৩,০০০ রাউন্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভারতের দেশীয় রাইফেল - 24 Ghanta Bangla News
Home

৩,০০০ রাউন্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ভারতের দেশীয় রাইফেল

Spread the love

নয়াদিল্লি: প্রতিদিন কর্মদিবসে ২৩ বছরের নেহা মিশ্র কাঁধে তুলে নেন একে-২০৩ (AK-203) ‘শের’, নিশানা করেন এবং ট্রিগার টানেন। তবে আমেঠির কোরওয়ায় ইন্দো-রাশিয়ান রাইফেলস প্রাইভেট লিমিটেড বা আইআরআরপিএলের কারখানায় তাঁর এই গুলি চালানো কোনও সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ নয়। নতুন তৈরি একটি রাইফেল সেনার হাতে তুলে দেওয়ার উপযুক্ত কি না, তা যাচাই করাই তাঁর কাজ।

আইআরআরপিএলের নয়জন পরীক্ষামূলক ফায়ারারের মধ্যে নেহাই একমাত্র মহিলা। আমেঠির মুনশিগঞ্জে তাঁর বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই এই ফায়ারিং রেঞ্জ। কারখানায় তৈরি হওয়া প্রতিটি রাইফেলের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে তাঁর।

সম্পূর্ণ ভারতীয় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি প্রথম একে-২০৩ রাইফেল থেকেও গুলি ছোড়া পরীক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন নেহা। ভারতের ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচির ক্ষেত্রে এটি একটি বড় মাইলফলক। নেহার কাছে অবশ্য রুশ উপাদান ব্যবহার করা আগের রাইফেল এবং সম্পূর্ণ ভারতীয় সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য খুব একটা চোখে পড়েনি।  তিনি বলেন, “এটা একই। বড় কোনও পার্থক্য নেই,”৷ তাঁকে যদি সেনার সদস্য হিসেবে সম্পূর্ণ ভারতীয় রাইফেলটি বেছে নিতে বলা হয়, তাঁর উত্তর ছিল স্পষ্ট। “নিঃসন্দেহে। চোখ বন্ধ করেও আমরা এটা নিতে পারি।”

ভারতের জন্য অবশ্য এই রাইফেলের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিশেষ ধাতু ও উপকরণ তৈরি থেকে শুরু করে দেশীয় সরবরাহকারী গড়ে তোলা, প্রায় এক দশকের প্রচেষ্টার পর রুশ নকশার একটি অস্ত্রকে সম্পূর্ণ ভারতীয়ভাবে তৈরি করার পথে এটি বড় সাফল্য।

কেন একে-২০৩ গুরুত্বপূর্ণ

আইআরআরপিএলের সিইও এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেজর জেনারেল সুধীর কুমার শর্মার মতে, এই প্রকল্পের গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত সেই সেনার কাছে গিয়ে পৌঁছয়, যিনি অস্ত্রটি ব্যবহার করবেন।   তিনি বলেন, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র যতই থাকুক না কেন, সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বা জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া একজন সেনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র এখনও রাইফেল।

১৯৯০-এর দশকে জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে ভারতীয় সেনার অভিজ্ঞতাও একে-২০৩ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। জঙ্গিদের হাতে থাকা কালাশনিকভ ধরনের রাইফেলের নির্ভরযোগ্যতা এবং সরলতা সেনার নজরে আসে।

বিভিন্ন দেশের অস্ত্র পরীক্ষা করার পর ভারতীয় সেনা একে-২০৩ বেছে নেয়। এরপর মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়ায় তৈরি নকশার এই রাইফেলকে ভারতেই উৎপাদন করা।

আমেঠির কোরওয়াকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি, জমি ও পরিকাঠামো ছিল। পাশাপাশি লখনউ এবং কানপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদন পরিকাঠামোও কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল।

রুশ নকশা থেকে সম্পূর্ণ ভারতীয় রাইফেল

এই প্রকল্পে রাশিয়ার কাছ থেকে ব্যাপক প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হয়। রাইফেলের নকশা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত প্রায় ৯০ হাজার পৃষ্ঠা প্রযুক্তিগত নথি ভারতের হাতে আসে। কোভিড-১৯ মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের গতি কমে যায়। শেষ প্রযুক্তিগত প্যাকেজ ভারতে পৌঁছয় ২০২৪ সালে।

২০২৩ সালের আগস্টে কোরওয়ায় তৈরি প্রথম রাইফেলে ভারতীয় উপাদানের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তা বেড়ে হয় ১৫ শতাংশ। ২০২৬ সালের আগস্টে এসে একে-২০৩-এর ৫০টি প্রধান উপাদান এবং প্রায় ১৮০টি ছোট উপাদান সম্পূর্ণভাবে ভারতে তৈরি হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের জন্য ভারতীয় সংস্থাগুলিকে এমন বহু বিশেষ উপাদান তৈরি করতে হয়েছে, যেগুলির জন্য আগে রাশিয়ার উপর নির্ভর করতে হতো। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ ধরনের স্টিল অ্যালয়, স্প্রিং, ইঞ্জিনিয়ারিং প্লাস্টিক, কম্পোজিট, কোটিং এবং নির্দিষ্ট রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের ধাতু।

তৈরি হয়েছে দেশীয় সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক

অ্যাডভান্সড উইপনস অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড বা এডব্লিউইআইএল এবং আদানি ডিফেন্স সিস্টেমস অ্যান্ড টেকনোলজিস দেশীয় ভেন্ডর নেটওয়ার্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। আইআরআরপিএলের দল, যার মধ্যে ভারতীয় সেনার অফিসার এবং রুশ বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন, দেশের প্রায় ৭৬টি সাব-ভেন্ডর পরিদর্শন করেছে। উৎপাদন প্রক্রিয়া, কাঁচামাল এবং প্রযুক্তি পরীক্ষা করার পাশাপাশি উৎপাদনের সমস্যা সমাধানেও তারা কাজ করেছে। এই ভেন্ডরদের প্রায় অর্ধেক উত্তরপ্রদেশে, বিশেষ করে কানপুর এবং লখনউয়ের আশপাশে রয়েছে।

ভারতেই পরীক্ষার পরিকাঠামো তৈরি করতে হয়েছে। প্রথমদিকে বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষার জন্য রাশিয়ায় পাঠানো হতো। পরে দিল্লি-এনসিআর, লখনউ, কানপুর, বেঙ্গালুরু এবং পুনের পরীক্ষাগারগুলিও ব্যবহার করা হয়। এরপর কোরওয়াতেই নিজস্ব পরীক্ষাগার তৈরি করেছে আইআরআরপিএল। সেখানে এক্স-রে এবং ম্যাগনেটিক পার্টিকল ইন্সপেকশন-সহ প্রায় ৭৬ ধরনের পরীক্ষা করা যায়।

রুশ বিশেষজ্ঞদের একটি দল এখনও ভারতীয় কর্মীদের সঙ্গে কাজ করছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একজন চিফ টেকনোলজিস্ট এবং একজন কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিশেষজ্ঞ। শর্মার মতে, একটি রাইফেল তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ১২২টি পৃথক ধাপ রয়েছে। হাইড্রলিক এবং ইলেকট্রিক মেশিনের মধ্য দিয়ে উপাদানগুলি এগিয়ে যায়। পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতায় প্রতিটি ওয়ার্কস্টেশন প্রায় ৯০ সেকেন্ডে নিজের কাজ শেষ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ফলে প্রায় প্রতি ১০০ সেকেন্ডে একটি সম্পূর্ণ রাইফেল তৈরি করা সম্ভব হবে।

একে-২০৩-এর চূড়ান্ত পরীক্ষা

সেনার হাতে যাওয়ার আগে প্রতিটি একে-২০৩-কে ফায়ারিং পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।  প্রতিটি রাইফেল থেকে প্রায় ৭০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। এর মধ্যে দুটি উচ্চচাপের রাউন্ড থাকে, যা সাধারণ গুলির তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি চাপ তৈরি করে। কোরওয়া কারখানায় এই পরীক্ষার জন্য প্রায় দুই ডজন ফায়ারিং রেঞ্জ রয়েছে।

প্রথম সম্পূর্ণ ভারতীয় একে-২০৩-এর ক্ষেত্রে আরও কঠিন পরীক্ষা করা হয়েছিল। রাইফেলটি থেকে টানা ৩,০০০ রাউন্ড গুলি চালিয়ে পরীক্ষা করা হয় এবং সেটি সফলভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলে জানিয়েছে আইআরআরপিএল। এখন সম্পূর্ণ দেশীয় উপাদান ব্যবহার করে তৈরি আরও ১০টি একে-২০৩ সেনার পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।  ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০ হাজার রাইফেল সরবরাহ করেছে সংস্থাটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি রাইফেলে ভারতীয় উপাদানের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে।

আমেঠিতে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা কর্মী

একে-২০৩ প্রকল্প শুধু রাইফেল উৎপাদনেই পরিবর্তন আনেনি। আমেঠি এবং আশপাশের জেলাগুলিতে তরুণদের জন্য নতুন ধরনের প্রতিরক্ষা উৎপাদন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। কারখানার বহু কর্মীর বয়স ২০-এর কোঠায়। তাঁরা আমেঠি, সুলতানপুর, প্রতাপগড়, রায়বরেলি এবং আশপাশের এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে আইটিআই পাশ করা তরুণ, ডিপ্লোমা হোল্ডার এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়ারাও রয়েছেন। প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যোগ দেওয়ার আগে তাঁদের অনেকেরই কোনও অভিজ্ঞতা ছিল না।

২৫ বছরের অভিষেক পাঠক তাঁদেরই একজন। আইটিআই ডিপ্লোমা করা অভিষেক একসময় সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। আরেক পরীক্ষামূলক ফায়ারার সচিন দেবও আমেঠির বাসিন্দা এবং এনসিসির অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই কারখানায় যোগ দিয়েছেন। প্রকল্পের ভারত-রাশিয়া যৌথ চরিত্র ব্যবস্থাপনা স্তরেও স্পষ্ট। আইআরআরপিএলের আট সদস্যের বোর্ডে চারজন ভারতীয় এবং চারজন রুশ প্রতিনিধি রয়েছেন। সিএমডির অধীনে কাজ করা আটজন জেনারেল ম্যানেজারের মধ্যে চারজন রুশ অফিসার, যারা ভারতে কর্মরত।

৭০ হাজার রাইফেল থেকে আরও বড় উৎপাদনের পথে

বর্তমানে আইআরআরপিএলে প্রায় ২৪৭ জন কর্মী রয়েছেন। পূর্ণ উৎপাদন শুরু হলে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪৬০ হতে পারে। শর্মা জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের এপ্রিল থেকে সরবরাহকারীরা প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপাদান সময়মতো দিতে পারলে প্রতি ১০০ সেকেন্ডে একটি রাইফেল উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।

সংস্থাটি ইতিমধ্যেই ১.৫ লক্ষেরও বেশি রাইফেলের সম্ভাব্য চাহিদার ইঙ্গিত পেয়েছে। ভবিষ্যতে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রফতানি এবং কালাশনিকভ পরিবারের অন্যান্য অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে আপাতত মূল লক্ষ্য ভারতীয় সেনার চাহিদা পূরণ করা এবং রুশ নকশা থেকে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ভারতীয়ভাবে তৈরি একে-২০৩-এর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

এক দশকের প্রযুক্তি হস্তান্তর, দেশীয় সরবরাহকারী তৈরি এবং হাজার হাজার ঘণ্টার পরীক্ষার পর ভারতের ‘শের’ এখন শুধু রুশ নকশার রাইফেল নয়। এটি ভারতের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯

আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ

আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *