষকদের জন্য নির্ধারিত মূল্য এবং চিনিকলগুলির উপর সরকারের নীতির সরাসরি প্রভাব রয়েছে। একদিকে কৃষকদের আখের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, অন্যদিকে চিনিকল শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ম মেনে চলা, এই তিনটি বিষয়ই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অস্ট্রেলিয়ার নতুন অভিযোগ সেই পুরনো বিতর্ককেই ফের সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত টানা সাত বছরের হিসাব তুলে ধরায় বিষয়টি এবার আরও বিস্তৃত সময়ের নীতিকে ঘিরে উঠেছে।

সামনে কী হতে পারে?

অস্ট্রেলিয়া ভারতের কাছ থেকে আখ ও চিনি সংক্রান্ত নীতির আরও ব্যাখ্যা চেয়েছে। ফলে এই বিষয়ে ভারত কীভাবে তাদের এফআরপি, এসএপি এবং অন্যান্য সহায়তার হিসাব ব্যাখ্যা করে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগের মামলায় ভারতের যুক্তি এবং ডব্লিউটিও প্যানেলের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে বিষয়টি সহজে মিটবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। ভারতের চিনি নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংক্রান্ত এই বিতর্ক আগামী দিনেও ডব্লিউটিও-র আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *