সোনার দাম ৫.৩৩ লাখ, রুপো ১১,৪১৯ টাকা হওয়ার পূর্বাভাস মনার্কের
সোনা (Gold Price ) এবং রুপোর দামে আরও একটি বড় ঊর্ধ্বমুখী পর্ব আসতে পারে বলে মনে করছে মনার্ক পিএমএস। সংস্থার বেস-কেস পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সোনার দাম প্রতি আউন্স ৪,৩০০ থেকে ৪,৭০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪.০৯ লাখ থেকে ৪.৪৭ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। একই সময়ে রুপোর দাম প্রতি আউন্স ৭০ থেকে ৮৫ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬,৬৬১ থেকে ৮,০৮৯ টাকা হতে পারে। এই হিসাব করা হয়েছে ১ মার্কিন ডলার = ৯৫.১৬ টাকা ধরে।
মনার্ক পিএমএস বেস-কেস পরিস্থিতির সম্ভাবনা ৫৫ শতাংশ ধরেছে। এই পূর্বাভাসে ধরে নেওয়া হয়েছে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে, জ্বালানির দাম স্বাভাবিক হবে, প্রকৃত সুদের হার স্থিতিশীল থাকবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি প্রতি ত্রৈমাসিকে প্রায় ২৫০ টন সোনা কেনা চালিয়ে যাবে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের চাহিদা, রুপোর সীমিত সরবরাহ এবং মার্কিন মুদ্রানীতির ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে প্রত্যাশা মূল্যবান ধাতুর বাজারকে সমর্থন করছে।
বুল কেসে সোনা ৫.৩৩ লাখ, রুপো ১১,৪১৯ টাকা
আরও আশাবাদী পরিস্থিতিতে সোনা এবং রুপোর দাম অনেকটাই বাড়তে পারে বলে মনে করছে মনার্ক। সংস্থার বুল-কেসের সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে বছরের শেষে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৫,০০০ থেকে ৫,৬০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪.৭৬ লাখ থেকে ৫.৩৩ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
একই পরিস্থিতিতে রুপোর দাম প্রতি আউন্স ৯৫ থেকে ১২০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৯,০৪০ থেকে ১১,৪১৯ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। এই পরিস্থিতি তৈরি হতে হলে মার্কিন শ্রমবাজারে দুর্বলতা দেখা দিতে হবে। এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর দিকে যেতে পারে এবং প্রকৃত সুদের হারও নেমে আসতে পারে।
মনার্কের মতে, এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মূল্যবান ধাতুর দিকে নতুন করে অর্থ স্থানান্তর করলে এবং রুপোর ভৌত বাজারে আবার সরবরাহের চাপ তৈরি হলে দামের ঊর্ধ্বগতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে রুপোর ক্ষেত্রে এই সবচেয়ে আশাবাদী পূর্বাভাস বেস-কেসের তুলনায় অনেক বেশি ঊর্ধ্বগতির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
বিয়ার কেসে সোনা নামতে পারে ৩.৭১ লাখ টাকায়
তবে সোনা ও রুপোর দাম কমার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না মনার্ক। সংস্থাটি বিয়ার-কেস পরিস্থিতির সম্ভাবনা ২০ শতাংশ ধরেছে। এই পরিস্থিতিতে সোনার দাম প্রতি আউন্স ৩,৪০০ থেকে ৩,৯০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩.২৪ লাখ থেকে ৩.৭১ লাখ টাকা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে।
রুপোর দামও প্রতি আউন্স ৪৫ থেকে ৫৫ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪,২৮২ থেকে ৫,২৩৪ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ধরে নেওয়া হয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভ সেপ্টেম্বরে সুদের হার বাড়াবে, তেলের দাম আরও কমবে এবং মূল্যস্ফীতি কমার প্রক্রিয়া দুর্বল চাহিদায় পরিণত হবে। মূল্যবান ধাতুর বিনিয়োগকারীদের জন্য এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করতে পারে প্রকৃত সুদের হার।
সোনার দামের বড় ঝুঁকি প্রকৃত সুদের হার
মনার্কের মতে, সোনার দামের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হল ১০ বছরের মার্কিন ট্রেজারি ইনফ্লেশন-প্রোটেক্টেড সিকিউরিটিজ বা টিপস-এর প্রকৃত সুদের হার। বর্তমানে এই প্রকৃত সুদের হার ২.৪১ শতাংশ। প্রকৃত সুদের হার বাড়লে সুদ দেয় এমন সম্পদ বিনিয়োগকারীদের কাছে সোনার তুলনায় বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ সোনা নিজে কোনও নিয়মিত আয় দেয় না। অন্যদিকে প্রকৃত সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে কমতে থাকলে সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামের পক্ষে পরিস্থিতি আরও অনুকূল হতে পারে।
রুপো তুলনামূলকভাবে সস্তা দেখাচ্ছে
মনার্কের মূল্যায়ন মডেল অনুযায়ী, বর্তমানে সোনার তুলনায় রুপো কিছুটা বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে। সংস্থার মডেল অনুযায়ী, সোনার ন্যায্য মূল্য প্রতি আউন্স ৩,২৪৮ থেকে ৪,৫৯৫ ডলার। ৯৫.১৬ টাকা বিনিময় হার ধরে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩.০৯ লাখ থেকে ৪.৩৭ লাখ টাকা। মধ্যবর্তী মূল্য ৩,৯২২ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩.৭৩ লাখ টাকা। রুপোর ন্যায্য মূল্য প্রতি আউন্স ৫৪ থেকে ৭৭ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫,১৩৯ থেকে ৭,৩২৬ টাকা। এর মধ্যবর্তী মূল্য ৬৫ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৬,১৮৫ টাকা।
জুন মাসে সোনার সর্বনিম্ন দাম ছিল ৩,৯৮৫ ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৩.৭৯ লাখ টাকা। এই দাম মডেলের মধ্যবর্তী মূল্যের প্রায় ২ শতাংশের মধ্যে ছিল। অন্যদিকে রুপোর দাম ছিল ৬১.৭০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৫,৮৭০ টাকা। এটি মডেলের মধ্যবর্তী মূল্য ৬৫ ডলার বা প্রায় ৬,১৮৫ টাকার নিচে। এই হিসাব অনুযায়ী, মনার্কের মূল্যায়ন কাঠামোয় সোনার তুলনায় রুপো কিছুটা কম দামে রয়েছে।
গোল্ড-সিলভার রেশিও বাড়ছে
সোনা ও রুপোর দামের আপেক্ষিক সম্পর্ক বোঝার জন্য গোল্ড-সিলভার রেশিও গুরুত্বপূর্ণ। জানুয়ারির সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই অনুপাত ছিল প্রায় ৪৬ গুণ। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৬৯ গুণ হয়েছে, যা একবিংশ শতাব্দীর গড়ের কাছাকাছি। মনার্ক তার মডেলে ৬০ গুণ-কে বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করে। এই পরিবর্তনের অর্থ, বছরের শুরুতে রুপো যে বাড়তি পারফরম্যান্স দেখিয়েছিল, তার বড় অংশ পরে হারিয়েছে। ফলে সোনার তুলনায় রুপো আবার তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
রুপোর সরবরাহ ঘাটতি বাড়াতে পারে দাম
রুপোর বাজারের মৌলিক পরিস্থিতিকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে মনার্ক। রুপোর বাজারে টানা ষষ্ঠ বছরের জন্য বার্ষিক ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি ২০২১ সাল থেকে মাটির উপরে থাকা মজুত থেকে প্রায় ৭৬২ মিলিয়ন আউন্স রুপো কমেছে। অন্যদিকে খনি থেকে রুপোর সরবরাহ প্রায় এক দশক ধরে মোটামুটি স্থির রয়েছে। চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ একই গতিতে না বাড়লে বাজারে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে রুপোর দামে দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে।
কমেক্সে কাগুজে দাবির পরিমাণ বেশি
মনার্ক রুপোর বাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। সংস্থার অনুমান অনুযায়ী, কমেক্সে কাগুজে রুপোর দাবির পরিমাণ নিবন্ধিত ভৌত রুপোর মজুতের প্রায় ৫.৬ গুণ। বিনিয়োগ বা শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা বাড়লে এবং একই সময়ে ভৌত রুপোর সরবরাহ সীমিত থাকলে এই ভারসাম্যহীনতা রুপোর দামের ঊর্ধ্বগতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিনিয়োগকারীদের কোন বিষয়গুলিতে নজর রাখা উচিত?
মূল্যবান ধাতুর পরবর্তী বড় দামের গতিবিধি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতি, মার্কিন প্রকৃত সুদের হার, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির সোনা কেনার গতি, জ্বালানির দাম এবং রুপোর ভৌত চাহিদা। সোনার ক্ষেত্রে প্রকৃত সুদের হার এবং মার্কিন মুদ্রানীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকতে পারে।
রুপোর ক্ষেত্রে টানা সরবরাহ ঘাটতি, মাটির উপরে থাকা মজুতের পতন এবং ভৌত বাজারে নতুন করে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দামকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। সব মিলিয়ে মনার্ক পিএমএস-এর বেস-কেস পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের শেষে সোনা প্রতি আউন্স ৪.০৯ লাখ থেকে ৪.৪৭ লাখ টাকা এবং রুপো ৬,৬৬১ থেকে ৮,০৮৯ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে।
আর পরিস্থিতি আরও অনুকূল হলে বুল-কেসে সোনা ৫.৩৩ লাখ টাকা এবং রুপো ১১,৪১৯ টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে সংস্থার পূর্বাভাস। তবে সুদের হার ও প্রকৃত ফলনের পরিবর্তন হলে উল্টো দিকে বড় সংশোধনও দেখা দিতে পারে।