স্কুলে যাওয়ার রাস্তাই নেই! প্রাণ হাতে পিলার টপকে, নদী পেরিয়ে পৌঁছয় পড়ুয়ারা
হিসাব কষে লাফ। একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ। গন্তব্যে পৌঁছতে হলে এক পিলার থেকে আরেক পিলার লাফিয়ে পেরোতে হবে নদী। না, বিষয়টা ফোনে ‘মারিও’ বা ‘টেম্পল রান’-এর গেম খেলা নয়। মধ্যপ্রদেশের কাকরাউয়া গ্রামের ছেলে-মেয়েদের জন্য এটাই চরম বাস্তব।
‘পড়াশোনা করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’— গাড়ি-ঘোড়া তো অনেক দূর, মধ্যপ্রদেশের বিদিশা জেলার কাকরাউয়া (Kakraua) গ্রামের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েগুলোর পড়াশোনা করতে স্কুলে যাওয়ার জন্য একটা ঠিকঠাক রাস্তাও নেই। একবিংশ শতাব্দীতেও স্কুলে পৌঁছতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে পড়ুয়াদের। গ্রামের পড়ুয়াদের স্কুলে পৌঁছনোর লড়াইয়ের ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায় ছড়িয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য।
ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে, ইউনিফর্ম পরে বেতওয়া নদীর উপর নির্মিত একটি চেক ড্যামের সরু কংক্রিটের পিলারের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে নদী পার হচ্ছে। লাফাতে গিয়ে সামান্য পা পিছলে গেলেই স্রোতের জলে পড়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, কাকরাউয়া গ্রামে স্কুল রয়েছে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু নবম শ্রেণি থেকে পড়াশোনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের অন্য গ্রামে যেতে হয়। সড়কপথে সেই স্কুলের দূরত্ব প্রায় ১৩ কিলোমিটার। অথচ চেক ড্যামের উপর দিয়ে গেলে মাত্র প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ। সময় ও যাতায়াতের খরচ বাঁচাতেই অধিকাংশ পড়ুয়া এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে দেখা যায়, মোট নয়জন পড়ুয়া, যার মধ্যে পাঁচজন নবম শ্রেণির ছাত্রী, স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে একের পর এক কংক্রিটের পিলারের ফাঁক টপকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি পিলারের মধ্যে প্রায় তিন থেকে চার ফুট ব্যবধান। বর্ষাকালে পিলার ভিজে পিচ্ছিল হয়ে যায় এবং নীচে নদীর স্রোত বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বাড়ে। ভিডিয়োতে কয়েকজন ছাত্রকে সহপাঠী ছাত্রীদের ব্যাগ বহন করতেও দেখা যায়, যাতে তারা নিরাপদে লাফ দিতে পারে।
গ্রামবাসীদের বক্তব্য, স্কুলে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তা থাকলেও সেটি অনেক দীর্ঘ। অধিকাংশ পরিবারের অভিভাবক দিনমজুর বা কৃষিকাজে যুক্ত থাকায় প্রতিদিন সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে হয় সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হবে, নয়তো এই ঝুঁকিপূর্ণ পথেই পাঠাতে হবে।
এই পরিস্থিতির জেরে ইতিমধ্যেই এক ছাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ষাকালে নদী পার হতে না পারায় সে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেনি। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় তাকে একই শ্রেণিতে আবার ভর্তি হতে হয়েছে। এই ঘটনাই জেলার পরিকাঠামোর দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পরে বিদিশার জেলা শিক্ষা আধিকারিক এন. কে. আহিরওয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। শিশুদের নিরাপদে যাতায়াতের জন্য স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে কবে সেতু বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা হবে, সে বিষয়ে এখনও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, কাকরাউয়া গ্রামটি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী তথা মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান-এর লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। তাই এই ঘটনা সামনে আসার পর গ্রামীণ পরিকাঠামো, শিক্ষার অধিকার এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু মানুষ অবিলম্বে নদীর উপরে একটি সেতু নির্মাণ করার দাবি জানিয়েছেন।