উন্নয়নের স্রোতে হারিয়ে গেল সেই পাখিগুলো - 24 Ghanta Bangla News
Home

উন্নয়নের স্রোতে হারিয়ে গেল সেই পাখিগুলো

Spread the love

দেবাশিস ভট্টাচার্য

বাঁকা নদীর সেতু পেরিয়ে বীরহাটা পার হলেই ধরা পড়ত অন্য এক পৃথিবী। শাল ও মেহগনির ছায়াঘেরা জিটি রোড ধরে এগোলে দু’পাশে ধু-ধু মাঠ, দূরে পুলিশ লাইন, শেয়ালডাঙা, ইছলাবাদ, ঘোড়দৌড় চটি। এই সব জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে বর্ধমান রাজপরিবারের নানা স্মৃতি। শীতের সকালে বীরহাটার সেতু পার হলেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। শহরের মানুষ বলতেন, ‘ওদিকে শীতটা একটু বেশি।’ এ দিকের মানুষ কার্জন গেটের দিকে যাওয়ার সময়ে বলতেন, ‘টাউনে যাচ্ছি।’

সময়ের সঙ্গে শহরে বেড়ছে জনসংখ্যা, বাড়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি অফিস এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার। সামনে চলে আসে সেই জনসংখ্যাকে জায়গা করে দিতে আবাসন তৈরির প্রয়োজনীয়তা। ১৯৯৩-এর গোড়ার দিকে গড়ে ওঠে ইন্দ্রকানন আবাসন। ২০০৭-এ সালে শুরু হয় উল্লাস নগরী। রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, বিদ্যালয়, বাজার এবং বিবিধ নাগরিক পরিষেবা মেলা সহজ হওয়ায় এই অঞ্চলগুলি দ্রুত জনবহুল হয়ে উঠল।

বর্ধমানের সম্প্রসারণের নতুন মানচিত্র যেন উত্তর-পূর্ব দিকেই আঁকা হতে শুরু করল। পরিবর্তনের ঢেউ শুধু ইন্দ্রকাননে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বদলে গেল পুলিশ লাইন, ইছলাবাদ বাজার, রাখালপীরতলা এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। যে সব জায়গায় একটা সময়ে সন্ধে নামলে শেয়ালের ডাক শোনা যেত, অন্ধকারে মানুষ একা চলতে ভয় পেতেন, সেই পথে আজ মানুষের ভিড়। উন্নত জীবনের আশায় গ্রামের মানুষ শহরমুখী। শহরের নতুন ইতিহাস লেখা শুরু হলো।

ইন্দ্রকানন থেকে উল্লাস নগরী পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার জুড়ে জিটি রোডের দু’ধার কয়েক বছরের মধ্যেই ঘন বসতিপূর্ণ হয়ে যায়। নবাবহাটের রাস্তার দু’ধারে তৈরি হলো গড়ে উঠল অসংখ্য নার্সিংহোম, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং চিকিৎসাকেন্দ্র। ইন্দ্রপ্রস্থ, মেঘনাদপল্লির মতো নতুন আবাসিক অঞ্চল তৈরি হলো।

কোথা দিয়ে যেন হারিয়ে গেল একসময়ের নিরিবিলি জিটি রোড। রাস্তা প্রশস্ত হয়ে মাঝে বসল ডিভাইডার। বড়নীলপুর মোড় থেকে উল্লাস, অন্য দিকে বর্ধমান স্টেশন থেকে নবাবহাট পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারের অসংখ্য পুরোনো গাছ পড়ল কাটা। আধুনিকতার পথে সেটাই ছিল নগরায়নের প্রথম বলি। আজও সেই গাছগুলোর কথা মনে পড়ে। কত চড়াই, শালিক, দোয়েল, অজস্র নাম না-জানা পাখির সংসার ছিল সেই গাছের ডালে ডালে। ভোরের আলো ফুটতেই কিচিরমিচির শব্দে চারদিক মুখর হয়ে উঠত। সন্ধ্যা নামলে ঝাঁক বেঁধে তারা ফিরত নিজেদের নীড়ে।

রাস্তা প্রশস্ত হলো, শহর আধুনিক হলো, কিন্তু সেই পাখিরা আর ফিরল না। তারা কি কোথাও উড়ে গেল, নাকি হয়ে গিয়েছে বিলুপ্ত? সেই খবর রাখার সময় আমাদের হয়নি। উন্নয়নের উল্লাসে মনের অজান্তেই প্রকৃতির সঙ্গে গভীর, পুরোনো সম্পর্কটাই হারিয়ে গেল। তবুও এগিয়ে চলেছে নিজের নিয়মে। আমরা সবাই পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে প্রত্যেকদিন নতুন বর্ধমানকে জন্ম নিতে দেখেছি। আনন্দে, বিস্ময়ে, কখনও আবার একটু বিষণ্ণতা নিয়ে।

(লেখক অবসরপ্রাপ্ত বায়ুসেনা অফিসার। অনুলিখন: রূপক মজুমদার)

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *