বিধ্বস্ত নেপাল: মৃত্যু হাজার ছাড়িয়েছে, উদ্ধারের আশা ক্ষীণ
এই সময়: বান-বিপর্যয়ের পরে সপ্তাহ ঘুরতে চলল। তবু লাশ গোনা থামছে না নেপালে! হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লাফিয়ে বাড়ছে নিখোঁজের সংখ্যা। চিন ও নেপাল মিলিয়ে সংখ্যাটা পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। এই নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন প্রায় ৩০০ ভারতীয়ও। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একটি ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে নেপালে বেড়াতে যাওয়া ৩০ জন পর্যটক, ওই সংস্থার দু’জন ম্যানেজার-সহ ৩৭ জনেরও খোঁজ মেলেনি মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে একের পর এক ভয়াল ভিডিয়ো। বন্যায় ভেসে যাওয়া নুয়াকোটের একটি বাড়ি থেকে একসঙ্গে ২৩টি দেহ মিলেছে। বাড়ির মালিকের খোঁজ নেই। এই ২৩ জনের প্রত্যেকেই একই পরিবারের, নাকি প্রাণ বাঁচাতে ওই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই উত্তরটা দেওয়ার মতোও কাউকে পাওয়া যায়নি আশপাশে।
ভয়াবহ অবস্থা রাসুয়ারও। সেখানকার একটি স্কুল থেকে অন্তত ৩৫০ জন পড়ুয়ার কোনও খোঁজই মিলছে না। এ দিকে মৃতদেহ উপচে পড়া হাসপাতালের মর্গ খালি করতে গণকবর দেওয়া শুরু হয়েছে চিতওয়ান জেলার ভরতপুরের দেবঘাট জঙ্গলে। এরই মধ্যে এল চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট। যেখানে দাবি করা হয়েছে, গত বুধবার (২৬ অগস্ট) হিমবাহ ধসে নেপালে যে হড়পা বান বিপর্যয় ডেকেছিল, তার শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানের হিরোশিমায় আমেরিকার ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও অনেক গুণ বেশি!
কাঠামান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপর্যয় গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্তরাজ অধিকারীর দাবি— এই দুর্যোগে তিনি অবাক হননি, কিন্তু তাঁর গবেষণা জীবনে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। তাঁর মতে, ২০২১-এ উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তার সঙ্গে এই বিপর্যয়ের ভালো রকম মিল রয়েছে। কিন্তু নেপালের এই বিপর্যয়ের শক্তি তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। অধ্যাপক অধিকারীর কথায়, ‘হিমবাহ ধসের কারণে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়েছে, তা গণনা করা হয়েছে। গাণিতিক ভাবেই এটা প্রমাণিত যে, এর শক্তি পারমাণবিক বিস্ফোরণের চেয়েও শক্তিশালী ছিল।’ বুধবারের বিপর্যয়কে এ দিন ‘অন্যতম ভয়াবহ আঞ্চলিক বিপর্যয়’ বলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও।
একাধিক সূত্রের দাবি, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৮৩ জন বিদেশি। ১১ হাজার ৮১৪ জনকে উদ্ধার করা গিয়েছে। কাদা-মাটি ও ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও প্রাণের খোঁজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। ভারত সরকার সোমবারই জানিয়েছে, নেপাল থেকে এখনও পর্যন্ত ১৫৮ জন পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। ইউরোপের কোপারনিকাস অবজ়ারভেটরির দেওয়া তথ্য বলছে, ত্রিশূলি উপত্যকায় আড়াই হাজারেরও বেশি বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ওই উপত্যকায় ৬০০০ মানুষের বাস ছিল। কিন্তু এখন সেখানে শুধুই ধ্বংসাবশেষ। ত্রিশূলি নদীর উপরে রাসুয়া এবং নুয়াকোট জেলা মিলিয়ে অন্তত ১০টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। বিবিসি-র মতো একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট— ওই সব কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট সব টানেলে আটকে পড়া ‘নিখোঁজ’ কর্মীদের সংখ্যা এখনও অন্তত ৯৩৩! কোন টানেলে কত জন, আদৌ তাঁরা বেঁচে আছেন কি না— কিছুই স্পষ্ট নয়। কিন্তু কেন ঘটল এই বিপর্যয়? দায় কার?
চিন কেন এই হিমবাহ-বিপর্যয়ের খবর আগাম দেয়নি, তা নিয়ে গোড়া থেকেই ফুঁসছে কাঠমান্ডু। এ দিন আবার তারা এর জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করেছে। ক্ষয়ক্ষতির হিসেব কষাও চলছে জোরকদমে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশ পুনর্গঠনে প্রাথমিক ভাবে অন্তত ৫০০ কোটি ডলার দিক রাষ্ট্রপুঞ্জ— সাফ দাবি নেপাল সরকারের। জলবায়ু-বিপর্যয় সামাল দিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের যে বিশেষ তহবিল রয়েছে, সেখান থেকেই ইমার্জেন্সি ভিত্তিতে আর্থিক সাহায্য চাইছে নেপাল।
নেপালের পরিবেশ মন্ত্রকের তরফে জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান মহেশ্বর ধাকাল এই ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে বলছেন ‘ম্যান মেড’। তিনি কাঠগড়ায় তুলছেন ‘ধনী’ দেশগুলিকেই। তাঁর মতে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে যে হড়পা বান নামে, তার অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন— ধনী দেশগুলি গত বেশ কয়েক দশক ধরে যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করেছে, তারই ফল ভুগতে হচ্ছে নেপালের মতো ‘দুর্বল’ দেশগুলিকে। ধাকালের কথায়, ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে কম, তারাই আজ ভুগছে সবচেয়ে বেশি।’
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃতির এই বিপুল ধাক্কা মোকাবিলার ক্ষমতা আছে তো রাষ্ট্রপুঞ্জের? রাষ্ট্রপুঞ্জের জলবায়ু তহবিল সংক্রান্ত বোর্ডের প্রাক্তন সহ-সভাপতি রিচার্ড শেরম্যানের বক্তব্য, আমাদের এই তহবিল থেকে নেপালকে কোনও ভাবে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এটা যে নেপাল পুনর্গঠনে ‘কিছুই নয়’, তা-ও মেনে নিয়েছেন তিনি।