আজীবন তথ্য ও সত্যের অনুসন্ধানী এক মানুষ
মনে আছে, স্নাতক পর্যায়ে আমাদের যখন মহাত্মা গান্ধী নিয়ে পড়ানো হচ্ছে, তখন আমরা চরম বিপত্তিতে পড়ি। নেতৃত্বের ধারণা বুঝতে এক দিকে জুডিথ ব্রাউন, অন্য দিকে শাহিদ আমিন নিয়ে আমরা যখন চরম সঙ্কটে, ঠিক তখনই হাতে এসেছিল সুমিতবাবুর সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা ‘পপুলার লিডারশিপ অ্যান্ড মিডলক্লাস লিডারশিপ ইন লেট কলোনিয়াল ইন্ডিয়া’। ক্ষুরধার যুক্তি আর ভাষার সহজবোধ্যতায় স্বাধীনতা আন্দোলনে মধ্যবিত্তের ভূমিকা ও নেতৃত্বের জটিল মানচিত্র পরিষ্কার করার জন্য সেই চটিবই আমাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তবে স্নাতক পর্যায়েই তৃতীয় বর্ষে পরিচয় ঘটে সুমিতবাবুর পিএইচডি গবেষণা-ভিত্তিক গ্রন্থ ‘স্বদেশি মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল’-এর সঙ্গে, যা আমাদের ইতিহাসবোধকে আবার এক গভীর ঝাঁকুনি দেয়। এখানে সমসাময়িক ঐতিহাসিক সূত্র সন্ধানে শুধুমাত্র মহাফেজখানার সরকারি রিপোর্ট নয়, পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে তার পাশাপাশি সাহিত্য, পুস্তিকা, মৌখিক আখ্যানও ব্যবহার করেছিলেন সুমিত সরকার। এই পূর্ণতার অনুসন্ধানই সুমিত সরকারকে বাংলার ঊনবিংশ শতক সম্পর্কে এক নির্মোহ অবস্থানে উপনীত করে। ঊনবিংশ শতকীয় বাংলার একরৈখিক উন্নতির আখ্যানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তিনি বাংলার তথাকথিত নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেন এই বইতে। ঔপনিবেশিক ও ধনতান্ত্রিক বাতাবরণে বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এক উচ্চবর্ণ ও উচ্চবর্গীয় বাঙালি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথা বর্ণিত হয় এ গ্রন্থে। এই বিতর্কে সুমিত সরকারের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর আগের প্রজন্মের ইতিহাসবিদরা, যাঁদের মধ্যে তাঁর পিতা সুশোভন সরকারও অন্যতম। পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল ইতিহাস রচনার ধারা একই তত্ত্ব বা তথ্যের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং তা হওয়া উচিত বিভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে আরও বিস্তারিত সূত্র আহরণ করে তার আরও নিরপেক্ষ আখ্যান পরিবেশনা, যার ফলে উল্লিখিত বইটি আমাদের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
প্রচলিত ইতিহাসচর্চার ধারায় প্রধান বা মূলস্রোতের বিপক্ষে কিছুটা প্রচ্ছন্ন বিবাদী স্বরের অনুসন্ধান আরও প্রকট হয়ে ওঠে তাঁর ১৯৯৭-এ প্রকাশিত ‘রাইটিং সোশাল হিস্ট্রি’তে। তাঁর ঔপনিবেশিক শাসন প্রবর্তনে সময়ের ধারণা পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রবন্ধ অথবা কেরানিকুল, চাকরি ও রামকৃষ্ণ সংক্রান্ত প্রবন্ধ মার্কসীয় ধারণায় শ্রেণি ও চেতনার বিকাশ ও বিন্যাসকে ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে নতুন করে নির্দেশ করে। এই ধরনের আপাত গুরুত্বহীন বিষয় বা গোষ্ঠী কী ভাবে এক জাতীয় সমাজের নির্মাণ বা অবনির্মাণে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, তা ইতিহাসের পাঠকদের কাছে আরও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।