বর্ষায় জলমগ্ন রাস্তায় গাড়ি-বাইক চালাচ্ছেন? দুর্ঘটনা এড়াতে মানুন এই জরুরি নিয়ম
কলকাতা: বর্ষা নামতেই কলকাতা-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে জলমগ্ন রাস্তায় যাতায়াত বড় সমস্যা (Road Safety) হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারী বৃষ্টির পর বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা, আন্ডারপাস এবং নিচু এলাকা জলের তলায় চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি বা বাইক নিয়ে বেরোতে হলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
জলমগ্ন রাস্তায় ভুলভাবে গাড়ি বা বাইক চালালে ইঞ্জিনে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে গাড়ি বা বাইক জলে আটকে গিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। তাই ভারী বৃষ্টির সময়ে রাস্তায় বেরোতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
গাড়ি চালানোর সময় প্রথমেই বুঝুন জলের গভীরতা
জল কতটা গভীর তা না বুঝে জলমগ্ন রাস্তায় গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়া উচিত নয়। সাধারণ নিয়ম হিসেবে, রাস্তার জমা জল যদি গাড়ির চাকার মাঝামাঝি অংশ বা হাবক্যাপের উপরে উঠে যায়, অথবা গাড়ির দরজার নিচের অংশ পর্যন্ত জল পৌঁছে যায়, তাহলে অন্য রাস্তা বেছে নেওয়াই নিরাপদ।
সাধারণ সেডান এবং হ্যাচব্যাক গাড়ি খুব বেশি গভীর জলের মধ্যে চালানোর জন্য তৈরি নয়। তাই জল যদি অত্যন্ত গভীর বলে মনে হয়, ঝুঁকি না নিয়ে ফিরে যাওয়াই ভালো।
জল পেরনোর সময় প্রথম গিয়ারে রাখুন গাড়ি
জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় প্রথম গিয়ার ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ক্লাচ সামান্য ছেড়ে এবং অ্যাক্সিলারেটর নিয়ন্ত্রিতভাবে চাপ দিয়ে ইঞ্জিনের আরপিএম তুলনামূলকভাবে বেশি রাখা যেতে পারে।
এর উদ্দেশ্য হল গাড়ির এক্সহস্টের মধ্যে ধারাবাহিক চাপ বজায় রাখা, যাতে বাইরে থেকে জল এক্সহস্ট পাইপের দিকে সহজে ঢুকে না পড়ে। তবে জলের গভীরতা সম্পর্কে সন্দেহ থাকলে কোনও কৌশলই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না। নিরাপদ বিকল্প রাস্তা থাকলে সেটিই বেছে নেওয়া উচিত।
জলে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে ফের স্টার্ট দেবেন না
জলমগ্ন রাস্তায় গাড়ির ইঞ্জিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হল ইঞ্জিন ফের চালু করার চেষ্টা না করা। ইগনিশন ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট করার চেষ্টা করলে জল এয়ার ইনটেকের মাধ্যমে ইঞ্জিনের ভিতরে ঢুকে যেতে পারে। এর ফলে হাইড্রোলক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, এমনকি পিস্টন রডও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গাড়ি জলের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেলে সেটিকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজন হলে ফ্ল্যাটবেড বা উদ্ধারকারী পরিষেবার সাহায্য নেওয়াই নিরাপদ।
জলমগ্ন এলাকায় যাওয়ার আগে জানালা সামান্য খুলে রাখুন
অত্যন্ত জলমগ্ন এলাকায় গাড়ি নিয়ে প্রবেশের আগে জানালা সামান্য খোলা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ আধুনিক গাড়িতে প্রচুর বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা থাকে। গভীর জলে গাড়ির বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দরজা লক হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জানালা সামান্য খোলা থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে গাড়ি থেকে বের হওয়ার একটি বিকল্প পথ তৈরি থাকে।
জল পার হওয়ার পর ব্রেক পরীক্ষা করুন
জলমগ্ন রাস্তা পার হওয়ার পর গাড়ির ব্রেক ভিজে যেতে পারে। ফলে প্রথম দিকে ব্রেকের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই জল থেকে বেরিয়ে আসার পর ধীরে গাড়ি চালিয়ে কয়েকবার হালকা করে ব্রেক চাপার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্রেকের ঘর্ষণে তাপ তৈরি হলে ব্রেকের অংশে থাকা জল শুকিয়ে যেতে পারে।
বাইক চালালে রাস্তার মাঝামাঝি অংশে থাকুন
দুই চাকার গাড়ির ক্ষেত্রে জলমগ্ন রাস্তায় আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সাধারণত শহরের রাস্তা দু’পাশের দিকে কিছুটা ঢালু থাকে, যাতে বৃষ্টির জল রাস্তার কিনারার দিকে চলে যেতে পারে।
ফলে রাস্তার প্রান্তে অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি জল জমে থাকতে পারে। একই সঙ্গে ডুবে থাকা খোলা ম্যানহোল, বড় গর্ত এবং বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা থেকেও বিপদ তৈরি হতে পারে। তাই জলমগ্ন রাস্তায় বাইক চালানোর সময় রাস্তার মাঝামাঝি অংশ দিয়ে চলার চেষ্টা করা নিরাপদ হতে পারে।
বাইকে ক্লাচ নিয়ন্ত্রণ করুন, হঠাৎ অ্যাক্সিলারেটর ছাড়বেন না
জল পেরনোর সময় বাইক প্রথম গিয়ারে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইঞ্জিনের আরপিএম স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি রেখে ক্লাচ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করে গতি সামলানো যেতে পারে।
হঠাৎ পুরো অ্যাক্সিলারেটর ছেড়ে দিলে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই জলমগ্ন অংশে বাইকের গতি স্থির রাখার দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
সামনে থাকা বড় গাড়ির গতিবিধি লক্ষ্য করুন
জলমগ্ন রাস্তায় সামনে থাকা বড় গাড়ি, যেমন বাস বা এসইউভি, জলের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ঢেউ তৈরি করে। সেই গাড়ি জল সরিয়ে যাওয়ার ফলে তার পিছনে কিছুটা কম গভীর পথ তৈরি হতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে বড় গাড়ির একেবারে পিছনে গিয়ে বাইক বা ছোট গাড়ি চালাতে হবে। বরং পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। সামনে থাকা গাড়ির তৈরি জলের ঢেউ বাইকের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
ব্রেকের উপর পুরোপুরি নির্ভর করবেন না
জলমগ্ন রাস্তায় বাইকের ব্রেকের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে ড্রাম ব্রেকে জল ঢুকলে ব্রেকিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। ডিস্ক ব্রেকেও জল থাকার কারণে শুরুতে স্বাভাবিক অনুভূতি নাও পাওয়া যেতে পারে।
তাই জলমগ্ন রাস্তায় বাইক চালানোর সময় গতি খুব কম রাখা এবং প্রয়োজনে ইঞ্জিন ব্রেকিং ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গিয়ার কমিয়ে ধীরে বাইকের গতি কমানো যেতে পারে।
বাড়ি ফেরার পর গাড়ি বা বাইকের যত্ন নিন
জলমগ্ন রাস্তায় চালানোর পর শুধু গাড়ি বা বাইক পরিষ্কার করলেই হবে না। বন্যা বা নোংরা জল রেডিয়েটরের অংশে ময়লা জমিয়ে দিতে পারে। ফলে পরে ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরম হওয়ার সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বাইকের ক্ষেত্রে ড্রাইভ চেইনেও বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। জল এবং কাদায় চেইনের গ্রিজ বা লুব্রিকেশন কমে যেতে পারে। তাই বাড়ি ফেরার পর চেইন পরিষ্কার করে প্রয়োজন অনুযায়ী লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা উচিত।
সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হল ঝুঁকি এড়ানো
ভারী বৃষ্টির সময়ে রাস্তা জলমগ্ন হলে সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প হল প্রয়োজন না থাকলে বাইরে না বেরোনো। জরুরি প্রয়োজনে বেরোতেই হলে আগে রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া, গভীর জল এড়িয়ে চলা এবং গাড়ি বা বাইকের সীমাবদ্ধতা মাথায় রাখা জরুরি।
বিশেষ করে জল কতটা গভীর তা বোঝা না গেলে কোনওভাবেই জোর করে জল পার হওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। কয়েক মিনিটের পথ বাঁচাতে গিয়ে ইঞ্জিনের বড় ক্ষতি বা প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।