মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের ৯০০ কোটি ডলার US ব্যাংকে কীভাবে পৌঁছচ্ছে?
ওয়াশিংটন: ইরানকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করতে বছরের পর বছর ধরে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে আমেরিকা। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি তদন্তে দাবি করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার পরও প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের ইরান-সংযুক্ত অর্থ পরোক্ষভাবে মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রায় ৯০০ কোটি ডলার ইরানি অর্থ আমেরিকান ব্যাংকগুলির মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
এর ফলে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। সরাসরি ইরানি ব্যাংক বা সংস্থাকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখা গেলেও তৃতীয় দেশের ব্যাংক, শেল কোম্পানি এবং মুদ্রা বিনিময় সংস্থার মাধ্যমে অর্থ ঘুরপথে ডলার ব্যবস্থায় ঢুকতে পারে।
কীভাবে ইরানের টাকা পৌঁছচ্ছে মার্কিন ব্যাংকে?
এর মূল চাবিকাঠি হল করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিদেশের বহু ব্যাংক মার্কিন ব্যাংকের সঙ্গে করেসপন্ডেন্ট সম্পর্ক বজায় রাখে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের পূর্ণাঙ্গ মার্কিন ব্যাংকিং পরিকাঠামো না থাকলেও ডলারে লেনদেন নিষ্পত্তি করতে পারে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক লুকিয়ে রাখতে কিছু ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শেল কোম্পানি এবং মুদ্রা বিনিময় সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়। এরপর সেই অর্থ বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ডলার লেনদেনের নিষ্পত্তির সময় মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ ইরানের নাম সরাসরি লেনদেনে না থাকলেও অর্থের উৎস এবং গন্তব্যের মধ্যে একাধিক স্তর তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
Advertisements
‘মোদীর ওয়াকফ আইন ত্রুটিপূর্ণ-বেআইনি!’ যোগী রাজ্যে মসজিদ ধ্বংস নিয়ে কটাক্ষ ওয়াইসির
নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন
এই তথ্য সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের উপর আর্থিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে। “অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট”-এর মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা সংস্থা ও দেশগুলিকে সতর্ক করা হচ্ছে। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীদের বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইরান গত কয়েক বছর ধরে বিকল্প আর্থিক পথ তৈরি করেছে। ফলে একটি সংস্থা বা ব্যাংকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেই পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সমুদ্রেই জমা রয়েছে কোটি কোটি ডলারের তেল
ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হল তেল। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সরাসরি তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও ইরান বিকল্প পথে তেল বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়ার জলসীমায় ট্যাঙ্কারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চিন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের উদ্ধৃত কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, অগস্টে চিন প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেলেরও বেশি ইরানি তেল আমদানি করেছে। ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি চিনে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত-ইসরায়েল অংশীদারিত্বে সবজি চাষে নতুন স্বপ্ন দেখছে ভারতের কৃষকরা
জাহাজ বদলে বদলে তেলের উৎস লুকনোর চেষ্টা
ইরানি তেল পরিবহনে শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার ব্যবহার করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক ট্যাঙ্কার থেকে অন্য ট্যাঙ্কারে তেল স্থানান্তর করা হলে পণ্যের প্রকৃত উৎস শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে যায়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ট্যাঙ্কার থেকে অন্য জাহাজে তেল সরিয়ে সেই জাহাজের মাধ্যমে চিনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ভর্টেক্সা-র হিসাব উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার জলসীমায় বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল ভাসমান অবস্থায় সংরক্ষিত থাকতে পারে। এই তেলের মূল্য ইরানের জন্য কয়েকশো কোটি ডলারের সম্ভাব্য রাজস্বের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
ডলার এড়াতে চিনা ইউয়ান
ইরান শুধু গোপন নেটওয়ার্কের উপর নির্ভর করছে না। চিনের সঙ্গে বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চিনা ইউয়ান ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়িয়েছে তেহরান। ইরানি তেল বিক্রির অর্থ ইউয়ানে নিষ্পত্তি করা হলে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার কিছু অংশ এড়ানো সম্ভব। এরপর সেই ইউয়ান দিয়ে চিনা পণ্য ও পরিষেবা কেনা যায়। এমনকি তেলের বিনিময়ে চিনা সংস্থাকে ইরানে পরিকাঠামো নির্মাণের মতো ব্যবস্থাও করা সম্ভব। ফলে ডলার ব্যবস্থার বাইরে থেকেও ইরানের বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার একটি বিকল্প পথ তৈরি হচ্ছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সিও আরেকটি পথ
নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারও বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের উদ্ধৃত গবেষকদের দাবি, বাণিজ্য, পণ্য এবং অস্ত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলি কয়েকশো কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেছে।
ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-ও তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে চিনা ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ইরানি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং ইরানের সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত ১০০ কোটি ডলারের বেশি ডিজিটাল মুদ্রা বাজেয়াপ্ত করেছে। তবে ক্রিপ্টো বাজারের আন্তর্জাতিক ও বিকেন্দ্রীভূত চরিত্রের কারণে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
হংকং ও দুবাইয়ে শেল কোম্পানির নেটওয়ার্ক
ডলার পুরোপুরি এড়াতে না পারলেও ইরানের এখনও আমদানি, অস্ত্র সংগ্রহ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থ জোগানোর জন্য ডলার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজন রয়েছে। এই কারণে হংকং এবং দুবাইয়ের মতো আর্থিক কেন্দ্রে শেল কোম্পানি ও এক্সচেঞ্জ হাউসের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই সংস্থাগুলির মাধ্যমে ইরানি তেল ও অন্যান্য রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থ ডলার, ইউরো এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দিরহামে রূপান্তর করা সম্ভব হয়। একইসঙ্গে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
‘হুইক-আ-মোল’ সমস্যায় পড়ছে আমেরিকা
মার্কিন ট্রেজারি নিয়মিতভাবে এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক, সংস্থা এবং ব্যক্তিদের নিশানা করছে। কিন্তু একটি সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তার জায়গায় নতুন সংস্থা বা নতুন আর্থিক পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। সম্প্রতি ব্যাংক মিসরের সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কার্যক্রম এমনই একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
মার্কিন ট্রেজারির দাবি, ওই ব্যাংকের ইউএই শাখা প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের এমন লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ করেছে, যা ইরানের ছায়া-ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এরপর মার্কিন করেসপন্ডেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এখানেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার একটি বড় দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। যে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা আমেরিকাকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপর বিপুল প্রভাব দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে, সেই একই ব্যবস্থা ঘুরপথে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা অর্থকে ডলার ব্যবস্থায় পৌঁছনোর সুযোগও দিতে পারে।
শুধু অর্থনীতি নয়, প্রভাব পড়ছে অস্ত্র শিল্পেও
ইরানের বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক শুধু অর্থনীতি সচল রাখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সামরিক কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
ইরানি ক্রেতারা চিনা সংস্থার কাছ থেকে ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু সরবরাহকারী চূড়ান্ত ক্রেতা বা পণ্যের শেষ গন্তব্য সম্পর্কে জানেন না বলেও দাবি করা হয়েছে। আবার কিছু ছোট সংস্থা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে এতটা গভীরভাবে যুক্ত নয় যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ তাদের উপর একইভাবে কাজ করবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইরানের শাহেদ আক্রমণাত্মক ড্রোনের উদাহরণও তুলে ধরেছে, যেটিতে চিনা উপাদান ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
আমেরিকার সামনে কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন
ইরানের আর্থিক নেটওয়ার্ক বন্ধ করতে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তেহরানের অর্থ সরানোর ক্ষমতা কমতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত কঠোরভাবে করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করলে উল্টো কিছু দেশ ইউয়ান বা অন্যান্য বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ইরানকে ডলার ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টার সামনে শুধু নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের প্রশ্নই নেই। একইসঙ্গে ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে।
এই কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের আর্থিক অভিযান এখন অনেকটা ‘হুইক-আ-মোল’ পরিস্থিতির মুখোমুখি। একটি পথ বন্ধ করলে অন্য কোনও দেশ, ব্যাংক, শেল কোম্পানি, মুদ্রা বা ডিজিটাল সম্পদের মাধ্যমে নতুন পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।