ইরানে মার্কিন PrSM ব্যবহারের অভিযোগ, লামের্দে ২১ ‘আমআদমি’র মৃত্যু দাবি
তেহেরান: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর দক্ষিণ ইরানের লামের্দ শহরে একটি হামলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ারওয়ার্স-এর তদন্ত অনুযায়ী, ওই হামলায়…
তেহেরান: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর দক্ষিণ ইরানের লামের্দ শহরে একটি হামলা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ারওয়ার্স-এর তদন্ত অনুযায়ী, ওই হামলায় মার্কিন তৈরি প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বা পিআরএসএম (PrSMS Missile) ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তদন্তটি স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপি।
ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে হামলার শুরুতেই লামের্দে আঘাত হানা হয়। ওই হামলায় অন্তত ২১ জন বেসামরিক মানুষ, যার মধ্যে ৭ জন শিশু, নিহত হয়েছেন বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এয়ারওয়ার্সের তদন্তে দাবি করা হয়েছে, লামের্দে তিনটি মার্কিন তৈরি পিআরএসএম ব্যবহার করা হয়েছিল। হামলার পরের ছবি, ভিডিও এবং উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এপিও ওই উপাদানগুলি স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে।
বিস্ফোরণস্থল থেকে ৫০ মিটার দূরেও প্রাণহানি
এয়ারওয়ার্সের তদন্তে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রগুলির সম্ভাব্য বিস্ফোরণস্থল থেকে ৫০ মিটার বা ১৬৪ ফুট দূর পর্যন্ত বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একটি ক্ষেত্রে হামলার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিধি অন্তত ১৭০ মিটার বা ৫৫৮ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল বলেও তদন্তে দাবি করা হয়েছে। হামলার পরের ছবি ও ভিডিও এবং উপগ্রহচিত্রে ভবন, রাস্তা ও গাড়িতে বিপুল সংখ্যক ছোট ছোট আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ক্ষতির ধরন পিআরএসএম-এর কার্যপ্রণালীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানে পিআরএসএম ছোড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ২৮ ফেব্রুয়ারি লামের্দে কোনও অস্ত্র ছোড়ার কথা অস্বীকার করেছে।
ছয় অস্ত্র বিশেষজ্ঞের মতামত
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ছয়জন অস্ত্র বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁদের মধ্যে দু’জন ছিলেন প্রাক্তন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা। বিশেষজ্ঞদের ছয়জনই মনে করেছেন, লামের্দে পিআরএসএম আঘাত হেনে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তাঁরা মনে করেছেন, বেসামরিক মানুষের বসবাস রয়েছে এমন এলাকার কাছে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা উপযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুদ্ধের আইন নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন উপদেষ্টা মাইকেল মেয়ার বলেছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কোনও লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে পিআরএসএম ব্যবহারকে আইনি ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে। তবে এই বক্তব্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন। লামের্দে ঠিক কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্য কী ছিল, সে বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অবস্থান আলাদা।
কী এই পিআরএসএম?
প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল বা পিআরএসএম হল মার্কিন সেনাবাহিনীর পরবর্তী প্রজন্মের দীর্ঘপাল্লার ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষেপণাস্ত্র। এটি লকহিড মার্টিন তৈরি করেছে। পুরনো আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম বা এটিএসিএমএস-এর পরিবর্তে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। পিআরএসএম-এর লক্ষ্য হল ৪৯৯ কিলোমিটার বা তার বেশি দূরত্বে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা। ক্ষেপণাস্ত্রটি হাইমার্স এবং এম২৭০/এম২৭০এ২ মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট সিস্টেম থেকে ছোড়া যায়। একটি লঞ্চ পডে দুটি পিআরএসএম রাখা যায়। ফলে এটিএসিএমএস-এর তুলনায় একই লঞ্চারে ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়।
মাঝআকাশে বিস্ফোরণের জন্য তৈরি পিআরএসএম
পিআরএসএম-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল এর ওয়ারহেড বা যুদ্ধাস্ত্র অংশের নকশা। এটি মাঝআকাশে বিস্ফোরিত হয়ে চারদিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দশ হাজারেরও বেশি ঘন টাংস্টেনের পেলেট ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের পেলেট বিস্ফোরণের পর বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিস্তৃত এলাকায় ক্ষতি করতে পারে। লামের্দে হামলার পর ভবন, রাস্তা ও যানবাহনে দেখা যাওয়া অসংখ্য আঘাতের চিহ্নের সঙ্গে এই ধরনের ক্ষতির মিল রয়েছে বলে অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা মনে করেছেন। এয়ারওয়ার্স ও এপির বিশ্লেষণে এই বিষয়টিই পিআরএসএম ব্যবহারের সম্ভাবনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
জিপিএস ও ইনর্শিয়াল নেভিগেশন
পিআরএসএম-এ ইনর্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেম-এর সঙ্গে জিপিএস ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্রটি নিজের গতিবিধি ও অবস্থান নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে নির্ভুল অবস্থান নির্ধারণের জন্য জিপিএস-নির্ভর নেভিগেশন এবং ইনর্শিয়াল নেভিগেশনের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভবিষ্যতে আপগ্রেড করার সুযোগ
পিআরএসএম-এর নকশায় ওপেন-সিস্টেম আর্কিটেকচার এবং মডিউলার ডিজাইন ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ, ভবিষ্যতের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষেপণাস্ত্রটির বিভিন্ন প্রযুক্তি ও সক্ষমতা পরিবর্তন বা উন্নত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। লকহিড মার্টিন তাদের প্রাথমিক সংস্করণের ওয়ারহেডকে ‘এনহ্যান্সড লিথ্যালিটি’ ওয়ারহেড হিসেবে বর্ণনা করে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর আঘাত হানার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে।
কোন লক্ষ্যবস্তুর জন্য তৈরি?
লকহিড মার্টিনের তথ্য অনুযায়ী, পিআরএসএম-এর লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, কমান্ড ও কন্ট্রোল নোড, সেনা সমাবেশের এলাকা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্য। এর দীর্ঘ পাল্লা এবং নির্ভুল আঘাত হানার ক্ষমতা এটিকে আধুনিক স্থলযুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র করে তুলেছে। তবে এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ঘনবসতিপূর্ণ বেসামরিক এলাকার কাছে ব্যবহার করা হলে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। লামের্দে হামলা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যেও সেই উদ্বেগই উঠে এসেছে।
লামের্দে আসলে কী ঘটেছিল?
এখনও পর্যন্ত লামের্দে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় পিআরএসএম ব্যবহারের বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী স্বীকারোক্তি দেয়নি। বরং তারা ওই নির্দিষ্ট শহরে সেদিন কোনও অস্ত্র নিক্ষেপের কথা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে এয়ারওয়ার্সের তদন্ত, হামলার পরের ছবি, ভিডিও ও উপগ্রহচিত্র এবং ছয়জন অস্ত্র বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন পিআরএসএম ব্যবহারের সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছে। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, হামলায় অন্তত ২১ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৭ জন শিশু।
ফলে লামের্দের ঘটনা একদিকে পিআরএসএম-এর মতো অত্যাধুনিক দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, অন্যদিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের আইন মেনে চলার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত ও তথ্য যাচাই যত এগোবে, লামের্দে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং হামলার প্রকৃত লক্ষ্য সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ছবি পাওয়া যেতে পারে।