BMW X1 লং হুইলবেস রিভিউ: বেশি জায়গা-আরামে কতটা বদলাল গাড়ি?
গুরুগাঁও: ভারতে বিএমডব্লিউ এক্স১ (BMW X1) লং হুইলবেস ৪৯.৯০ লক্ষ টাকা (এক্স-শোরুম) প্রারম্ভিক দামে লঞ্চ হয়েছে। প্রথম দেখায় এটিকে বিএমডব্লিউ এক্স১-এর শুধু বড় আকারের সংস্করণ মনে হতে পারে। কিন্তু কিছুটা সময় কাটালেই বোঝা যায়, ভারতীয় বাজারের জন্য এক্স১-এর চরিত্রেই বড় পরিবর্তন এনেছে বিএমডব্লিউ। এতদিন এক্স১ ছিল বিএমডব্লিউ পরিবারের অন্যতম এন্ট্রি-লেভেল মডেল এবং ভারতে সংস্থার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া গাড়িগুলির একটি। এবার বৈদ্যুতিক আইএক্স১ লং হুইলবেসের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পেট্রোলচালিত এক্স১-তেও একই ফর্মুলা ব্যবহার করেছে সংস্থা।
নতুন এক্স১ লং হুইলবেসে গাড়ি চালানোর রোমাঞ্চের চেয়ে পিছনের আসনের আরাম, ব্যবহারিকতা এবং দৈনন্দিন বিলাসিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রাখলে এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে হয়।
গাড়িটির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আকারে। এক্স১ লং হুইলবেসের দৈর্ঘ্য ৪,৬১৬ মিমি, যা সাধারণ এক্স১-এর তুলনায় ১১৬ মিমি বেশি। হুইলবেস বেড়ে হয়েছে ২,৮০০ মিমি, অর্থাৎ ১০৮ মিমি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি সুবিধা পাওয়া যায় পিছনের আসনে। বিএমডব্লিউ-র দাবি, এই গাড়িতে দ্বিতীয় সারিতে সেগমেন্টের অন্যতম সেরা জায়গা রয়েছে।
Also Read | চার-দরজার Ford Mustang আসছে? ৪ সেকেন্ডের কমে ১০০ কিমি গতি!
পিছনের যাত্রীদের হাঁটুর জন্য জায়গা ১০৯ মিমি বেড়েছে। ছয় ফুট লম্বা চালকের পিছনেও তুলনামূলক লম্বা যাত্রী আরামে বসতে পারেন। পিছনের আসনে নরম কুশন এবং লম্বা সিট বেস দেওয়া হয়েছে, ফলে উরুর নিচে ভালো সাপোর্ট পাওয়া যায়। যাঁরা চালক নিয়ে গাড়ি ব্যবহার করেন অথবা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তাঁদের কাছে এই অতিরিক্ত জায়গা এক্স১ লং হুইলবেস বেছে নেওয়ার অন্যতম বড় কারণ হতে পারে।
কেবিনের নকশা আধুনিক বিএমডব্লিউ মডেলের মতোই রাখা হয়েছে। রয়েছে কার্ভড বিএমডব্লিউ ওয়াইডস্ক্রিন ডিসপ্লে, বিএমডব্লিউ অপারেটিং সিস্টেম ৯, ফ্লোটিং সেন্টার কনসোল, ওয়্যারলেস চার্জিং, বিএমডব্লিউ ইন্টেলিজেন্ট পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং কানেক্টেড ড্রাইভ প্রযুক্তি। উচ্চমানের হারমান কার্ডন সাউন্ড সিস্টেমও পাওয়া যায়। কেবিনের পরিবেশ আরও উজ্জ্বল করতে বড় পিছনের জানালা, চওড়া দরজা এবং বড় প্যানোরামিক গ্লাস ছাদ দেওয়া হয়েছে।
Also Read | মেক ইন ইন্ডিয়ায় ফের বড় ঘোষণা! দেশীয় যুদ্ধ বিমান তৈরিতে রিলায়েন্সের সঙ্গে হাত মেলাল রোলস রয়েস
ব্যবহারিকতার দিক থেকেও এক্স১ লং হুইলবেস বেশ এগিয়ে। এতে ৫৪০ লিটার বুট স্পেস রয়েছে, যা পিছনের আসন ভাঁজ করলে বেড়ে ১,৭০০ লিটার পর্যন্ত হয়। পরিবার নিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণ, বিমানবন্দরে যাতায়াত কিংবা সপ্তাহান্তের সফর, সব ক্ষেত্রেই এই বড় বুট যথেষ্ট কাজে আসবে।
বাইরের ডিজাইনে খুব বড় পরিবর্তন করেনি বিএমডব্লিউ। গাড়িতে রয়েছে সংস্থার পরিচিত কিডনি গ্রিল, অ্যাডাপটিভ এলইডি হেডল্যাম্প, চারটি লাইটের মতো সামনের আলোর নকশা, সাটিন অ্যালুমিনিয়াম ফিনিশ এবং ১৮ ইঞ্চি অ্যালয় হুইল। লম্বা হুইলবেসের কারণে গাড়ির অনুপাত আরও ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রিমিয়াম দেখায়, যদিও গাড়িটি অস্বাভাবিক বড় বলে মনে হয় না।
এক্স১ লং হুইলবেসে রয়েছে ১.৫ লিটার টুইনপাওয়ার টার্বো পেট্রোল ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন থেকে ১৫৬ এইচপি শক্তি এবং ২৩০ এনএম টর্ক পাওয়া যায়। ইঞ্জিনের সঙ্গে রয়েছে ৭-স্পিড ডুয়াল-ক্লাচ স্বয়ংক্রিয় গিয়ারবক্স। গাড়িটি ই২০ জ্বালানির জন্য প্রস্তুত হলেও এর কমপ্লায়েন্স ই২০-এর চেয়েও বেশি, অর্থাৎ ই২৫ পর্যন্ত সক্ষম।
তবে এই গাড়ির মূল লক্ষ্য স্পোর্টি ড্রাইভিং নয়। লম্বা হুইলবেসের কথা মাথায় রেখে বিএমডব্লিউ সাসপেনশনকে আরামকেন্দ্রিক করেছে। ভারতীয় রাস্তার কথা বিবেচনা করলে এই সেটআপ যথেষ্ট কার্যকর। গাড়িটি দ্রুতগতিতে স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি শহরের রাস্তায়ও তুলনামূলক আরামদায়ক অনুভূতি দেয়। ফলে পুরনো বিএমডব্লিউ-র মতো স্পোর্টি চরিত্রের বদলে এখানে আরাম এবং পরিশীলনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তির দিক থেকেও গাড়িটি বেশ সমৃদ্ধ। রয়েছে বিএমডব্লিউ ওএস৯ ইনফোটেনমেন্ট সিস্টেম, ডিজিটাল কি প্লাস, রিমোট সফটওয়্যার আপডেট, কানেক্টেড ড্রাইভ পরিষেবা, পার্কিং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্লাস, রিভার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা। ১২টি স্পিকারের হারমান কার্ডন অডিও সিস্টেমও দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল কি প্লাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে স্মার্টফোন বা স্মার্টওয়াচকে গাড়ির চাবি হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং প্রয়োজনে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ডিজিটাল অ্যাক্সেসও শেয়ার করা সম্ভব।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও রয়েছে আটটি এয়ারব্যাগ, অ্যাডাপটিভ এলইডি হেডল্যাম্প, ফ্রন্ট কলিশন ওয়ার্নিং, লেন ডিপার্চার ওয়ার্নিং, পথচারী শনাক্তকরণ, ডায়নামিক ক্রুজ কন্ট্রোল এবং বিভিন্ন উন্নত ড্রাইভার অ্যাসিস্ট্যান্স সিস্টেম। শক্তিশালী বডি শেলও গাড়িটির নিরাপত্তা বাড়িয়েছে।
এক্স১ লং হুইলবেসের সবচেয়ে বড় সুবিধা অবশ্যই পিছনের আসনের জায়গা। অতিরিক্ত ১০৯ মিমি হাঁটুর জায়গা পিছনের কেবিনকে এতটাই আরামদায়ক করেছে যে এই সেগমেন্টে এটিকে অন্যতম সেরা বলা যায়। প্রিমিয়াম কেবিন, কার্ভড ডিসপ্লে, হারমান কার্ডন অডিও, প্যানোরামিক ছাদ এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিও গাড়িটির বড় প্লাস পয়েন্ট।
ভারতের রাস্তার জন্য আরামকেন্দ্রিক সাসপেনশনও যথেষ্ট কার্যকর। বড় বুট, চওড়া দরজা এবং প্রশস্ত পিছনের আসনের কারণে প্রতিদিনের পারিবারিক ব্যবহারে গাড়িটি বেশ সুবিধাজনক।
তবে কিছু ক্ষেত্রে আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। ১৫৬ এইচপি পেট্রোল ইঞ্জিনটি মসৃণ এবং পরিশীলিত হলেও প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার গাড়িতে কিছু ক্রেতা আরও বেশি শক্তি আশা করতে পারেন। বিএমডব্লিউ-র ঐতিহ্যগত স্পোর্টি ড্রাইভিং চরিত্র পছন্দ করেন এমন ক্রেতাদের কাছেও এই গাড়ি কিছুটা কম উত্তেজনাপূর্ণ মনে হতে পারে। এছাড়া বেশি কিলোমিটার গাড়ি চালানো ক্রেতাদের জন্য ডিজেল ইঞ্জিনের অনুপস্থিতি হতাশাজনক হতে পারে।
তবে যাঁরা সাধারণ গাড়ি থেকে বিলাসবহুল গাড়িতে আপগ্রেড করতে চাইছেন, পরিবার নিয়ে নিয়মিত ভ্রমণ করেন, চালক রেখে গাড়ি ব্যবহার করেন অথবা একটি ছোট আকারের বিলাসবহুল এসইউভিতে সর্বোচ্চ আরাম চান, তাঁদের জন্য বিএমডব্লিউ এক্স১ লং হুইলবেস যথেষ্ট আকর্ষণীয় বিকল্প। মার্সিডিজ-বেঞ্জ জিএলএ, অডি কিউ৩ এবং ভলভো এক্সসি৪০-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছনের আসনের জায়গাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ক্রেতাদের কাছে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৪৯.৯০ লক্ষ টাকা এক্স-শোরুম প্রারম্ভিক দামে বিএমডব্লিউ এক্স১ লং হুইলবেস এমন একটি সমন্বয় তৈরি করেছে যেখানে বিলাসিতা, প্রযুক্তি, আরাম এবং ব্যবহারিকতা একসঙ্গে পাওয়া যায়। এটি হয়তো সবচেয়ে দ্রুতগতির বা সবচেয়ে চালককেন্দ্রিক বিএমডব্লিউ নয়। কিন্তু ভারতীয় ক্রেতাদের বাস্তব চাহিদার কথা বিবেচনা করলে, এক্স১ লং হুইলবেস সম্ভবত ভারতে বিএমডব্লিউ-র সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক মডেলগুলির একটি।