‘বিরোধী নেতাদের দিমাগি নকশাল বলেননি…’, মোদীর মন্তব্যে বিতর্কের মাঝে সাফাই রিজিজুর, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়েও আক্রমণ কংগ্রেস
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই মুখ খুললেন কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলে উল্লেখ করেননি। বরং, এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে তাঁদের জন্য, যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন, সংবিধানকে অস্বীকার করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান অথবা দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। পাশাপাশি জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্কেও কংগ্রেসকে এক হাত নেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর কটাক্ষ, একসময় কংগ্রেসের অনুষ্ঠানেও সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হত। এখন সেই জায়গায় কংগ্রেস শুধু নিজেদের দলের গানই গায়।
স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সেখানে তিনি দাবি করেন, দেশের জঙ্গল থেকে সশস্ত্র নকশালবাদকে প্রায় নির্মূল। তবে তাঁর সতর্কবার্তা ছিল, ‘এ বার দিমাগি নকশালদের বিচ্ছিন্ন করতে হবে।’ কেজো বাংলায় যাকে বলে ‘শহুরে নকশাল।’ অর্থাৎ যারা জলে-জঙ্গলে না লুকিয়ে থেকে শহরের বিলাসী জীবনে বিপ্লবের স্বপ্ন বোনেন। এই ‘দিমাগি নকশাল’ এবং তাঁদের সমর্থকদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
এর পরেই মোদীর বক্তব্য নিয়ে সরব হয় বিরোধী শিবির। কংগ্রেস নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ পি চিদম্বরম সোশ্যাল মিডিয়ায় পাল্টা মন্তব্য করে লেখেন, তিনি ‘গর্বিত দিমাগি নকশাল’। তাঁর এই বক্তব্যের পরেই বিজেপি ও বিরোধীদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়।
এক নজরে
-
বিতর্কের কেন্দ্র: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য
-
সাফাই: কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু
-
রিজিজুর দাবি: বিরোধী নেতাদের উদ্দেশে ‘দিমাগি নকশাল’ বলা হয়নি
-
কারা ‘দিমাগি নকশাল’: মাওবাদী, বিচ্ছিন্নতাবাদী বা দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের বোঝানো হয়েছে বলে রিজিজুর ব্যাখ্যা
-
চিদম্বরমের পাল্টা মন্তব্য: নিজেকে ‘গর্বিত দিমাগি নকশাল’ বলে কটাক্ষ
-
মেহবুবা মুফতি: ৩৭০ অনুচ্ছেদের সমর্থনের কথা জানিয়ে প্রতিক্রিয়া
-
নতুন বিতর্ক: ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ রিজিজুর
-
বিজেপির অভিযোগ: কংগ্রেস সদর দপ্তরে ‘বন্দে মাতরম’ চলাকালীন শীর্ষ নেতাদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
কী বললেন কিরেন রিজিজু?
বিতর্কের আবহে রবিবার কিরেন রিজিজু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি বিরোধী নেতাদের দিমাগি নকশাল বলেননি।’ এর পরে কোনও ধরনের মানুষকে এই শব্দবন্ধের আওতায় ফেলা হয়েছে, তার ব্যাখ্যাও দেন তিনি।
রিজিজুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে বোঝানো হয়েছে—
-
যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন এবং ভারতীয় সংবিধানকে প্রত্যাখ্যান করেন।
-
যাঁরা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান এবং ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের পক্ষে অবস্থান নেন।
-
যাঁরা ‘চিকেনস নেক’ করিডর বিচ্ছিন্ন করে উত্তর-পূর্ব ভারতকে দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করতে চান।
অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য কোনও নির্দিষ্ট বিরোধী রাজনৈতিক দল বা নেতার উদ্দেশে করা হয়নি। বরং দেশের সংবিধান, অখণ্ডতা এবং নিরাপত্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নির্দিষ্ট মতাদর্শের মানুষদের উদ্দেশেই এই মন্তব্য করা হয়েছে।
চিদম্বরমের পাল্টা মন্তব্য ঘিরে নতুন বিতর্ক
তবে রিজিজুর ব্যাখ্যার পরেও বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। মোদীর ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্যের জবাবে পি চিদম্বরমের বক্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল তুলেছে। চিদম্বরম নিজেকে ‘গর্বিত দিমাগি নকশাল’ বলে মন্তব্য করায় বিজেপি পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও মোদীর বক্তব্য ও রিজিজুর ব্যাখ্যা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানিয়েছেন, তিনি ওই অনুচ্ছেদের সমর্থন করেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক তরজা আরও জোরদার হয়েছে।
নকশালবাদ নিয়ে মোদীর বার্তা
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মূলত দেশের নকশাল সমস্যা নিয়ে সরকারের সাফল্য তুলে ধরেছিলেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে সশস্ত্র নকশাল আন্দোলন অনেকটাই দুর্বল হয়েছে। সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়েই এখন সরগরম জাতীয় রাজনীতি। বিরোধীদের একাংশ যেখানে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যকে রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবে দেখছে, সেখানে রিজিজুর সাফাই—বিরোধী নেতাদের উদ্দেশ করে ওই মন্তব্য করা হয়নি; বরং মাওবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী মতাদর্শকে সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধেই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য।
‘আগে পুরো বন্দে মাতরম গাইত কংগ্রেস’
চলতি বিতর্কের সূত্রপাত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে কংগ্রেসের ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনকে ঘিরে। ১৫ অগস্ট কংগ্রেস সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গানটি পরিবেশনের সময় দলের শীর্ষ নেতাদের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিজেপি। একটি ভিডিয়োকে সামনে এনে বিজেপির অভিযোগ, ‘বন্দে মাতরম’ চলাকালীন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী এবং সনিয়া গান্ধী যথাযথ সম্মান দেখাননি।
বিজেপির অভিযোগ, অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন নিয়ে আপত্তি ছিল কংগ্রেসের একাংশের। ভিডিয়োতে সনিয়া গান্ধীকে খাড়গের সঙ্গে কথা বলতে এবং কিছু ইঙ্গিত করতে দেখা যায়। সেই দৃশ্যকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় রাজনৈতিক চাপানউতোর। তবে ভিডিয়ো থেকে কারও নির্দিষ্ট মনোভাব বা উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় না। এই প্রসঙ্গেই রিজিজুর দাবি, কংগ্রেসের অবস্থানে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। তাঁর বক্তব্য, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’-এর গভীর যোগ ছিল। কিন্তু এখন দলটি জাতীয় গানের বদলে নিজেদের দলীয় গানকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। রিজিজুর কথায়,‘এখন তারা শুধু কংগ্রেসের গান গায়। কংগ্রেস পার্টিতে জাতীয় গান গাওয়া হয় না। এটা ভুল।’
FAQ
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে কাদের বোঝাতে চেয়েছেন?
উত্তর: কিরেন রিজিজুর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাওবাদীদের সমর্থন করেন, সংবিধান প্রত্যাখ্যান করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়ান বা দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন—এমন ব্যক্তিদের বোঝাতে ‘দিমাগি নকশাল’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রশ্ন: মোদী কি বিরোধী নেতাদের ‘দিমাগি নকশাল’ বলেছেন?
উত্তর: কিরেন রিজিজু স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি।
প্রশ্ন: ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্যের জবাবে পি চিদম্বরম কী বলেছেন?
উত্তর: কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম পাল্টা মন্তব্য করে নিজেকে ‘গর্বিত দিমাগি নকশাল’ বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রশ্ন: মেহবুবা মুফতি কী বলেছেন?
উত্তর: ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে মেহবুবা মুফতি জানিয়েছেন যে তিনি ওই অনুচ্ছেদের সমর্থন করেন।
প্রশ্ন: ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কংগ্রেসকে কী বলেছেন কিরেন রিজিজু?
উত্তর: রিজিজুর অভিযোগ, আগে কংগ্রেসের অনুষ্ঠানেও সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হত। এখন কংগ্রেস নিজেদের দলীয় গানকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।