প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বড় সাফল্য! ভারতে তৈরি হল ৪০০তম Apache ফিউজলাজ
ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি হল। টাটা বোয়িং অ্যারোস্পেস লিমিটেড ভারতে তাদের কারখানা থেকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক অ্যাটাক হেলিকপ্টার এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচে-র…
ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি হল। টাটা বোয়িং অ্যারোস্পেস লিমিটেড ভারতে তাদের কারখানা থেকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক অ্যাটাক হেলিকপ্টার এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচে-র ৪০০তম ফিউজলাজ (Apache Helicopter) তৈরি করে বাইরে আনল। এই সাফল্য শুধু অ্যাপাচে কর্মসূচিতে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরছে না, একইসঙ্গে দেশের দ্রুত বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষমতারও প্রমাণ দিচ্ছে।
ভারতে তৈরি হচ্ছে Apache-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ
বোয়িং এবং টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ টাটা বোয়িং অ্যারোস্পেস লিমিটেড ভারতে অ্যাপাচে হেলিকপ্টারের ফিউজলাজ তৈরি করে। পরে এই ফিউজলাজ চূড়ান্ত অ্যাসেম্বলির জন্য পাঠানো হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন গ্রাহকের জন্য তৈরি অ্যাপাচে হেলিকপ্টারে তা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে মার্কিন সেনাবাহিনীও রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের ১৯টি দেশে প্রায় ১,৩০০টি অ্যাপাচে পরিষেবায় রয়েছে। ভারতের এই ৪০০তম ফিউজলাজ উৎপাদনের মাইলফলক তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতে তৈরি ফিউজলাজের সংখ্যা অ্যাপাচে কর্মসূচির মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ বিশ্বের তৈরি হওয়া প্রতি তিনটির মধ্যে প্রায় একটি অ্যাপাচের ফিউজলাজ ভারতে তৈরি হয়েছে।
Read More: মার্চে গ্রেফতার হওয়া ম্যাথু ভ্যানডাইক সহ ৬ ইউক্রেনিওর বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশ চার্জশিট দাখিল করল NIA
Advertisements
ভারতীয় সেনার কাছেও রয়েছে Apache
ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও অ্যাপাচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারতীয় সেনা ইতিমধ্যেই ৬টি অ্যাপাচে পেয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে রয়েছে ২২টি এএইচ-৬৪ই অ্যাপাচে। অ্যাপাচে মূলত শত্রুর স্থলবাহিনী, সাঁজোয়া যান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি শক্তিশালী অ্যাটাক হেলিকপ্টার।
কয়েক বছরে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বড় উত্থান
অ্যাপাচে ফিউজলাজ তৈরির এই সাফল্যকে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনের পরিমাণ ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে ৪৬,৪২৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ১.৭৮ লাখ কোটি টাকা হয়েছে। শুধু এক বছরের ব্যবধানেই উৎপাদন বেড়েছে ১৫.৬ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবর্ষের তুলনায় উৎপাদন বর্তমানে দ্বিগুণেরও বেশি।
Read More: পশ্চিমবঙ্গের সড়ক যোজনায় ১০৪২.৬২ কোটি অনুমোদন গড়কড়ির
প্রতিরক্ষা রপ্তানিতেও রেকর্ড
শুধু দেশীয় উৎপাদন নয়, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৮৬ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে তা বেড়ে রেকর্ড ৩৮,৪২৪ কোটি টাকা হয়েছে। ভারতে তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে ১৪৫টিরও বেশি সংস্থা।
সরকারের লক্ষ্য আরও বড়। ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৫০,০০০ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান বৃদ্ধির ধারা বজায় থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব বলেই মনে করছেন সরকারি আধিকারিকরা।
বাড়ছে প্রতিরক্ষা শিল্পের পরিকাঠামো
দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তিও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। বর্তমানে ভারতে রয়েছে:
- ১৬টি ডিফেন্স পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিং বা ডিপিএসইউ
- প্রায় ৫০০টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা নির্মাতা সংস্থা
- প্রায় ১৭,০০০টি এমএসএমই, যারা সরাসরি প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত
প্রতিরক্ষা উৎপাদন এখন আর কয়েকটি নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উত্তরপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুর ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর-সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।
৭৫,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি
প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭৫,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ১০,৮০০ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। সাম্প্রতিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, ১৬টি ডিপিএসইউ-ই বর্তমানে লাভজনকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন বা আর অ্যান্ড ডি-তে ব্যয় বাড়ছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিও বিদেশের বাজারে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে।
আমদানি নির্ভরতা থেকে বৈশ্বিক সরবরাহকারী হওয়ার পথে
একসময় ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে ধীরগতির বলে মনে করা হতো এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে বিপুল পরিমাণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভর করতে হতো। অ্যাপাচে ফিউজলাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যারোস্পেস কম্পোনেন্টের দেশীয় উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানির দ্রুত বৃদ্ধি সেই ছবিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দেশীয় উৎপাদন, বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ, ডিফেন্স করিডর, এমএসএমই এবং রপ্তানি একসঙ্গে বাড়তে থাকায় ভারত ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার দিকে এগোচ্ছে।