সীমান্তে ড্রোন ঠেকাতে AI-র ‘শিল্ড’ ডিআরডিও’র, রাডার-লেজারে নজরদারি আরও শক্তিশালী
কলকাতা: ভারতের বিস্তীর্ণ ও দুর্গম সীমান্ত সুরক্ষায় আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা তৈরি করছে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও। লক্ষ্য, এমন একটি নতুন প্রজন্মের সীমান্ত নজরদারি এবং কাউন্টার-ড্রোন (Counter Drone) ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত রাডার, ক্যামেরা, সেন্সর এবং লেজার প্রযুক্তির সমন্বয়ে হুমকি শনাক্ত থেকে শুরু করে তা নিষ্ক্রিয় করার কাজ আরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যাবে।
ডিআরডিও-র ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেমস বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল বি কে দাস জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত এবং ট্র্যাক করা থেকে শুরু করে হুমকির তথ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে পাঠানো এবং প্রয়োজনে শত্রু ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা পর্যন্ত পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।
শুধু পরিকাঠামো নয়, প্রযুক্তিই হবে সীমান্ত সুরক্ষার শক্তি
ভারতের সীমান্ত অত্যন্ত দীর্ঘ এবং বিভিন্ন ভৌগোলিক পরিস্থিতিতে বিস্তৃত। কোথাও পাহাড়ি এলাকা, কোথাও মরুভূমি, আবার কোথাও ঘন জঙ্গল ও দুর্গম অঞ্চল। ফলে শুধু সীমান্তে পরিকাঠামো তৈরি করে সব ধরনের হুমকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বি কে দাসের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বিশাল সীমান্ত রক্ষা করতে পরিকাঠামোর পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন। সেই কারণেই ডিআরডিও নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার দিকে জোর দিচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় সেন্সর থেকে শুরু করে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং হুমকি নিষ্ক্রিয় করার প্রযুক্তি, গোটা নিরাপত্তা শৃঙ্খলকে একসঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
Read More: ১৯০টি পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলল ভারত, শীঘ্রই টপকাবে ব্রিটেনকেও
Advertisements
অনুপ্রবেশ শনাক্ত করবে একাধিক প্রযুক্তি
ডিআরডিও যে প্রযুক্তিগুলি নিয়ে কাজ করছে, তার মধ্যে রয়েছে ফাইবার-অপটিক-ভিত্তিক অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, উচ্চ রেজোলিউশনের ক্যামেরা এবং ইনফ্রারেড ট্র্যাকিং প্রযুক্তি।
এর পাশাপাশি হাইপারস্পেকট্রাল এবং মাল্টিস্পেকট্রাল সিস্টেম নিয়েও কাজ চলছে। এই ধরনের সেন্সর বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে পারে।
রাডার প্রযুক্তিও এই নতুন সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত রাডার সিস্টেমের পাশাপাশি রাডার ইমেজিং এবং সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার বা এসএআর প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।
নজরদারি থেকে হুমকি মোকাবিলা, পুরো চেইনে প্রযুক্তি
ডিআরডিও-র পরিকল্পনা শুধু কোনও অনুপ্রবেশকারী বা ড্রোন শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পুরো নিরাপত্তা চেইনকে প্রযুক্তিনির্ভর করার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে সেন্সর ও রাডারের মাধ্যমে কোনও সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা হবে। এরপর সেই হুমকির অবস্থান এবং গতিবিধি ট্র্যাক করা হবে। সংগৃহীত তথ্য যোগাযোগ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে পাঠানো হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এরপর হুমকিকে নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এই ধরনের সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি হলে সীমান্তে নজরদারি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
Read More: গালওয়ান সংঘর্ষের পর প্রথম! ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে হতে পারে মোদী- জিনপিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ ব্যবস্থাও তৈরি করছে ডিআরডিও
নজরদারি ব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, সেই তথ্য দ্রুত নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে পৌঁছতে না পারলে তার কার্যকারিতা কমে যায়। তাই ডিআরডিও নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছে। লক্ষ্য হল, সীমান্তে থাকা সেন্সর, রাডার এবং অন্যান্য নজরদারি ব্যবস্থা থেকে পাওয়া তথ্য দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্যভাবে নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের বিভিন্ন অংশে পাঠানো। এর ফলে কোনও হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর সেই তথ্য দ্রুত সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
ড্রোন মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই প্রথম প্রজন্মের ব্যবস্থা
বর্তমান সময়ে সীমান্ত নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ছোট আকারের ড্রোন। নজরদারি, অস্ত্র পরিবহন বা অন্যান্য কাজে এই ধরনের ড্রোন ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তির গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। ডিআরডিও ইতিমধ্যেই কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থার প্রথম প্রজন্ম তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তি শিল্প সংস্থার হাতে উৎপাদনের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বি কে দাস।
রাডার ও অপটিক্যাল প্রযুক্তিতে ড্রোন শনাক্ত
এই কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা রাডার এবং ইলেকট্রো-অপটিক্যাল প্রযুক্তির সাহায্যে ড্রোন শনাক্ত করে। প্রথমে আকাশে কোনও ড্রোনের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এরপর সেটি কী ধরনের বস্তু এবং সম্ভাব্য হুমকি কি না, তা বিশ্লেষণ করা হয়। হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সফট-কিল এবং হার্ড-কিল, দুই পদ্ধতিই রয়েছে
ড্রোন মোকাবিলায় ডিআরডিওর ব্যবস্থায় সফট-কিল এবং হার্ড-কিল, দুই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার রয়েছে। সফট-কিল পদ্ধতিতে ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ড্রোনের যোগাযোগ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করা হয়। এতে ড্রোনকে শারীরিকভাবে ধ্বংস না করেও তার কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণে বাধা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। অন্যদিকে হার্ড-কিল পদ্ধতিতে ড্রোনকে সরাসরি শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
ড্রোন ধ্বংসে লেজার প্রযুক্তি
হার্ড-কিল ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হল ডিরেক্টেড-এনার্জি বা নির্দেশিত শক্তি ব্যবস্থা। এর মধ্যে লেজার প্রযুক্তি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বি কে দাস জানিয়েছেন, ভারত ইতিমধ্যেই বিভিন্ন শক্তির মাত্রায় একাধিক লেজার ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এখন ডিআরডিও কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তির আরও উন্নত প্রজন্ম নিয়ে কাজ করছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে শুধু ড্রোন শনাক্ত করাই নয়, আরও দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এআই ও মেশিন লার্নিং নেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
নতুন সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং মেশিন লার্নিং-ভিত্তিক অ্যালগরিদমও ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল বিপুল পরিমাণ সেন্সর ও রাডার তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা। উন্নত রাডার বিশ্লেষণের পাশাপাশি একাধিক ধরনের রাডার প্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে। এর ফলে একই সময়ে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে হুমকির আরও পরিষ্কার ছবি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
ভবিষ্যতের সীমান্ত সুরক্ষা হবে আরও স্বয়ংক্রিয়
ডিআরডিওর চলমান প্রকল্পগুলির সামগ্রিক লক্ষ্য শুধু একটি নতুন রাডার বা একটি কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা তৈরি করা নয়। বরং সেন্সর, রাডার, ক্যামেরা, এআই, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ডিরেক্টেড-এনার্জি প্রযুক্তিকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সমন্বিত সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা।
এই ব্যবস্থায় কোনও সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত হওয়ার পর তার পরিচয় নির্ধারণ, গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, তথ্য আদানপ্রদান এবং প্রয়োজন হলে নিষ্ক্রিয় করার মতো একাধিক ধাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সম্পন্ন করা যাবে।
ভারতের দীর্ঘ ও জটিল সীমান্তের কথা মাথায় রেখে এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। বিশেষ করে ড্রোনের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এআই, উন্নত রাডার এবং লেজার প্রযুক্তির সমন্বয় ভারতের সীমান্ত সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।