Nepal flash flood: নেপালের লাংটাং লিরুং কেন বারবার মানুষের রক্ত খেতে ভালবাসে? | Behind the Heavenly Beauty: Why Langtang Lirung Keeps Striking Nepal with Deadly Disasters - 24 Ghanta Bangla News
Home

Nepal flash flood: নেপালের লাংটাং লিরুং কেন বারবার মানুষের রক্ত খেতে ভালবাসে? | Behind the Heavenly Beauty: Why Langtang Lirung Keeps Striking Nepal with Deadly Disasters

Spread the love

প্রকৃতির এই চরম প্রতিশোধের নেপথ্যে আসল কারণ কী?
Image Credit: Getty Images

পাহাড়ের কি নিজস্ব কোনও জিঘাংসা থাকে? নাকি রূপকথার গল্পের সেই নিষ্ঠুর দৈত্যদের মতো সে-ও রক্ত আর ধ্বংসের গন্ধ ভালোবাসে? নীল আকাশের পটভূমিতে যখন রুপোলি রোদ ঠিকরে পড়ে লাংটাং লিরুংয়ের বরফে ঢাকা মাথায়, দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন ঈশ্বরের নিজের হাতে আঁকা এক স্বর্গ। কাঠমান্ডুর ব্যস্ত শহর ছাড়িয়ে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার উত্তরে গেলে মাথা তুলে দাঁড়ানো ৭,২৪৫ মিটারের এই শৃঙ্গটি পথচলতি পর্যটকদের নিঃশব্দে হাতছানি দেয়। অথচ সেই মায়াবী সাদা চাদরের আড়ালেই যে যুগ যুগ ধরে ওত পেতে বসে আছে এক নির্মম জল্লাদ, তা কে জানত! নেপালের বুকে লাংটাং লিরুং আজ আর নিছক কোনও পাহাড় নয়, সে এক বারবার ফিরে আসা বুকভাঙা কান্নার নাম।

গল্পের প্রথম নির্মম অধ্যায়টা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিল। ঝলমলে মিষ্টি আলোয় তখন লাংটাং উপত্যকার পাথুরে বাড়িগুলোয় উনুন জ্বলছিল। কাঠ চেরার গন্ধ, শিশুদের খিলখিল হাসি আর পথশ্রান্ত ট্রেকারদের চায়ের কাপে জমছিল গল্প। ঠিক বেলা ১১টা ৫৬ মিনিটে হঠাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠে গোটা নেপাল। ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের তীব্র এক ঝাঁকুনি। লাংটাং লিরুংয়ের দক্ষিণ ঢালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা বরফের বিশাল সাম্রাজ্য এক লহমায় যেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

পাহাড়ের ৩,০০০ মিটার ওপর থেকে খসে পড়ল এক দানবীয় তুষারধস। বরফ, মাটি আর ভারী পাথরের সেই অন্ধ আক্রোশ উপত্যকার দিকে ধেয়ে এসেছিল বুলেটের গতিতে। সময় লেগেছিল ঠিক ৬৭ সেকেন্ড। হ্যাঁ, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার আগেই চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল রূপকথার মতো সাজানো পুরো লাংটাং গ্রামটা। তিনশোরও বেশি তাজা প্রাণ সেই বরফের কবরে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। নিস্তব্ধ উপত্যকায় পড়ে ছিল শুধু ধ্বংসস্তূপ আর স্বজনহারানো মানুষের আর্তনাদ। মানচিত্র থেকে একটা গোটা জনপদের নাম মুছে দিয়ে সেদিন শান্ত হয়েছিল শৃঙ্গটি।

মানুষ ভেবেছিল, প্রকৃতি বোধহয় তার ঋণ শোধ করে নিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই মানুষ আবার নতুন করে স্বপ্ন বুনেছিল, ঘর বেঁধেছিল। কিন্তু প্রকৃতির অভিশাপের কি এত সহজে মুক্তি মেলে?

ঠিক এগারোটি বছর পর, ২০২৬ সালের ২৬ অগস্ট। তখন সবে সকালের আলো ফুটছে। মানুষ যখন নতুন দিনের আশায় চোখ মেলছে, তখনই লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে শুরু হল তার দ্বিতীয় নিষ্ঠুর খেলা। এবার আর দক্ষিণের তুষারধস নয়, প্রায় ৫,২০০ মিটার উঁচুতে থাকা একটা আস্ত হিমবাহ আর তার নিচের পাথুরে কঙ্কাল একসঙ্গে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। যেন কেউ পাহাড়ের গা থেকে বিশাল এক খণ্ড মাংস খুবলে তুলে নিল। সেই ভয়ংকর ধস ২,০০০ মিটার নিচে সশব্দে আছড়ে পড়ল লেন্দে নদীর বুকে।

ধসের অভিঘাতে তৈরি হয়েছিল ৫.২ মাত্রার ভূকম্পন। বরফ আর পাথরের বিশাল স্তূপে আটকে গেল নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। তৈরি হল এক কৃত্রিম মরণফাঁদ। নদীর বুকে সেই জল জমতে জমতে একসময় প্রকৃতির সেই অস্থায়ী বাঁধকে চুরমার করে দিল। তারপর যা ঘটল, তা কোনও প্রলয়ঙ্করী দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম কিছু নয়।

পাহাড়ের বুক চিরে গর্জন করতে করতে নেমে এল ঘোলা জলের এক সর্বগ্রাসী দানব। মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে নদীর জলস্তর উঠে গেল সাত থেকে নয় মিটার। লেন্দে নদী থেকে সেই পাগলা স্রোত গিয়ে মিশল ভোটকোশি আর ত্রিশূলি নদীতে। চিনের গিরং বন্দর থেকে নেপালের রাসুয়া হয়ে ত্রিশূলি উপত্যকা, টানা ১০০ কিলোমিটার পথ জুড়ে যা কিছু সামনে পড়ল, বাড়িঘর, সেতু, পাহাড়ি রাস্তা, আর শত শত নিরীহ মানুষ, সব এক নিমেষে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল। নদীর কাদামাখা পাড়ে বসে যখন পিঠে সন্তান বাঁধা এক অসহায় মা তাঁর হারিয়ে যাওয়া সংসারের দিকে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকেন, তখন সেই হাহাকারের কোনও ভাষা থাকে না।

কিন্তু কেন এই রক্তপিপাসা? ভূবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই রূপসী শৃঙ্গের অন্তরে আসলে চলছে এক তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব। কোটি কোটি বছর ধরে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটগুলো নিচ থেকে লাংটাং লিরুংকে ঠেলে ঠেলে ওপরের দিকে তুলছে, ঠিক যেমন গাড়ির নিচে জ্যাক লাগিয়ে গাড়িকে তোলা হয়। যত সে উঠছে, তার ঢাল তত বেশি খাড়া হয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। আর তার সঙ্গে দোসর হয়েছে মানুষের তৈরি উষ্ণায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের উত্তাপে গলে যাচ্ছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাটিকে আঠার মতো ধরে রাখা প্রাচীন বরফ। ফলে পাহাড়ের ভিত আলগা হয়ে যাচ্ছে, তার কঙ্কাল খসে পড়ছে।

লাংটাং লিরুং আজ শুধু একটা পাহাড় নয়, প্রকৃতির চরম প্রতিশোধের এক রক্তিম দলিল। বরফের শুভ্র চাদর মুড়ি দিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তার বুকের মধ্যে জমে থাকা অস্থিরতা নেপালের মানুষকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয়, অভিশাপ এখনও শেষ হয়নি। পরের আঘাতটা হয়তো অপেক্ষা করছে আরও এক অদৃশ্য কোণে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *