২-স্পিড AMT কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ঢালু রাস্তায় কীভাবে কাজ করে
ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার বা ই-অটোর বাজারে শুধু ব্যাটারি ও মোটরের উপর নির্ভর করছে না নতুন প্রজন্মের মডেলগুলি। বাজাজ গো-গো ইভি-তে (Bajaj GoGo EV) রয়েছে এমন একাধিক প্রযুক্তি, যা প্রতিদিনের বাণিজ্যিক ব্যবহারে পারফরম্যান্স, নিয়ন্ত্রণ ও চালকের সুবিধা বাড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল ২-স্পিড এএমটি বা অটোমেটেড ম্যানুয়াল ট্রান্সমিশন। এর সঙ্গে রয়েছে হিল হোল্ড অ্যাসিস্ট, রোল ওভার ডিটেকশন, রিজেনারেটিভ ব্রেকিং, এলইডি লাইটিং এবং শক্ত মেটাল বডি। কিন্তু প্রশ্ন হল, একটি ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারে ২টি গিয়ারের প্রয়োজন কেন? ঢালু রাস্তায় এটি কীভাবে সাহায্য করে? আর প্রতিদিনের যাতায়াতে নিরাপত্তার দিক থেকে গো-গো কতটা সুবিধা দেয়?
বাজাজ গো-গো-র ২-স্পিড এএমটি কী?
সাধারণ সিঙ্গল-স্পিড ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারের তুলনায় বাজাজ গো-গো-তে ২টি ট্রান্সমিশন রেশিও ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে রাস্তার পরিস্থিতি অনুযায়ী মোটরের শক্তি এবং গতি আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়। এখানে গিয়ার পরিবর্তনের কাজ চালককে নিজে করতে হয় না। এএমটি সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে উপযুক্ত গিয়ার নির্বাচন করে। বাজাজ অটোর দাবি, এই ২-স্পিড অটোমেটিক ট্রান্সমিশন পারফরম্যান্স উন্নত করার পাশাপাশি রেঞ্জ এবং চালকের আয়ের সম্ভাবনাতেও সাহায্য করতে পারে।
প্রথম ও দ্বিতীয় গিয়ার কীভাবে কাজ করে?
প্রথম গিয়ার: কম গতি এবং বেশি টান প্রয়োজন হলে প্রথম গিয়ার কাজে আসে। বিশেষ করে গাড়ি স্টার্ট করার সময়, ঢাল বেয়ে ওঠার সময় অথবা যাত্রী বোঝাই অবস্থায় এটি গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় গিয়ার: স্বাভাবিক শহুরে রাস্তায় তুলনামূলক বেশি গতিতে চলার সময় দ্বিতীয় গিয়ার ব্যবহার করা হয়। এতে স্বাভাবিক ড্রাইভিংয়ে পারফরম্যান্স ও দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়। ফলে চালককে বারবার গিয়ার বদলানোর ঝামেলায় পড়তে হয় না।
Advertisements
ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারে ২টি গিয়ার কেন দরকার?
ইলেকট্রিক মোটর কম গতিতেই যথেষ্ট টর্ক দিতে পারে। কিন্তু সব ধরনের রাস্তার জন্য একই গিয়ার রেশিও আদর্শ নয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একটি ই-অটোকে যাত্রী নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠতে হচ্ছে। সেখানে কম গতিতে বেশি টান প্রয়োজন। আবার সমতল শহুরে রাস্তায় বেশি গতিতে চলার সময় অন্য ধরনের পাওয়ার ডেলিভারি দরকার। ২-স্পিড এএমটি এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে। বিশেষ করে কাজে আসতে পারে:
- ফ্লাইওভার ও ঢালু রাস্তা
- যানজটপূর্ণ শহুরে রাস্তা
- অসমান রাস্তা
- বারবার থামা ও চলার রুট
- বেশি যাত্রী নিয়ে চলার সময়
ক্লাইম্ব মোড কীভাবে সাহায্য করে?
বাজাজ গো-গো-তে রয়েছে ক্লাইম্ব মোড। এই মোড চালু করলে গাড়ি প্রথম গিয়ারে পর্যাপ্ত শক্তি ধরে রাখে, যাতে ঢাল বেয়ে ওঠার সময় পাওয়ার ডেলিভারি স্থির থাকে। ফলে পাহাড়ি রাস্তা, ফ্লাইওভার কিংবা অন্য কোনও উঁচু ঢাল পার হওয়ার সময় গাড়ির নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হতে পারে।
হিল হোল্ড অ্যাসিস্ট কী?
ঢালু রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে আবার চলা শুরু করার সময় অনেক সময় পিছনের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হিল হোল্ড অ্যাসিস্ট সেই পরিস্থিতিতে গাড়িকে অল্প সময়ের জন্য ধরে রাখে। ফলে চালক অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দেওয়ার সময় পান এবং পিছনের দিকে গাড়ি গড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। ফ্লাইওভার, পাহাড়ি রাস্তা, র্যাম্প, ঢালু পার্কিং এলাকা কিংবা ঢালু রাস্তায় যানজটে দাঁড়ানোর সময় এই ফিচারটি বিশেষভাবে কাজে আসতে পারে।
রোল ওভার ডিটেকশন কী করে?
বাজাজ গো-গো-র গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে রোল ওভার ডিটেকশন। সিস্টেমটি গাড়ির স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন পরিস্থিতি শনাক্ত করার জন্য তৈরি। বিশেষ করে বাঁক, ঢাল এবং অন্যান্য পরিস্থিতিতে যেখানে থ্রি-হুইলারের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই প্রযুক্তি অতিরিক্ত নিরাপত্তা দিতে পারে। বাজাজ গো-গো সিরিজের বিভিন্ন মডেলে রোল ওভার ডিটেকশনকে নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিজেনারেটিভ ব্রেকিং কীভাবে কাজ করে?
গো-গো-তে রয়েছে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং। গাড়ি গতি কমানোর সময় মোটরের মাধ্যমে কিছু গতিশক্তি পুনরুদ্ধার করে তা ব্যাটারির দিকে পাঠানো যায়। এর ফলে ইলেকট্রিক পাওয়ারট্রেনের সামগ্রিক শক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বাজাজের তথ্য অনুযায়ী, গো-গো পি৫০০৯, পি৫০১২ এবং পি৭০১২ মডেলে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে রয়েছে।
এলইডি লাইট ও মেটাল বডি
বাজাজ গো-গো-তে সামনে ও পিছনে এলইডি লাইটিং রয়েছে। বাণিজ্যিক গাড়ি সাধারণত দীর্ঘ সময় রাস্তায় চলায় সকাল, সন্ধ্যা এবং রাতে ভালো দৃশ্যমানতা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও গো-গো-তে রয়েছে শক্ত মেটাল বডি, যা নিয়মিত বাণিজ্যিক ব্যবহারের চাপ সামলানোর জন্য তৈরি। পি৫০ এবং পি৭০ মডেলে রেডিয়াল টিউবলেস টায়ার এবং দৈনন্দিন রাস্তার জন্য উপযোগী গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্সও রয়েছে।
বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য একাধিক ড্রাইভ মোড
বাজাজ গো-গো-তে একাধিক ড্রাইভ মোড রয়েছে।
- ইকো মোড: কম শক্তি খরচ এবং বেশি রেঞ্জের দিকে নজর দেয়।
- পাওয়ার মোড: তুলনামূলক বেশি পারফরম্যান্স-কেন্দ্রিক ড্রাইভিংয়ের জন্য।
- ক্লাইম্ব মোড: ঢাল বেয়ে ওঠার সময় প্রথম গিয়ারে ধারাবাহিক পাওয়ার ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- পার্ক অ্যাসিস্ট: কম গতিতে গাড়ি ঘোরানো বা পার্কিংয়ের সময় ম্যানুভারিং সহজ করতে সাহায্য করে।
ব্যাটারি, রেঞ্জ ও চার্জিং
বাজাজ গো-গো বিভিন্ন ব্যাটারি ক্ষমতার সঙ্গে পাওয়া যায়।
| মডেল | ব্যাটারি | সার্টিফায়েড রেঞ্জ | চার্জিং সময় |
| গো-গো পি৫০০৯ | ৯.২ কিলোওয়াট-আওয়ার এলএফপি | ২১২ কিমি | ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট |
| গো-গো পি৫০১২ | ১২.১ কিলোওয়াট-আওয়ার | ২৭২ কিমি | ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট |
| গো-গো পি৭০১২ | ১২.১ কিলোওয়াট-আওয়ার | ২৫৯ কিমি | ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিট |
গাড়িতে অন-বোর্ড চার্জারও রয়েছে। বাজাজের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ১৬ অ্যাম্পিয়ারের সকেট ব্যবহার করেই গো-গো চার্জ করা যায়। আলাদা ডেডিকেটেড চার্জিং সেটআপ প্রয়োজন হয় না।
মোটর ও পারফরম্যান্স
গো-গো-তে রয়েছে অ্যাডভান্সড পিএমএস মোটর, যার সর্বোচ্চ টর্ক ৪০ এনএম। পি৫০০৯ মডেলে কন্টিনিউয়াস পাওয়ার প্রায় ৪.৫ কিলোওয়াট, আর পি৫০১২ এবং পি৭০১২-তে তা প্রায় ৫.৫ কিলোওয়াট। পি৫০০৯-এর সর্বোচ্চ গতি ৪৫ কিমি/ঘণ্টা এবং পি৫০১২ ও পি৭০১২-এর সর্বোচ্চ গতি ৫০ কিমি/ঘণ্টা। পি৭০১২ মডেলের গ্রেডেবিলিটি বাজাজের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ।
২-স্পিড বনাম সিঙ্গল-স্পিড ইভি
দুই ধরনের ট্রান্সমিশনের মূল পার্থক্যটি হল পাওয়ার ডেলিভারি।
| বৈশিষ্ট্য | বাজাজ গো-গো ২-স্পিড এএমটি | সিঙ্গল-স্পিড ইভি |
| ট্রান্সমিশন | ২-স্পিড এএমটি | একটি নির্দিষ্ট রেশিও |
| গিয়ার পরিবর্তন | স্বয়ংক্রিয় | প্রযোজ্য নয় |
| কম গতিতে টান | প্রথম গিয়ারে সহায়তা | একটি নির্দিষ্ট রেশিও |
| ঢালে পারফরম্যান্স | ক্লাইম্ব মোড + প্রথম গিয়ার | মডেলভেদে |
| বেশি গতিতে চলা | দ্বিতীয় গিয়ার | একই রেশিও |
| চালকের পরিশ্রম | কম | কম |
| পাওয়ার ব্যবহারের দক্ষতা | পরিস্থিতি অনুযায়ী অপ্টিমাইজ করার লক্ষ্য | নির্দিষ্ট রেশিও |
অর্থাৎ গো-গো-র ২-স্পিড ট্রান্সমিশনের উদ্দেশ্য শুধু সর্বোচ্চ গতি বাড়ানো নয়। কম গতিতে বেশি টান এবং স্বাভাবিক রাস্তায় কার্যকর পাওয়ার ডেলিভারির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
আরও কী কী ফিচার রয়েছে?
প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি গো-গো-তে রয়েছে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য একাধিক ফিচার। এর মধ্যে রয়েছে:
- ডিজিটাল এলসিডি ইন্সট্রুমেন্ট ক্লাস্টার
- ইউএসবি টাইপ-এ চার্জিং
- গ্লাভ বক্স
- কেবিন লাইট
- বোতল রাখার জায়গা
- প্রিমিয়াম ডুয়াল-টোন আপহোলস্ট্রি
- অন-বোর্ড চার্জার
- টেলিম্যাটিক্স
- টিউবলেস রেডিয়াল টায়ার
- হেভি-ডিউটি ড্রাইভ শ্যাফট
- ৫ বছর বা ১,২০,০০০ কিমি ওয়ারেন্টি, বাজাজের বর্তমান পণ্য সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী
কেন আলাদা বাজাজ গো-গো?
বাজাজ গো-গো ইভি-র সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শুধু এটি একটি ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার নয়। ২-স্পিড এএমটি, ক্লাইম্ব মোড এবং হিল হোল্ড অ্যাসিস্ট একসঙ্গে থাকায় গাড়িটিকে বিভিন্ন রাস্তার পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এর সঙ্গে রোল ওভার ডিটেকশন, রিজেনারেটিভ ব্রেকিং, এলইডি লাইটিং এবং শক্ত মেটাল বডি বাণিজ্যিক ব্যবহারে নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের দিকে নজর দেয়।
বিশেষ করে যাঁদের প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে ফ্লাইওভার, ঢালু রাস্তা, যানজটপূর্ণ শহর এবং বারবার স্টপ-স্টার্ট রুটে চলতে হয়, তাঁদের জন্য ২-স্পিড এএমটি-ই বাজাজ গো-গো-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সুবিধা।