তিলোত্তমার কোথায় নির্মাণ থামানো জরুরি? আইআইটি খড়্গপুরের গবেষণায় বড় সতর্কবার্তা
কলকাতা: মহানগরীর (Kolkata) ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ আর শুধুমাত্র নতুন আবাসন বা রাস্তা তৈরির বিষয় নয়। কোথায় শহরের বৃদ্ধি নিরাপদ, আর কোথায় নির্মাণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত, তা এখন পরিবেশ ও জলবায়ুর দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছে আইআইটি খড়্গপুরের একটি নতুন গবেষণা।
‘Heat island, pollution load and urban sprawl in the Kolkata metropolitan city of India during 2000–2020: implications for its sustainability’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়নের ফলে কলকাতা মহানগর অঞ্চল (Kolkata Metropolitan Area) আরও উষ্ণ, দূষিত এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কলকাতা মহানগর অঞ্চল ৬০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি গাছপালার আচ্ছাদন, ১৮ থেকে ২০ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি, ২০ থেকে ২৫ বর্গকিলোমিটার অনাবাদি জমি এবং প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার জলাশয় হারিয়েছে। একই সময়ে নির্মিত এলাকার পরিমাণ ৭২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা কমে গিয়ে কংক্রিট, রাস্তা এবং ঘন নির্মাণ বেড়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি পড়েছে শহরের তাপমাত্রার উপর। গবেষকদের মতে, বিশেষ করে বর্ষার আগের সময়ে কলকাতার কিছু অংশে আশপাশের এলাকার তুলনায় ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হচ্ছে। এই ঘটনাকে আরবান হিট আইল্যান্ড (Urban Heat Island) প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
Also Read | পুলিশের পোশাক জাল করে যন্তরমন্তরে নাশকতার ছক! হামিমকে নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য STF র
গবেষণায় গত দুই দশকে দ্রুত নগরায়নের প্রধান অঞ্চল হিসেবে নিউ টাউন, রাজারহাট, ডানকুনি, বারাসত, মধ্যমগ্রাম, ভাঙড়, সোনারপুর, মহেশতলা এবং গড়িয়া-র নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই এলাকাগুলিতে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।
তাঁদের পরামর্শ, নতুন নির্মাণের ক্ষেত্রে সবুজ জমি বা কৃষিজমির পরিবর্তে ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত জমি, ব্রাউনফিল্ড সাইট, শহরের ফাঁকা জমি এবং পুনর্গঠনযোগ্য এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
গবেষণা অনুযায়ী, ডানকুনিতে শিল্পাঞ্চলের পুনর্বিকাশের মাধ্যমে, মহেশতলায় পুরনো শিল্পভূমির পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে, নিউ টাউনের ফাঁকা নগর জমিতে এবং রাজারহাটের ইতিমধ্যেই গড়ে ওঠা এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা পুরসভার (KMC) এলাকার ফাঁকা জমিগুলিতেও পরিকল্পিত ও ঘন উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন চাহিদা পূরণ করা সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
Also Read | এসপ্ল্যানেড খালি করতে ৫২৮ জন ব্যবসায়ীকে নোটিস, কোথায় হচ্ছে পুনর্বাসন?
অন্যদিকে বারাসত, মধ্যমগ্রাম, রাজারহাটের কৃষিজমি সংলগ্ন অংশ, বেহালা এবং দমদম করিডরে নির্মাণে কড়া নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই এলাকায় সবুজ বাফার জোন, কম ঘনত্বের নির্মাণ, অবশিষ্ট গাছপালা সংরক্ষণ এবং জমির ব্যবহার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধতা না আনলে ভবিষ্যতে এলাকাগুলি আরও গরম, দূষিত এবং যানজটে ভরে উঠবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এসেছে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলিকে ঘিরে। গবেষণায় বলা হয়েছে, পূর্ব কলকাতা জলাভূমি (East Kolkata Wetlands), ভাঙড়, সোনারপুর, হুগলি নদীর বন্যাপ্রবণ এলাকা, রাজারহাটের অবশিষ্ট কৃষিজমি, বড় বড় জলাশয়, জলাভূমি এবং অবশিষ্ট বৃক্ষাচ্ছাদিত অঞ্চলে নতুন নগরায়ন সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত।
গবেষকদের ব্যাখ্যা, এই এলাকাগুলি বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং বহু মানুষের জীবিকা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলিকে কংক্রিটের নির্মাণে রূপান্তরিত করলে কলকাতার তাপমাত্রা, দূষণ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি আরও বাড়বে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মধ্য কলকাতা, এসপ্ল্যানেড, পার্ক স্ট্রিট, ডালহৌসি স্কোয়ার, বউবাজার, নিউ টাউনের মূল অংশ এবং হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে সবুজায়নের প্রয়োজন। এই এলাকাগুলিতে আরও বেশি গাছ লাগানো, নতুন পার্ক তৈরি, ছায়াযুক্ত রাস্তা, সবুজ ছাদ (Green Roof) এবং দূষণ কমানোর পরিকাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। কারণ, যানবাহনের চাপ, ঘন নির্মাণ এবং সবুজের অভাবের কারণে এই অঞ্চলগুলি বর্তমানে কলকাতার সবচেয়ে উষ্ণ ও দূষিত এলাকাগুলির মধ্যে অন্যতম।
একই সঙ্গে গবেষণায় কল্যাণী, হালিশহর এবং কাঞ্চরাপাড়া-র উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই শহরগুলির তুলনামূলক কম তাপমাত্রা দেখিয়ে দেয় যে পরিকল্পিত নগরায়ন এবং পর্যাপ্ত সবুজায়ন বজায় রেখেও উন্নয়ন সম্ভব। কলকাতার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এই মডেল অনুসরণ করা হলে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে টেকসই নগর উন্নয়ন নিশ্চিত করা যেতে পারে।