২৫ বছরে বাংলায় হাতি-মানুষের সংঘাতে মৃত্যু ১,৭৬১, প্রাণ হারিয়েছে ৭৫৩ হাতি
কলকাতা: ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে হাতি-মানুষের সংঘাতের (Elephant Human Conflict) ২,০৫৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংঘাতে মৃত্যু হয়েছে ১,৭৬১ জনের এবং আহত হয়েছেন…
কলকাতা: ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে হাতি-মানুষের সংঘাতের (Elephant Human Conflict) ২,০৫৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই সংঘাতে মৃত্যু হয়েছে ১,৭৬১ জনের এবং আহত হয়েছেন আরও ২৯৮ জন। একই সময়ে রাজ্যে ৭৫৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া এবং প্রজেক্ট এলিফ্যান্টের একটি সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
উত্তরবঙ্গেই সবচেয়ে বেশি সংঘাত
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স এখনও হাতি-মানুষের সংঘাতের প্রধান কেন্দ্র। মানুষের মৃত্যুর নিরিখে জলপাইগুড়ি ডিভিশন সবচেয়ে এগিয়ে, যেখানে ৩৫৭টি প্রাণহানির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর পরেই রয়েছে গোরুমারা ওয়াইল্ডলাইফ ডিভিশন, যেখানে ২৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। বক্সা টাইগার রিজার্ভের পশ্চিম অংশে মৃত্যু হয়েছে ২২০ জনের। এছাড়াও কার্শিয়াংয়ে ১৭১টি এবং বক্সা ইস্টে ১৪৫টি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণবঙ্গে বাঁকুড়া নর্থে ১২০টি এবং ঝাড়গ্রামে ৯১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
২৫ বছরে ৭৫৩ হাতির মৃত্যু
মানুষের পাশাপাশি হাতিরাও এই সংঘাতের বড় শিকার। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলায় ৭৫৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৫টি মৃত্যু মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত এবং ৫০৮টি স্বাভাবিক কারণে হয়েছে। মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়াই সবচেয়ে বড় কারণ। এর ফলে ১১১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এরপর রয়েছে ট্রেনের ধাক্কা, যাতে ৯৩টি হাতি মারা যায়।
Also Read | বাঁকুড়ার বড়জোড়ায় ইস্পাত কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ! ঝলসে গেলেন ৩ শ্রমিক
এছাড়া চোরাশিকারিতে ৩১টি, বিষপ্রয়োগে ৬টি, গাড়ির ধাক্কায় ৩টি এবং প্রতিশোধমূলক হত্যায় ১টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। হাতির মৃত্যুর ক্ষেত্রেও উত্তরবঙ্গ এগিয়ে। বক্সা পশ্চিমে ৪৫টি, বক্সা পূর্বে ৪২টি, জলপাইগুড়িতে ৪২টি এবং গোরুমারায় ৩৮টি হাতির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ হাতির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে স্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বিভিন্ন বয়সের হাতির মধ্যে তুলনামূলকভাবে সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।
বর্ষাতেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু
হাতি-মানুষের সংঘাতের একটি স্পষ্ট ঋতুভিত্তিক প্রবণতাও দেখা গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টির সময় সবচেয়ে বেশি, ৬৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শীতকালে ৫৩৩ জন, গ্রীষ্মে ৪৭৬ জন এবং বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ৩৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। লিঙ্গের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ২,০৫৯টি মানবহানির ঘটনার মধ্যে ১,৫৫৪ জন পুরুষ এবং ৫০৫ জন মহিলা।
জঙ্গল কমছে, বাড়ছে সংঘাত
গত ২৫ বছরে বাংলার ভূদৃশ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সংঘাতের এই প্রবণতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বনভূমি ক্রমশ খণ্ডিত হয়েছে। বড় এবং একটানা বনাঞ্চলের সংখ্যা কমেছে। ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ ক্রমশ কৃষিজমি, চা-বাগান, বসতি এবং পরিবহণের করিডরের মধ্যে চলে এসেছে।
সমীক্ষায় উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের সংঘাতের চরিত্রেও পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী হাতির দলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সংঘাত রয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মূলত মরসুমি ও পরিযায়ী হাতির গতিবিধির কারণে সংঘাত বেড়েছে।
বাংলায় মানুষের বসতির মধ্য দিয়ে যাওয়া ২৬টি হাতি চলাচলের করিডর চিহ্নিত করা হয়েছে। বনভূমির খণ্ডীকরণ এবং নতুন পরিকাঠামো তৈরির ফলে এই করিডরগুলিই বারবার সংঘাতের এলাকায় পরিণত হচ্ছে।
Also Read | খড়গপুর থেকে ভদ্রক রেলপথ উন্নয়নে ৩,৩৫২ কোটি অনুমোদন মোদী সরকারের
কীভাবে কমানো যেতে পারে সংঘাত?
সমীক্ষায় হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- হাতি চলাচলের করিডরের সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার
- বিদ্যুৎ সংযোগ ও বেড়ার নিয়মিত পরিদর্শন
- বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাতির মৃত্যু ঠেকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি
- হাতির গতিবিধি সম্পর্কে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
- রেললাইনের কাছে নিরাপদ হাতি পারাপারের পরিকাঠামো তৈরি
- প্রয়োজনে আলো-ভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার
- হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধার
সমীক্ষার মূল বার্তা হল, হাতি-মানুষের সংঘাত শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সমস্যা নয়। বনভূমি খণ্ডিত হওয়া, দ্রুত পরিকাঠামো সম্প্রসারণ এবং মানুষের বসতি হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথকে সংকুচিত করছে। ফলে আগামী দিনে সংঘাত কমাতে হাতির করিডর এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।