প্রযুক্তি আরও উন্নত, তার ফল নিয়ে ভাবছে কে?
এখানেই যে প্রশ্নটা বারবার আসে, তা হলো, যন্ত্র বা প্রযুক্তি কি মানুষকে অতিক্রম করতে পারে? না কি শুধু জয় নয়, যন্ত্রের কাছে মানুষের পরাজয়ও উদ্যাপিত হয়? জন হেনরি চরিত্রটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক আছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের আমেরিকায় রেলপথ নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কিংবদন্তি, মানুষ বনাম যন্ত্রের প্রতিযোগিতার গল্প, মানুষের সেই পরাজয়ের গান আজও জনপ্রিয়। কিন্তু সেই সাদা সর্দার, যে কিনা যন্ত্র ব্যবহার করে সত্যিই রেল লাইন পাতা সম্পন্ন করেছিল, সে বেচারি খলনায়ক হয়েই থেকে গেছে। অর্থাৎ শিল্প বিপ্লবের ফলে সভ্যতার যে অগ্রগতি, সেটা সকলে মেনে নিলেও, মানুষ আজও অযান্ত্রিকতার উদ্যাপন করেই চলেছে। একটি শক্তিশালী ক্রেন আনলে সে তো অবশ্যই এক নামী কুস্তিগিরকে তুলে আছাড় মারতে পারবে, কিন্তু সে অসম প্রতিযোগিতায় মানুষ ঢুকতে চায় না। একই সঙ্গে সমাজের সচ্ছল অংশ চাইবে মানুষের কাজ যন্ত্রকে দিয়ে করাতে, কারণ সে ক্ষেত্রে একটানা কাজ করলেও প্রতিবাদের জায়গা নেই, শুধু জ্বালানির জোগান থাকলেই হলো। মানুষ বা পশু, শ্রমসাধ্য কাজের ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। তবু এই দুনিয়ায় এখনও বহু কাজ আছে, যেখানে মানুষের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যত ধনীই হন না কেন, বাড়ির ডাল-ভাত-আলুপোস্ত রান্নার মতো একেবারে সাদামাটা কাজগুলো করার মতো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। শিল্প বিপ্লবের পর আড়াইশো বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষ বাদ দিয়ে সে সব কাজ নির্বিঘ্নে হচ্ছে না। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও উত্তরবঙ্গে বন্যায় রেল লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যন্ত্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে মানুষ। অর্থাৎ যন্ত্র এখনও আধুনিক সভ্যতায় বিভিন্ন কাজ একক ভাবে সম্পন্ন করে উঠতে পারেনি, মানুষের নিয়ন্ত্রণ লেগেছে প্রতিটি মুহূর্তে। অন্য দিকে দুনিয়ার অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আজও যথেষ্ট দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে বেঁচে আছে। অর্থাৎ শিল্প বিপ্লব তাদের যন্ত্রণার সমাধানের পথ এত দিনেও বাতলাতে পারেনি। সেখানেই আজকের তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের সীমাবদ্ধতা বুঝে নেওয়া জরুরি।