চিনি দাম কেন এত বাড়ছে? ইথানল উৎপাদনের সঙ্গে কি সত্যিই যোগ আছে, জানালেন বিশেষজ্ঞরা
কলকাতা: ভারতে চিনির দাম (Sugar Price) সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বেড়েছে। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে খোলা চিনি বর্তমানে কেজি প্রতি₹৭৫-৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য বিরোধীরা…
কলকাতা: ভারতে চিনির দাম (Sugar Price) সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বেড়েছে। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে খোলা চিনি বর্তমানে কেজি প্রতি₹৭৫-৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য বিরোধীরা কেন্দ্রের ইথানল-ব্লেন্ডিং নীতিকে দায়ী করলেও, বিশেষজ্ঞদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ ইথানলের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়া নয়। তাঁদের মতে, আখের উৎপাদন কমে যাওয়া, চিনি উৎপাদনে ঘাটতি এবং ব্যবসায়ীদের বড় পরিমাণে চিনি মজুত করে রাখা মিলেই বাজারে দাম বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ইথানল কি চিনির দাম বাড়াচ্ছে?
West Indian Sugar Mills Association বা WISMA-র সভাপতি ভৈরবনাথ থোম্বরে দাবি করেছেন, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইথানল উৎপাদনকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইথানলের ১০০ শতাংশই চিনির ডাইভারশন থেকে তৈরি হলেও বর্তমানে সেই অংশ কমে প্রায় ৩০ শতাংশে নেমেছে। খাদ্যশস্য থেকে ইথানল উৎপাদনের অংশও বেড়েছে। অর্থাৎ, পেট্রোলে ইথানল মেশানোর নীতির কারণে বিপুল পরিমাণ চিনি বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, এমন ব্যাখ্যা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
কমছে আখের উৎপাদন
প্রাক্তন মহারাষ্ট্র সুগার কমিশনার শেখর গায়কোয়াডের মতে, ভারতে আখের উৎপাদন এবং প্রতি হেক্টরে ফলন দুটোই কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিনির উৎপাদনে। তিনি জানান, নতুন কোনও সরকারি নীতি নেওয়া হলেও আখের উৎপাদন বাড়াতে ৩০-৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। আরও একটি সমস্যা হল, দেশে গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যের সংখ্যাও কমছে। ফলে চিনির সরবরাহের উপর চাপ বাড়ছে।
মহারাষ্ট্রেও কমেছে আখ মাড়াই
মহারাষ্ট্র দেশের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদক রাজ্য। প্রাক্তন National Federation of Cooperative Sugar Factories-এর সভাপতি জয়প্রকাশ দান্ডেগাঁওকর জানিয়েছেন, রাজ্যে চিনিকলগুলির আখ মাড়াইয়ের মরশুমের সময়ও কমেছে। আগে যে কারখানাগুলি বছরে প্রায় ১৫০ দিন আখ মাড়াই করত, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা কমে প্রায় ১০০ দিন হয়েছে। এর পিছনে উৎপাদন খরচ এবং কৃষকদের দেওয়া আখের দামও বড় কারণ। তাঁর মতে, কৃষকদের আখের জন্য বর্তমানে ৩,৬৫০ টাকা প্রতি টন FRP দিতে হচ্ছে, যেখানে চিনির MSP রয়েছে ৩,১০০ টাকা। এই ব্যবধান চিনিকলগুলির উপর আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
ব্যবসায়ীদের মজুতেও বাড়ছে দাম
চিনির দাম বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা স্টকপাইলিং বা মজুতদারিকে চিহ্নিত করেছেন। ভৈরবনাথ থোম্বরের মতে, El Niño-র প্রভাবে ভবিষ্যতে আখ ও চিনির উৎপাদন কমতে পারে, এমন আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা বড় পরিমাণে চিনি কিনে মজুত করেছিলেন। ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া প্রথম দিকে সরকার চলতি মরশুমে প্রায় ৩৯০ লাখ টন চিনি উৎপাদনের অনুমান করেছিল। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন প্রায় ৩১০ লাখ টনে নেমে আসে। এর পরেও প্রায় ৮ লাখ টন চিনি রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
আখ চাষের জমিও কমেছে
কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আখ চাষের জমির পরিমাণও গত কয়েক বছরে কমেছে।
- ২০২২-২৩: ৫৮.৮৫৩২ লাখ হেক্টর
- ২০২৪-২৫: ৫৪.৪৯৯৩ লাখ হেক্টর
অর্থাৎ, আখ চাষের আওতাধীন জমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে আখের মোট উৎপাদনও কমেছে। ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন ছিল প্রায় ৪৯০৫.৩৩ লাখ টন, যা পরবর্তী সময়ে কমে প্রায় ৪৫৩১.৫৮ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
তাহলে চিনির দাম কমবে কবে?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে শুধু ইথানল নীতি পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আখের উৎপাদন বাড়ানো, চিনির পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চিনিকলগুলিও নতুন আখ মাড়াইয়ের মরশুম শুরু হলে বাজারে প্রতি মাসে প্রায় ১৫-২০ লাখ টন চিনি ছাড়তে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ফলে আগামী মাড়াই মরশুমে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়লে বাজারে চিনির দামে কিছুটা চাপ কমতে পারে। তবে আখ উৎপাদনের কাঠামোগত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই ইথানল নয়, বরং কম আখ উৎপাদন, কম চিনি উৎপাদন এবং মজুতের সম্মিলিত প্রভাবই বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ বলে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।