‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ চক্র ভাঙতে ২০ রাজ্যের ৮৯ জায়গায় তল্লাশি সিবিআইয়ের
দেশজুড়ে সংগঠিত ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা চক্রের বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালাল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI। শুক্রবার Operation Chakra VI-এর অধীনে ২০টি রাজ্যের মোট ৮৯টি জায়গায় একযোগে তল্লাশি চালানো হয়েছে। অভিযানে সাইবার প্রতারণার টাকা গ্রহণ, বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ঘোরানো এবং ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
CBI জানিয়েছে, এই অভিযান তিনটি বড় অঙ্কের ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা মামলার তদন্তের অংশ। তিনটি মামলায় ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোট ৪২.৩৬ কোটি টাকা প্রতারণা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তিনটি মামলায় কোটি কোটি টাকার প্রতারণা
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতারকরা নিজেদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ সময় ধরে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর মধ্যে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
প্রথম মামলাটি BITS Pilani-এর সঙ্গে যুক্ত। অভিযোগ, এক ভুক্তভোগীকে প্রায় তিন মাস ধরে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করে রাখা হয় এবং তাঁর কাছ থেকে ৭.৬৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। প্রতারকরা পুলিশ আধিকারিকের পরিচয় দিয়ে লাগাতার মানসিক চাপ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ।
Advertisements
দ্বিতীয় ঘটনায় গুজরাতের এক বাসিন্দাকে প্রায় তিন মাস একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে রেখে ১৯.২৪ কোটি টাকা প্রতারণা করা হয় বলে অভিযোগ।
তৃতীয় মামলাটি কর্নাটকের। সেখানে এক ভুক্তভোগীকে প্রায় এক মাস ধরে ভয় দেখিয়ে মোট ১৫.৪৫ কোটি টাকা ট্রান্সফার করানো হয়েছিল বলে তদন্তে অভিযোগ উঠেছে। তিনটি মামলায় সম্মিলিতভাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৪২.৩৬ কোটি টাকা।
কীভাবে চলে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা?
এই ধরনের প্রতারণায় সাধারণত অপরাধীরা ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর নিজেদের পুলিশ, CBI, ED বা অন্য কোনও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আধিকারিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করে, ভুক্তভোগী কোনও গুরুতর অপরাধের মামলায় জড়িত।
এরপর গ্রেফতার বা আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখিয়ে তাঁদের দীর্ঘ সময় ভিডিও কলে থাকতে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য বা প্রকৃত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও নিষেধ করা হয়। এরপর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট যাচাই, জামিন, সিকিউরিটি ডিপোজিট অথবা বেআইনি সম্পত্তি যাচাইয়ের মতো নানা অজুহাতে বিপুল টাকা দাবি করা হয়।
টাকা সরানোর অভিযোগে গ্রেফতার ৩
CBI-এর তদন্তে তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতারণার টাকা সরানোর পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে। CBI-এর মুখপাত্র বীণা যাদব জানিয়েছেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে তাঁদের প্রতারণার টাকা গ্রহণ, বিভিন্ন স্তরে ঘোরানো এবং অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সামনে এসেছে।
গ্রেফতার তিনজন হলেন:
- আকাশ, হরিয়ানার বাসিন্দা
- রাজা কর্মকার, কলকাতার বাসিন্দা
- জ্যোতি রানি
CBI-এর অভিযোগ অনুযায়ী, হরিয়ানার বাসিন্দা আকাশের নামে খোলা একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রতারণার টাকা থেকে প্রায় ১.৯৫ কোটি টাকা জমা পড়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, একই দিন সেই অর্থ অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কলকাতার রাজা কর্মকারের সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১.৫ কোটি টাকা জমা পড়েছিল বলে অভিযোগ।
অন্যদিকে, জ্যোতি রানির অ্যাকাউন্টেও প্রতারণার অর্থের একটি অংশ জমা পড়েছিল বলে CBI-এর দাবি। তদন্ত অনুযায়ী, তিনি সেই অর্থের একটি অংশ নগদে তুলে নেন এবং বাকি টাকা অন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। আর্থিক লেনদেনের মূল উৎস আড়াল করার উদ্দেশ্যেই এমন করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।
২০ রাজ্যে ৮৯ জায়গায় তল্লাশি
Operation Chakra-VI-এর এই অভিযানে CBI-এর দল ২০টি রাজ্যের ৮৯টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে। অভিযানে ব্যাঙ্কিং সংক্রান্ত নথি, অ্যাকাউন্টের রেকর্ড, ডিজিটাল ডিভাইস এবং তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
জব্দ করা ডিজিটাল ডিভাইস ও নথি এখন ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতারণার টাকা কোন কোন অ্যাকাউন্টের মধ্য দিয়ে ঘুরেছে, কারা সেই অর্থ গ্রহণ করেছে এবং বৃহত্তর চক্রে আরও কারা যুক্ত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতারকদের ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোও তদন্ত করছে CBI। পাশাপাশি এখনও গ্রেফতার না হওয়া অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
শুধু ফোন করা প্রতারকরাই নয়, টাকা সরানোর নেটওয়ার্কও নজরে
এই অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, গ্রেফতার তিনজনকে সরাসরি ভুক্তভোগীদের ফোন করে ভয় দেখানো ব্যক্তির পরিবর্তে প্রতারণার টাকা সরানোর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ চক্র শুধু ফোন করা প্রতারকদের নিয়ে গঠিত নয়। একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, অর্থ গ্রহণকারী, টাকা ঘোরানো ব্যক্তি এবং বিভিন্ন জায়গায় অর্থ ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কও এর পিছনে থাকতে পারে।
Operation Chakra-VI-এর আওতায় বড় অভিযান
শুক্রবারের অভিযান CBI-এর চলমান Operation Chakra-VI-এর অংশ। সংগঠিত সাইবার-নির্ভর আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে এই অভিযানের মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তঃরাজ্য নেটওয়ার্কের সন্ধান করা হচ্ছে। ২০ রাজ্যের ৮৯টি জায়গায় একসঙ্গে তল্লাশি থেকে তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণা বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ফোন কলের ঘটনা নয়। এর পিছনে একাধিক রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা আন্তঃসংযুক্ত আর্থিক নেটওয়ার্ক থাকতে পারে।
ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণার বাড়বাড়ন্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতারকদের পাশাপাশি এই অপরাধে ব্যবহৃত নেটওয়ার্কগুলির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ, প্রতিরোধ ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রতারিত অর্থ উদ্ধারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
CBI জানিয়েছে, তিনটি মামলাতেই তদন্ত এখনও চলছে। বাকি প্রতারণার টাকা কোথায় রয়েছে তা চিহ্নিত করা, আরও অভিযুক্তকে শনাক্ত করা এবং তাঁদের গ্রেফতার করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।