সেজে উঠবে ‘বন্দে মাতরম’ সৃষ্টির সূতিকাগার? অধীর অপেক্ষায় লালগোলা
মাঘী পূর্ণিমার রাত। খিলানের ফাঁক দিয়ে কনকনে হাওয়া ঢুকেই চলছে সন্তর্পণে। দোতলার গুমটি ঘরটায় দূর থেকে ভেসে আসছে কালীবাড়ির ঘণ্টার শব্দ। ঘরের এক কোণায় টেবিলের উপরে টিম টিম করে জ্বলছে পিদিম। আগুনের তেজ বড্ড কম। ঠিক তার পাশেই সাদা কাগজে খস খস করে লেখা হচ্ছে স্বাধীনতার জয়গাথা। বিপ্লবীদের ‘রণধ্বনি’। ঋষির কলম থেকেও ঝরেছিল আগুন। সেই আগুনের তেজেই সিক্ত হয়েছে গোটা দেশ।
রাজবাড়ির সেই দোতলার ঘরে তিনি অতিথি। অবসরে ভ্রমণে এসে দেখেছেন রাজবাড়ির সাজসজ্জা, প্রার্থনা স্থল, মন্দিরের পুজো-অর্চনা। সেই থেকেই বোধহয় ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের মনে জন্ম নেয় উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। ঋষি লেখেন, ‘ব্রহ্মচারী মহেন্দ্রকে কক্ষান্তরে লইয়া গেলেন। সেখানে মহেন্দ্র দেখিলেন, এক অপরূপ সর্বাঙ্গসম্পন্না সর্বাভরণভূষিতা জগদ্ধাত্রী মূর্তি। মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ইনি কে?’ ব্রহ্মচারী বললেন, ‘মা যা ছিলেন … ভূগর্ভস্থ এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কোথা হইতে সামান্য আলো আসিতেছিল। সেই ক্ষীণালোকে এক কালীমূর্তি দেখিতে পাইলেন। ব্রহ্মচারী বলিলেন, ‘দেখ, মা যা হইয়াছেন |’ মহেন্দ্র সভয়ে বলিল, ‘কালী |’… তিনি দ্বিতীয় সুড়ঙ্গ আরোহণ করিতে লাগিলেন। সহসা তাঁহাদিগের চক্ষে প্রাতঃসূর্যের রশ্মিরাশি প্রভাসিত হইল। চারি দিক হইতে মধুকণ্ঠ পক্ষিকুল গায়িকা উঠিল। দেখিলেন, এক মর্মরপ্রস্তরনির্মিত প্রশস্ত মন্দিরের মধ্যে সুবর্ণনির্মিতা দশভুজা প্রতিমা নবারুণকিরণে জ্যোতির্ময়ী হইয়া হাসিতেছে। ব্রহ্মচারী প্রণাম করিয়া বলিলেন,- ‘এই মা যা হইবেন। দশ ভুজ দশ দিকে প্রসারিত— তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত, পদতলে শত্রু বিমর্দিত, পদাশ্রিত বীরকেশরী শত্রুনিপীড়নে নিযুক্ত।’ (‘আনন্দমঠ’ থেকে সংগৃহীত)
বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর সন্ন্যাসী রাজ পরিবারের আমন্ত্রণে লালগোলায় আসতেন। সেই সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীদের মাঝে রাজ পরিবারের জগদ্ধাত্রী ঠাকুর, মন্দিরে শৃঙ্খলিত কালী মায়ের মূর্তি এবং রাজগুরু পরিবারের দুর্গা মূর্তি দেখতে পেয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।
ম্যালেরিয়ার দুর্ভোগ সওয়ার পরে ঋষি বঙ্কিমের শরীর তখন ধুঁকছে। হাওয়া বদলের প্রয়োজন। লালগোলার মহারাজ রাও যোগীন্দ্রনারায়ণ রায় বঙ্কিমচন্দ্রকে ডাক পাঠালেন তাঁর রাজবাড়িতে। ১৮৭৪-এর জানুয়ারিতে লালগোলার রাজবাড়িতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। রাজবাড়ি এবং কলকলি নদীর প্রেক্ষাপটে সেখানেই লিখেছিলেন কালজয়ী উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার ছটফটানি শুরু হয়েছে বঙ্গসমাজে। ব্রিটিশ শৃঙ্খল ভাঙার আঁচ তখন গনগনে। তাতেই ঘৃতাহুতি দিয়েছিল ‘আনন্দমঠ’-এর ‘বন্দে মাতরম্ সুজলাং সুফলাং থেকে… রিপুদলবারিণীং মাতরম’ গান।

বঙ্কিম গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষক কিষানচাঁদ ভকত জানান, উত্তরপ্রদেশ এবং অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর সন্ন্যাসী রাজ পরিবারের আমন্ত্রণে লালগোলায় আসতেন। সেই সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীদের মাঝে রাজ পরিবারের জগদ্ধাত্রী ঠাকুর, মন্দিরে শৃঙ্খলিত কালী মায়ের মূর্তি এবং রাজগুরু পরিবারের দুর্গা মূর্তি দেখতে পেয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। লালগোলা রাজ পরিবারে মায়ের তিন ধরনের যে মূর্তি তিনি দেখেছিলেন, তাঁর বর্ণনা আমরা ‘আনন্দমঠ’-এ দেখতে পাই।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক দ্বারা আয়োজিত ‘লং লিভ ডেমোক্রেসি’ নামক একটি অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গানের উৎসভূমি হিসাবে মুর্শিদাবাদ লালগোলাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফে জারি করা পোস্টারে জানানো হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’ বঙ্কিমচন্দ্র লালগোলাতে বসেই লিখেছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ওই স্বীকৃতিকে ঘিরে খুশির মহল লালগোলা তথা মুর্শিদাবাদ জুড়ে। স্থানীয়দের মতে, শুধু ইতিহাসের মর্যাদা নয়, ওই স্বীকৃতি আগামী দিন লালগোলাকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা দেবে।
রাজ কালীবাড়ির মনোরম পরিবেশ, তার পাশে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কয়েকশো বছরের পুরোনো রাজবাড়ি এবং দর্শনার্থীদের থাকার জন্য গেস্ট হাউস— সব মিলিয়ে ওই এলাকা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। এমনিতে প্রতি দিন বহু মানুষ কালীবাড়ি দর্শন করতে আসেন। এখানকার শান্ত, সবুজ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত পরিবেশে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। এ ব্যাপারে লালগোলা বঙ্কিম স্মৃতিচর্চা কমিটির সম্পাদক সুকুমার সাহা বলেন, ‘বন্দে মাতরমের সূতিকাগার রক্ষার জন্য এখনও তেমন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। যে প্রেক্ষাপটে এবং যেখানে বসে এই গান রচনা করা হয়েছিল, সেখানে কোনও স্মারকচিহ্ন তৈরি হয়নি। সেই এলাকাকে প্রচারের আলোয় আনার ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।’

এই অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যদি ঐতিহাসিক ওই স্থানের সংরক্ষণ, সৌন্দর্যায়ন ও পর্যটনের উপযুক্ত পরিকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগী হয়, তা হলে আগামী দিনে লালগোলা রাজ্যের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হবে। এর ফলে সরকারের বাড়তি রাজস্ব আয় হবে, তেমনি হোটেল ব্যবসা, গাইড পরিষেবা, পরিবহণ ব্যবস্থা, জেলার হস্তশিল্প, মুর্শিদাবাদ সিল্ক ও বালুচরি, খাগড়ার কাঁসা, শোলা শিল্প, মিষ্টি ব্যবসার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে। সে ক্ষেত্রে এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের কাছে খুলে যাবে নতুন দিশা।
ওই রাজ পরিবারের এস্টেট-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সৌরভ রায় জানান, এই স্বীকৃতি আরও আগে পাওয়া উচিত ছিল। এটা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু বিভিন্ন বাধা-নিষেধের কারণে দেরি হলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার সেই স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠুক। বন্দে মাতরম নিয়ে সারা দেশে এত উৎসাহ। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে স্কুলের প্রার্থনায় গাইতে হবে। কিন্তু বন্দে মাতরম কোথায় লেখা হয়েছে, কোন প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছে, সেই জায়গাটা সকলের নজরে আনতে হবে। নজরে নিয়ে আসার আগে প্রথম কাজ হচ্ছে, এই হেরিটেজ বিল্ডিংগুলো সংস্কার করা এবং এখানে যাঁরা ঘুরতে আসবেন তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় থাকার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অনুরোধ করব।’
বিজয়কুমার হালদার নামে এক পর্যটকের কথায়, ‘কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকৃতি দেওয়ায় মুর্শিদাবাদ জেলাবাসী হিসেবে আমি গর্ব অনুভব করছি। এই রকম একটা জায়গাকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে, সেটি অতি উত্তম হবে। এ ক্ষেত্রে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকে বলব, এলাকার সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যায়ন করলে বহিরাগত পর্যটকরা উৎসাহিত হবেন বন্দে মাতরম সৃষ্টির সূতিকাগার দেখতে।’
লালগোলা পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ তথা সাংস্কৃতিক কর্মী যদুরাম ঘোষ জানান, লালগোলাবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল, এ রকম সরকারি স্বীকৃতির। সেই দিক থেকে দেখলে কেন্দ্রীয় সরকার লালগোলাবাসীর দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়ায় আমরা খুশি। এখন হেরিটেজ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে লালবাগের পাশাপাশি বহিরাগত পর্যটকদের ভিড় বাড়বে লালগোলাতে। সাংস্কৃতিক ও সমাজ কর্মী রতন ঘোষ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের ওই ঘোষণার ফলে বঙ্কিম গবেষকদের কাছে লালগোলা অন্য মাত্রা পাবে। পাচার ও হেরোইনের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত লালগোলাকে এখন থেকে শিক্ষিত ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ওই স্বীকৃতিতে অন্য চোখে দেখবেন, এটাও বড় পাওনা।’
যে জায়গায় বসে বঙ্কিমচন্দ্র ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, সেই মাটি ছুঁয়ে পুণ্য অর্জনের সুযোগ পাক সাধারণ মানুষ। জায়গাটির গরিমা বন্দিত হোক লোকমুখে। এমনটাই চাইছেন লালগোলার মানুষ। চাইছে ইতিহাস মণ্ডিত জেলা মুর্শিদাবাদ।