শুষ্ক জমিই ভারতের বড় শক্তি, বিজ্ঞান-নীতি-বাজারে কৃষির নতুন সম্ভাবনার বার্তা
কলকাতা: জলের তীব্র সংকট এবং কৃষিকাজের নানা সমস্যার কারণে দেশের শুষ্ক অঞ্চল বা ড্রাইল্যান্ডকে (Dryland Agriculture) দীর্ঘদিন ধরে কৃষির দুর্বল এলাকা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সঠিক বিজ্ঞান, কার্যকর নীতি এবং উপযুক্ত বাজারের সমন্বয় ঘটানো গেলে এই শুষ্ক জমিই ভারত ও আফ্রিকার অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে বলে মন্তব্য করলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক ড্রাইল্যান্ড কংগ্রেসে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন তিনি। শুষ্ক অঞ্চলে কৃষির সম্ভাবনা এবং জলসংকট মোকাবিলার উপায় নিয়ে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
শুষ্ক জমি দুর্বলতা নয়, শক্তি
শিবরাজ সিং চৌহান বলেন, শুষ্ক অঞ্চলকে ভারতের দুর্বলতা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। সঠিক বিজ্ঞান, সঠিক নীতি এবং কৃষিপণ্যের জন্য সঠিক বাজার তৈরি করা গেলে এই অঞ্চল দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করার ক্ষেত্রে গবেষণা এবং প্রযুক্তির ভূমিকার উপর জোর দেন তিনি। শুষ্ক অঞ্চল বলতে সাধারণত এমন এলাকা বোঝানো হয় যেখানে জলের তীব্র অভাব রয়েছে এবং কৃষিকাজ করা অত্যন্ত কঠিন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ধরনের অঞ্চলের কৃষকদের সমস্যা আরও বাড়ছে।
ফসল বৈচিত্র্য ছিল ভারতের ঐতিহ্য
কৃষিতে ফসল বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী। তাঁর মতে, একসময় ভারতের কৃষি ব্যবস্থায় একই জমিতে বা একই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনের ঐতিহ্য ছিল। শিবরাজ বলেন, তাঁর পূর্বপুরুষরা এক ধরনের ফসলের উপর নির্ভর না করে জমির বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ফসল বপনের কথা বলতেন। অর্থাৎ, কৃষিতে বৈচিত্র্য ভারতের শিকড়ের সঙ্গেই জড়িত। তিনি জানান, আগে জোয়ার এবং বাজরার আটা দিয়ে রুটি তৈরি করা ছিল সাধারণ বিষয়। অতিথি এলে গমের রুটি তৈরি করা হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শুষ্ক অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা পিছিয়ে যাওয়ার ফলে মিলেট বা বাজরা-সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শস্যের ব্যবহারও কমে যায়।
Advertisements
ধান-গমের তুলনায় মিলেট ও ডাল পিছিয়ে পড়েছে
কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যে কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ধান এবং গমের উপর তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এর ফলে মিলেট, ডাল এবং বিভিন্ন ধরনের শস্য পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। অথচ কম জলেও এই ফসলগুলির অনেকগুলি উৎপাদন করা সম্ভব। শুষ্ক অঞ্চলের কৃষিতে তাই মিলেট, ডাল এবং অন্যান্য কম জলনির্ভর ফসলকে ফের গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
জলসংকটই কৃষির বড় চ্যালেঞ্জ
জলের অভাবকে বর্তমানে কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হিসেবে তুলে ধরেছেন শিবরাজ সিং চৌহান। তাঁর মতে, কৃষক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যে জলের জন্য প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতি। এল নিনোর মতো জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের সময় এবং পরিমাণে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত জল পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে কম জল ব্যবহার করে কীভাবে ভালো ফলন পাওয়া যায়, সেটাই কৃষি গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা কাজে লাগানোর বার্তা
জলবায়ু পরিবর্তনের পরিস্থিতিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিবর্তিত জলবায়ুর সময়ে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা কাজে লাগাতে হবে। কম জল দিয়ে কীভাবে ভালো ফসল উৎপাদন করা যায়, সেই প্রযুক্তি এবং কৃষি পদ্ধতি আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক অঞ্চলে জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে কৃষকদের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের আয়ও বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
ভিবি-গ্রাম জি প্রকল্পে জল সংরক্ষণে জোর
জল সংরক্ষণের সঙ্গে ভিবি-গ্রাম জি প্রকল্পের বিষয়টিও যুক্ত করেছেন শিবরাজ সিং চৌহান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত এই প্রকল্পে ১,৫২,২৮২ কোটি টাকা খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর মতে, প্রকল্পের আওতায় কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি এমন স্থায়ী সম্পদ তৈরি করা উচিত, যা ভবিষ্যতেও কৃষকদের কাজে আসবে। এর মধ্যে পুকুর, বাঁধ এবং খালের মতো জল সংরক্ষণ ও সেচ পরিকাঠামো তৈরির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, শুধু কর্মসংস্থান তৈরি নয়, সেই কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি পরিকাঠামোও গড়ে তুলতে হবে।
জলসংকটপূর্ণ এলাকায় বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব
শিবরাজ সিং চৌহান জানিয়েছেন, জলসংকট মোকাবিলায় ভিবি-গ্রাম জি প্রকল্পের অর্থ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জলসংকটে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ব্লকগুলিতে মোট ব্যয়ের ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ করা উচিত। সেমি-ক্রিটিক্যাল বা মাঝারি জলসংকটপূর্ণ ব্লকের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ এবং সাধারণ ব্লকের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ব্যয় করা যেতে পারে। এর ফলে যে এলাকাগুলিতে জলের সমস্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে জল সংরক্ষণ এবং কৃষি পরিকাঠামো তৈরিতে বেশি অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
জল সংরক্ষণ থেকে কৃষকের আয় বাড়ানোর লক্ষ্য
কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য শুধু জল সংরক্ষণ নয়, সেই জলকে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করা। তাঁর মতে, জল সংরক্ষণ করতে হবে এবং সেই সংরক্ষিত জল ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়লে কৃষকদের আয়ও বাড়বে। শুষ্ক অঞ্চলে তাই ভবিষ্যতের কৃষি নীতিতে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, জল সংরক্ষণ, কম জলনির্ভর ও বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের জন্য কার্যকর বাজার তৈরি।
ড্রাইল্যান্ড কংগ্রেসে শিবরাজ সিং চৌহানের বক্তব্যে সেই দিকেই স্পষ্ট বার্তা মিলেছে। তাঁর মতে, সঠিক বিজ্ঞান, নীতি এবং বাজারের সমন্বয় ঘটাতে পারলে যে জমিকে আজ কৃষির দুর্বলতা মনে করা হয়, ভবিষ্যতে সেই শুষ্ক জমিই ভারতের বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন